ঢাকায় কম আয়ের শ্রমজীবী মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের হিসাব কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে। জুলাই মাসে ঢাকা বিভাগে সাধারণ মজুরি বৃদ্ধির হার শহুরে মূল্যস্ফীতির হারকে ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ নিত্যপণ্যের দাম যে হারে বেড়েছে, তার তুলনায় কম আয়ের শ্রমজীবীদের মজুরি বেড়েছে কিছুটা বেশি। এতে তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ সামান্য কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ২০২৬ সালে ঢাকা বিভাগে সাধারণ মজুরি হার সূচক আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮.৭২ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে ঢাকা শহর ও অন্যান্য শহরাঞ্চল মিলিয়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮.২৪ শতাংশ। অর্থাৎ মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে ০.৪৮ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।
এই ব্যবধান খুব বড় না হলেও বর্তমান মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় এর গুরুত্ব রয়েছে। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে যদি পণ্যের দাম মানুষের আয়ের চেয়ে দ্রুত বাড়ে, তাহলে বেতন বা মজুরি বাড়লেও মানুষের হাতে থাকা অর্থের প্রকৃত মূল্য কমে যায়। বিপরীতে আয় বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতিকে ছাড়িয়ে গেলে একই আয়ে তুলনামূলকভাবে কিছুটা বেশি পণ্য ও সেবা কেনার সুযোগ তৈরি হয়।
তবে এই স্বস্তির চিত্রটি মূলত ঢাকা বিভাগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। জাতীয় পর্যায়ের হিসাব এখনো ভিন্ন বাস্তবতা দেখাচ্ছে।
ঢাকায় মজুরি বাড়লেও জাতীয় চিত্রে পিছিয়ে আয়
জুলাই মাসে সারা দেশে সাধারণ মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.২২ শতাংশ। একই মাসে দেশের সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩২ শতাংশ। অর্থাৎ জাতীয়ভাবে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে ০.১০ শতাংশীয় পয়েন্ট কম।
এ কারণে ঢাকা বিভাগের পরিস্থিতিকে দেশের সামগ্রিক শ্রমবাজারের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখা যাবে না। ঢাকায় মজুরি বৃদ্ধির হার শহুরে মূল্যস্ফীতিকে সামান্য ছাড়ালেও জাতীয় পর্যায়ে এখনো মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক ব্যবধান তৈরি হয়নি।
তবে ঢাকার এই প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ। রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় শ্রমের চাহিদা, শিল্পকারখানা, নির্মাণকাজ, পরিবহন, সেবা খাত এবং বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের কারণে মজুরি কাঠামো অনেক সময় দেশের অন্য অঞ্চলের তুলনায় দ্রুত পরিবর্তিত হয়। ফলে ঢাকা বিভাগের মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির ওপরে উঠে আসা শ্রমজীবীদের জন্য কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে।
সেবা খাতে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে মজুরি
ঢাকা বিভাগে জুলাই মাসে মজুরি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল সেবা খাত। এ খাতে মজুরি বেড়েছে ৯.৩০ শতাংশ। শিল্প খাতে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.৬৩ শতাংশ এবং কৃষিতে ৮.৬২ শতাংশ।
অর্থাৎ তিনটি প্রধান খাতের মধ্যে সেবা খাতের শ্রমিকদের মজুরি সবচেয়ে দ্রুত বেড়েছে। শিল্প ও কৃষি খাতেও মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ শতাংশের ওপরে।
জাতীয় পর্যায়ের সঙ্গে তুলনা করলেও ঢাকার তিনটি খাতেই মজুরি বৃদ্ধির হার বেশি ছিল। সারা দেশে জুলাই মাসে সেবা খাতে মজুরি বেড়েছে ৮.৩৯ শতাংশ, শিল্প খাতে ৮.১৫ শতাংশ এবং কৃষি খাতে ৮.২৪ শতাংশ।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ঢাকা বিভাগের সেবা খাতে মজুরি বৃদ্ধির হার জাতীয় সেবা খাতের তুলনায় প্রায় এক শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি। শিল্প ও কৃষিতেও ঢাকার মজুরি বৃদ্ধির হার জাতীয় হারের চেয়ে কিছুটা বেশি।
এর অর্থ হতে পারে, রাজধানীকেন্দ্রিক শ্রমবাজারে কর্মীদের মজুরি সমন্বয়ের গতি দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় কিছুটা বেশি। তবে শুধু একটি মাসের তথ্য দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা নিশ্চিত করা যাবে না। পরবর্তী মাসগুলোতেও একই ধারা বজায় থাকে কি না, সেটিই হবে আসল বিষয়।
মূল্যস্ফীতি কমেছে, তবু স্বস্তি পুরোপুরি ফেরেনি
মজুরি বৃদ্ধির এই তথ্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশের মূল্যস্ফীতিও কিছুটা কমেছে। জুলাই মাসে বাংলাদেশের সাধারণ মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছে ৮.৩২ শতাংশে। জুন মাসে এই হার ছিল ৯.১৬ শতাংশ।
অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর ফলে মানুষের ওপর নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির চাপ কিছুটা কমেছে। একই সঙ্গে মজুরি বৃদ্ধির হারও যদি মূল্যস্ফীতির ওপরে থাকে, তাহলে কম আয়ের মানুষের আর্থিক পরিস্থিতিতে ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে মূল্যস্ফীতি ৮.৩২ শতাংশে থাকা এখনো যথেষ্ট উঁচু হার। পণ্যের দাম বাড়ার গতি কমেছে মানেই পণ্যের দাম কমে গেছে—এমন নয়। বরং আগের তুলনায় দাম বাড়ার হার কিছুটা কমেছে। ফলে কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে যেসব পরিবার ক্রয়ক্ষমতা হারিয়েছে, তাদের জন্য স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে আরও সময় লাগতে পারে।
এ কারণেই মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি ইতিবাচক হলেও এটিকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক স্বস্তি হিসেবে দেখার আগে আরও কিছু সময়ের তথ্য প্রয়োজন।
দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতিতেও কিছুটা উন্নতি
শুধু মাসভিত্তিক মূল্যস্ফীতিই কমেনি, দীর্ঘ সময়ের গড় হিসাবেও কিছুটা উন্নতি হয়েছে।২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ১২ মাসের চলমান গড় মূল্যস্ফীতি কমে ৮.৬৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর আগের ১২ মাসের সময়ে এই হার ছিল ৯.৭৭ শতাংশ।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ১২ মাসের চলমান গড় মূল্যস্ফীতিও কমেছে। এটি অর্থনীতিতে মূল্যচাপ ধীরে ধীরে কমার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। তবে একই সঙ্গে মানুষের আয় কতটা দ্রুত বাড়ছে এবং সেই আয় দিয়ে আগের তুলনায় কতটা বেশি পণ্য ও সেবা কেনা যাচ্ছে, সেটিই জীবনযাত্রার বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মজুরি সূচকে বড় পরিবর্তন এনেছে পরিসংখ্যান ব্যুরো
সাম্প্রতিক তথ্য প্রকাশের পাশাপাশি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ভোক্তা মূল্যসূচক এবং মজুরি হার সূচকের ভিত্তিবছরও পরিবর্তন করেছে। নতুন ভিত্তিবছর নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২১-২২।
নতুন মজুরি হার সূচক দেশের ৬৪ জেলার ৬৩টি নির্দিষ্ট পেশার মাসিক মজুরির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হচ্ছে। এসব পেশার মধ্যে কৃষিতে ১৭টি, শিল্পে ৩০টি এবং সেবা খাতে ১৬টি পেশা রয়েছে।
এই পরিবর্তনের ফলে দেশের শ্রমবাজারে মজুরির গতিপ্রকৃতি আগের তুলনায় আরও বিস্তৃতভাবে পরিমাপ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে কম মজুরি পাওয়া দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকদের আয় কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, তা বোঝার ক্ষেত্রে নতুন সূচকটি গুরুত্বপূর্ণ।
মজুরি হার সূচকের মূল উদ্দেশ্য হলো সময়ের সঙ্গে নামমাত্র মজুরির পরিবর্তন পরিমাপ করা। পাশাপাশি এর মাধ্যমে প্রকৃত মজুরি এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানের পরিবর্তনও বিশ্লেষণ করা যায়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো একই সঙ্গে ময়মনসিংহ বিভাগের জন্য আলাদা সূচক তৈরির কাজও শুরু করেছে।
আসল প্রশ্ন এখন ক্রয়ক্ষমতা কতটা ফিরছে
মজুরি ৮.৭২ শতাংশ বেড়েছে—এই সংখ্যা একা দেখলে বিষয়টি বেশ ইতিবাচক মনে হতে পারে। কিন্তু একজন শ্রমিকের বাস্তব জীবনে এর প্রভাব বুঝতে হলে তার আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি খাদ্য, বাসা ভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কতটা বেড়েছে, সেটিও দেখতে হবে।
ঢাকা বিভাগের মজুরি বৃদ্ধির হার শহুরে মূল্যস্ফীতির চেয়ে ০.৪৮ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি। এর অর্থ হলো, সামগ্রিকভাবে সূচকে অন্তর্ভুক্ত শ্রমিকদের আয় মূল্যবৃদ্ধির তুলনায় সামান্য দ্রুত বেড়েছে। কিন্তু এই ব্যবধান খুব বেশি নয়। ফলে এটিকে বড় ধরনের আয় বৃদ্ধি না বলে বরং দীর্ঘ সময়ের মূল্যচাপের মধ্যে একটি ছোট ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।
আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। মজুরি হার সূচক মূলত নির্দিষ্ট কম আয়ের দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকদের মজুরি পরিবর্তন পরিমাপ করে। তাই দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের আয় একই হারে বেড়েছে—এমন সিদ্ধান্ত এই তথ্য থেকে নেওয়া যাবে না।
তবু অর্থনীতির জন্য প্রবণতাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মূল্যস্ফীতি যখন ধীরে ধীরে কমে এবং একই সময়ে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির হার কিছুটা ওপরে উঠে আসে, তখন ভোক্তাদের ব্যয় করার সক্ষমতা ধীরে ধীরে বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এর প্রভাব পরে বাজারের চাহিদা, খুচরা বিক্রি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও পড়তে পারে।
সামনে নজর থাকবে মজুরি ও দামের ব্যবধানের দিকে
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান কতটা কমছে। শুধু মূল্যস্ফীতি কমলেই সাধারণ মানুষের স্বস্তি নিশ্চিত হয় না। একই সঙ্গে আয়ও বাড়তে হয়।
জুলাইয়ের তথ্য ঢাকা বিভাগের ক্ষেত্রে সেই দিক থেকে একটি আশাব্যঞ্জক ইঙ্গিত দিয়েছে। মজুরি বৃদ্ধির হার শহুরে মূল্যস্ফীতিকে ছাড়িয়েছে। জাতীয় পর্যায়েও মূল্যস্ফীতি কমে ৮.৩২ শতাংশে নেমেছে। কিন্তু জাতীয় মজুরি বৃদ্ধি এখনো ৮.২২ শতাংশে থাকায় পুরো দেশের শ্রমজীবীদের জন্য একই ধরনের স্বস্তি তৈরি হয়নি।
তাই আগামী কয়েক মাসের তথ্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হবে। যদি মূল্যস্ফীতি আরও কমে এবং মজুরি বৃদ্ধির হার ধারাবাহিকভাবে তার ওপরে থাকে, তাহলে শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতায় আরও দৃশ্যমান উন্নতি হতে পারে। বিপরীতে পণ্যের দাম আবার দ্রুত বাড়তে শুরু করলে সাম্প্রতিক ইতিবাচক ব্যবধানটিও দ্রুত মুছে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে জুলাইয়ের পরিসংখ্যান বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় কোনো পরিবর্তনের ঘোষণা না দিলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমছে এবং অন্তত ঢাকা বিভাগে কম আয়ের শ্রমিকদের মজুরি সেই চাপের তুলনায় কিছুটা দ্রুত বাড়ছে। দীর্ঘ সময়ের উচ্চ মূল্যস্ফীতির পর এই পরিবর্তন সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির দরজা খুলতে পারে কি না, তার উত্তর নির্ভর করবে আগামী মাসগুলোতে আয় ও দামের এই ব্যবধান কতটা স্থায়ী হয় তার ওপর।

