বাংলাদেশের রপ্তানি খাত দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি নির্দিষ্ট শিল্পের ওপর বেশি নির্ভরশীল। তৈরি পোশাকের বাইরে নতুন কোনো খাতকে বড় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা থাকলেও প্রত্যাশিত গতি দেখা যায়নি। এবার সেই জায়গায় গয়না শিল্পকে সামনে নিয়ে আসার বড় পরিকল্পনা করেছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি। সংগঠনটি ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে সোনা ও হীরার গয়না রপ্তানি করে ৭ বিলিয়ন ডলার আয় করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে
রাজধানীতে শনিবার রাতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির গয়না প্রদর্শনী উৎসব ২০২৬ অনুষ্ঠানে এই লক্ষ্যের কথা তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, দেশের গয়না শিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকার, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তাঁর মতে, নীতিগত সহায়তা, বিনিয়োগ এবং আধুনিকায়নের মাধ্যমে এই শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব
বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির সভাপতি এনামুল হক খান জানিয়েছেন, সংগঠনটি ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে গয়না শিল্পকে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতে পরিণত করতে চায়। লক্ষ্যটি বড় হলেও এর পেছনে দেশের বিদ্যমান কারিগরি দক্ষতা, ব্যবসার বিস্তৃত পরিসর এবং আন্তর্জাতিক বাজারে গয়নার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর চিন্তা রয়েছে
তবে এই লক্ষ্য অর্জনের পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হিসেবে উঠে এসেছে নীতিগত অস্পষ্টতা। গয়না ব্যবসায়ীদের দাবি, সোনা আমদানির ক্ষেত্রে সহজ ও বৈষম্যহীন ব্যবস্থা প্রয়োজন। কাঁচামাল সংগ্রহ যত বেশি ব্যয়বহুল ও জটিল হবে, উৎপাদন খরচও তত বাড়বে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের গয়না প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে
সোনা আমদানির প্রক্রিয়া সহজ হলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি। তাদের হিসাবে, সহজে সোনা আমদানি করা সম্ভব হলে দেশের বাজারে গয়নার দাম প্রতি ভরিতে অন্তত ৩০,০০০ টাকা কমতে পারে। এতে ক্রেতাদের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি বৈধ পথে সোনা আমদানির সুযোগও বাড়তে পারে
গয়না শিল্পের জন্য প্রস্তাবিত ‘স্বর্ণ নীতি-২০১৮ সংশোধিত-২০২৬’ বাস্তবায়নের ওপরও জোর দিয়েছে সংগঠনটি। তাদের হিসাব অনুযায়ী, এই নীতি কার্যকর হলে খাতটি থেকে প্রতি বছর সরকারের ২,০০০-২,৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব আসতে পারে। অর্থাৎ ব্যবসার পরিবেশ সহজ করার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোরও সুযোগ রয়েছে
অপ্রকাশিত সোনা ঘোষণার বিষয়েও একটি প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি। সংগঠনটি এককালীন ফি দিয়ে অপ্রকাশিত সোনা ঘোষণার সুযোগ দেওয়ার কথা বলেছে। তাদের হিসাবে, এই ব্যবস্থা চালু হলে সরকারের অতিরিক্ত ৫০০-৭০০ কোটি টাকা রাজস্ব আসতে পারে। একই সঙ্গে দেশের মোট সোনার মজুতের একটি ডিজিটাল তথ্যভান্ডার তৈরি করা সম্ভব হবে
গয়না শিল্পকে বড় রপ্তানিমুখী খাতে পরিণত করতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০টি নতুন আধুনিক গয়না কারখানা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এসব কারখানা চালু হলে সরাসরি ৫০,০০০ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি আরও ১০০,০০০ মানুষের পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে সংগঠনটি জানিয়েছে
এই পরিকল্পনার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয় যখন দেখা যায়, বর্তমানে প্রায় ২.৮ মিলিয়ন মানুষ সরাসরি ও পরোক্ষভাবে দেশের গয়না শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। এই খাতে প্রায় ৪০,০০০ গয়না ব্যবসা রয়েছে এবং প্রায় চার লাখ কারিগর কাজ করছেন। ফলে গয়না শিল্পের সম্প্রসারণ হলে এর প্রভাব শুধু রপ্তানি আয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না, কর্মসংস্থান ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যবসাতেও এর প্রভাব পড়বে
শিল্পটিকে আরও সংগঠিত করতে ঢাকায় ১০ বিঘা জমির ওপর ‘স্বর্ণপল্লী’ নামে একটি বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি। সেখানে হীরা প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। একই জায়গায় উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ তৈরি হলে শিল্পের জন্য একটি সমন্বিত কাঠামো গড়ে উঠতে পারে
হীরার গয়নাকে ভবিষ্যতের আরেকটি বড় রপ্তানি সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে সংগঠনটি। তাদের মতে, ২০০৬ সালের অপরিশোধিত হীরা আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা হালনাগাদ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে হীরা আমদানির ওপর অতিরিক্ত শুল্ক কমানো হলে দেশে হীরা প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প দ্রুত বিকশিত হতে পারে
প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কার করা গেলে ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের হীরার গয়না রপ্তানি করতে পারবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি। এই লক্ষ্য অর্জন করা গেলে গয়না রপ্তানিতে শুধু সোনার ওপর নির্ভরতা কমবে এবং উচ্চমূল্যের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়বে
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিতে শুধু উৎপাদন বাড়ানো যথেষ্ট হবে না। বাংলাদেশের গয়না শিল্পকে মান, নকশা, কারিগরি দক্ষতা, উৎপাদন প্রযুক্তি এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে হবে। বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা অর্জনের জন্য পণ্যের মানের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন
এখানে দেশের চার লাখ কারিগরের দক্ষতা বড় সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এসব কারিগরের ঐতিহ্যবাহী দক্ষতার সঙ্গে আধুনিক নকশা ও প্রযুক্তি যুক্ত করা গেলে বাংলাদেশের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের গয়না আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিত করা সম্ভব হতে পারে
গয়না শিল্পের প্রসারে সরকারের রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্তাবিত নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বছরে ২,০০০-২,৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব এবং অপ্রকাশিত সোনা ঘোষণার সুযোগ থেকে অতিরিক্ত ৫০০-৭০০ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন কারখানা স্থাপন হলে বিনিয়োগ বাড়বে এবং এর সঙ্গে পরিবহন, নকশা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, সরবরাহ ও বিপণনের মতো বিভিন্ন খাতেও নতুন কর্মকাণ্ড তৈরি হতে পারে
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে গয়না শিল্পকে কর ও মূল্য সংযোজন করের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি। একই সঙ্গে সংগঠনটি আরও নীতিগত সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে
মূলত গয়না শিল্পকে অভ্যন্তরীণ বাজারের একটি ঐতিহ্যবাহী ব্যবসা থেকে আন্তর্জাতিক রপ্তানিমুখী শিল্পে রূপান্তর করাই এখন বড় লক্ষ্য। ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০টি আধুনিক কারখানা, ২০৩১ সালের মধ্যে বছরে ২ বিলিয়ন ডলারের হীরার গয়না রপ্তানি এবং ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে সোনা ও হীরার গয়না মিলিয়ে ৭ বিলিয়ন ডলার আয়ের পরিকল্পনা সেই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে
তবে লক্ষ্য যত বড়, বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জও তত বেশি। কাঁচামাল আমদানির জটিলতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয়, আধুনিক প্রযুক্তির ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের গয়নার পরিচিতি এখনও বড় বিষয়। এসব সমস্যার সমাধান ছাড়া শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ করে ৭ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় অর্জন করা কঠিন হবে
বাংলাদেশ যদি এই শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে পারে, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করে, কাঁচামাল আমদানি সহজ করে এবং দক্ষ কারিগরদের আধুনিক প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, তাহলে গয়না শিল্প দেশের রপ্তানি খাতের নতুন একটি শক্তিশালী ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে
প্রায় ২.৮ মিলিয়ন মানুষের সঙ্গে যুক্ত এই শিল্পের সামনে এখন বড় একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে গয়না শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা মেটানোর পণ্য থাকবে না, বরং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি বৈচিত্র্য বাড়ানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত হয়ে উঠতে পারে

