দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন থাকলেও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য পুরোপুরি থেমে যায়নি। বরং গত অর্থবছরে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্য কিছুটা বেড়েছে। সম্প্রতি ভারতের কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির (সিআইআই) একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফরও ব্যবসায়ী মহলে নতুন করে আশার বার্তা দিয়েছে।
দুই দেশের ব্যবসায়ী নেতারা বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পথে থাকা বাধাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের জন্য ব্যবসায়ী-ব্যবসায়ী পর্যায়ে যৌথ কর্মদল গঠনে সম্মত হয়েছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এটিই ছিল বাংলাদেশে ভারতের কোনো বড় ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রথম উচ্চপর্যায়ের সফর।
সিআইআই ভারতের অন্যতম প্রধান ব্যবসায়ী সংগঠন। ১৮৯৫ সালে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড আয়রন ট্রেডস অ্যাসোসিয়েশন নামে যাত্রা শুরু করা সংগঠনটি ১৯৯২ সালে বর্তমান নাম ধারণ করে। ঢাকায় এসে প্রতিনিধিদলটি বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী, নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছে।
ব্যবসা সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সফর দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্কের জমে থাকা বরফ কিছুটা গলানোর সুযোগ তৈরি করেছে। এখন রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে পাশ কাটিয়ে বাণিজ্যিক স্বার্থে দুই দেশের ব্যবসায়ী মহল কতটা এগোতে পারে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক টানাপোড়েনেও বাণিজ্য চলছে
২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক দ্রুত অবনতির দিকে যায়। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্কেও নানা মতবিরোধ দেখা দেয়।
এই সময়ে ভারত বাংলাদেশের জন্য বিভিন্ন বাণিজ্যিক সুবিধা সীমিত করে। তৃতীয় দেশে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ভারতীয় সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দর ব্যবহার করে বাংলাদেশের যে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা ছিল, তা বাতিল করে ভারত।
বাংলাদেশ থেকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলসহ কয়েকটি অঞ্চলে স্থলপথে তৈরি পোশাকসহ কিছু পণ্য আমদানিতেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। আরও কিছু বাংলাদেশি পণ্যের ওপর অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঢাকাও সীমিত পরিসরে পাল্টা পদক্ষেপ নেয়। ফলে রাজনৈতিক বিরোধের প্রভাব দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কেও পড়তে থাকে।তবে পরিসংখ্যান বলছে, এই টানাপোড়েনের মধ্যেও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।
আবার বাড়ছে দুই দেশের বাণিজ্য
দুই দেশের পণ্য বাণিজ্য ২০২১-২২ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১৫.৬৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। এরপর তা ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২৬ শতাংশ কমে ১১.৬২ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে আরও ৯ শতাংশ কমে বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০.৬০ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের আগেই দুই দেশের বাণিজ্যে নিম্নমুখী প্রবণতা শুরু হয়েছিল।
এরপর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সামান্য ঘুরে দাঁড়িয়ে ৬.৩৫ শতাংশ বাড়ে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আরও ১৩ শতাংশ বেড়েছে।
তবে এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশই এসেছে ভারত থেকে বাংলাদেশের আমদানি বৃদ্ধির কারণে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় অপরিবর্তিত থেকে ১.৭৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরে এই রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১.৭৭ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে ভারত থেকে বাংলাদেশের আমদানি ১৫ শতাংশ বেড়ে ১০.৯৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ৯.৪৭ বিলিয়ন ডলার।ফলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ৭.৭০ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৯.২০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বাণিজ্য ঘাটতি কেন এত বেশি?
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বড় বাণিজ্য ঘাটতি নতুন কোনো বিষয় নয়। বাংলাদেশের শিল্প ও ভোক্তা বাজার ভারতের বিভিন্ন পণ্যের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।
ভারত থেকে বাংলাদেশ মূলধনী পণ্য, কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য এবং ভোগ্যপণ্য আমদানি করে। ভৌগোলিকভাবে কাছাকাছি হওয়ায় সড়ক, রেল ও নৌপথে ভারতের পণ্য আনা তুলনামূলকভাবে সহজ ও কম ব্যয়বহুল।
অন্যদিকে ভারতের জন্য বাংলাদেশ একটি বড় ও সম্ভাবনাময় বাজার। দেশটিতে ভোক্তার চাহিদা বাড়ছে এবং ভারতীয় পণ্যের জন্যও বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ভারতের রপ্তানি বাজারগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ বর্তমানে সপ্তম বৃহত্তম গন্তব্য।তাই দুই দেশের অর্থনীতিই কোনো না কোনোভাবে একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত।
বিনিয়োগেও দেখা দিয়েছে ধাক্কা
রাজনৈতিক সম্পর্কের অবনতির প্রভাব ভারতের বিনিয়োগেও পড়েছে।
বাংলাদেশে ভারতের নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭২.৩৪ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৩২.৮৩ মিলিয়ন ডলারে উঠেছিল। কিন্তু ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ১০৫.৮১ মিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে ভারতের নিট প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৮৭.৬০ মিলিয়ন ডলারে।
শুধু দ্বিপক্ষীয় রাজনৈতিক টানাপোড়েনই নয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বিদেশি বিনিয়োগের জন্য খুব একটা অনুকূল ছিল না। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের অস্থিরতার পর বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতেও সময় লেগেছে।
পোশাক খাতেও বড় সম্ভাবনা
দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তৈরি পোশাক শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের জন্য বড় প্রশ্ন হলো—কীভাবে পোশাক উৎপাদনকারীদের কাছে দেশকে আরও আকর্ষণীয় রাখা যায় এবং নতুন বিনিয়োগ ধরে রাখা যায়।
অন্যদিকে ভারতের জন্যও একটি কৌশলগত প্রশ্ন রয়েছে—বাংলাদেশকে শুধু ভারতের পণ্যের বড় বাজার হিসেবে দেখা হবে, নাকি দেশটির পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের সরবরাহব্যবস্থার আরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
এই প্রশ্নের উত্তর দুই দেশের ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনে পর্যটন খাতও ক্ষতির মুখে পড়েছে।
ভারতের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রায় ২১ লাখ ২০ হাজার বাংলাদেশি পর্যটক ভারত ভ্রমণ করেছিলেন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ১৭ শতাংশ কমে ১৭ লাখ ৫০ হাজারে নেমে আসে।
২০২৫ সালে তা আরও ৭৩ শতাংশ কমে মাত্র ৪ লাখ ৩০ হাজারে দাঁড়ায়।
প্রায় দুই বছর ভারতীয় পর্যটন ভিসা কার্যত বন্ধ থাকায় এই পতন ঘটে। এতে ভারতের পর্যটন খাতও উল্লেখযোগ্য রাজস্ব হারিয়েছে। অবশ্য দুই মাস আগে বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটন ভিসা আবার চালু হয়েছে।
সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা মেনে নেওয়ার তাগিদ
পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থনীতি একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে দীর্ঘদিন বাধাগ্রস্ত করা কোনো পক্ষের জন্যই লাভজনক হবে না।
বরং পরিবর্তিত বাস্তবতা মেনে নিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়ানোর পথ খুঁজে বের করাই দুই দেশের স্বার্থে বেশি কার্যকর।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করে জনগণের সিদ্ধান্তকে সম্মান করা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্ককে কোনো একপক্ষের আধিপত্যের বদলে পারস্পরিক স্বার্থ ও সমতার ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
ভূরাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশের ওপর ভারতের প্রভাব থাকলেও সেই প্রভাব ব্যবহার করে সম্পর্ক পরিচালনা করা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না। বরং উভয় দেশের জন্য লাভজনক একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্কই হতে পারে টেকসই সমাধান।
ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন ইন্ডিয়া ব্র্যান্ড ইকুইটি ফাউন্ডেশনও সম্প্রতি বলেছে, দুই দেশের সম্পর্ক এখন প্রচলিত সহযোগিতার গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও পরিণত ও বহুমুখী অংশীদারত্বের দিকে যাচ্ছে।
পর্যটন, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা এখনো দুই দেশের মানুষকেন্দ্রিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। পাশাপাশি প্রযুক্তি ও টেকসই উন্নয়নকেন্দ্রিক সহযোগিতার গুরুত্বও বাড়ছে।
এখন এই সম্ভাবনাগুলো বাস্তবে কতটা কাজে লাগানো যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে নয়াদিল্লির সদিচ্ছা এবং ঢাকা-দিল্লির ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগের ওপর।

