নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতির কিছু সূচকে উন্নতি হলেও সামগ্রিকভাবে নেতিবাচক প্রবণতাই বেশি বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মূল্যায়নে, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ভিত্তি এখনো দুর্বল এবং বড় অংশের সমস্যা কাঠামোগত।
সোমবার রাজধানীতে আয়োজিত এক মিডিয়া সংলাপে সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কার্যক্রম পর্যালোচনা তুলে ধরেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। সিপিডির পর্যালোচনায় অর্থনীতি ও সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের ৩৬২টি পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
৩১ সূচকের ১৯টিতে অবনতি। সিপিডির সামগ্রিক অর্থনৈতিক মূল্যায়নে ৩১টি প্রধান সূচকের মধ্যে ১২টিতে উন্নতি হলেও ১৯টিতে অবনতি হয়েছে। অর্থাৎ কিছু ক্ষেত্রে স্বস্তি এলেও অর্থনীতির বড় একটি অংশে চাপ রয়ে গেছে।
সংস্থাটির মতে, সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনীতি দুর্বল অবস্থায় ছিল। ব্যাংকিং খাতের সমস্যা, রাজস্ব ঘাটতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা ও অনাদায়ী ঋণের মতো পুরোনো সংকটের সঙ্গে নতুন করে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও জ্বালানি সংকট যুক্ত হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি কমলেও মানুষের স্বস্তি সীমিত। সিপিডির হিসাবে, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে নেমে ৭ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখনো বেশি হওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রত্যাশিত স্বস্তি আসেনি। প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধিও নেতিবাচক থাকায় মূল্যস্ফীতি কমার সুফল মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি।
রাজস্ব আদায়ে বড় চাপ। অর্থনীতির অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে রাজস্ব সংগ্রহের বিষয়টি তুলে ধরেছে সিপিডি। সংস্থাটির হিসাবে মোট কর রাজস্বের প্রবৃদ্ধি মার্চ-মে সময়ে ১২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৯ শতাংশে নেমেছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ঘাটতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সিপিডি। এতে উন্নয়ন ব্যয় ও এডিপি বাস্তবায়নে চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও স্বস্তির খবর নেই। ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলার প্রবৃদ্ধিও দুর্বল হয়েছে।সিপিডির মতে, এসব সূচক বেসরকারি বিনিয়োগ দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে না।
গ্যাস সংকটে শিল্পে ধাক্কা। শিল্প উৎপাদনের জন্য গ্যাস সংকটকে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছে সিপিডি। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যা, এলএনজি সংগ্রহের জটিলতা এবং সরবরাহ পরিকল্পনার দুর্বলতার কারণে টেক্সটাইল, স্টিল, কাগজ, পার্টিকেল বোর্ড ও সিরামিকসহ বিভিন্ন শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, শিল্প উৎপাদনের বিভিন্ন সূচকের প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং শিল্প খাতে গ্যাসের ব্যবহারও কমেছে।
রিজার্ভে স্বস্তি, বহিঃখাতে চাপ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে সরকারের জন্য তুলনামূলক স্বস্তির জায়গা হিসেবে দেখেছে সিপিডি। ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ১২ আগস্টের মধ্যে বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ৩০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
তবে একই সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে এবং চলতি হিসাব উদ্বৃত্ত থেকে ঘাটতিতে গেছে। ফলে রিজার্ভ বাড়লেও বৈদেশিক খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতিকে পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক মনে করছে না সংস্থাটি।
ব্যাংক খাতে সংস্কার, কিন্তু আস্থার প্রশ্ন রয়েছে। ব্যাংকিং খাতে পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ইসলামী ব্যাংক একীভূত করা এবং ব্যাংক রেজল্যুশন আইন প্রয়োগের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে সিপিডি।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা, শীর্ষ পর্যায়ের নিয়োগ এবং ব্যাংক খাতের কাঠামোগত সংস্কার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সংস্থাটির মতে, ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল করতে একটি সুস্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ সংস্কার রোডম্যাপ প্রয়োজন।
সরকারের সব কর্মকাণ্ডকে নেতিবাচক হিসেবে দেখেনি সংস্থাটি। সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধন, সংসদ সদস্যদের সরকারি গাড়ি ও প্লট না নেওয়ার সিদ্ধান্ত, বিসিএস নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সংস্কার, ডিজিটাল আদালত ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং কিছু কর-সুবিধার মতো উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সমন্বিত সংস্কারের তাগিদ। সিপিডির মূল্যায়ন হলো, শুধু মূল্যস্ফীতি কমা বা রিজার্ভ বাড়াকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পূর্ণাঙ্গ মাপকাঠি হিসেবে দেখা যাবে না। বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধিতে দৃশ্যমান উন্নতি না এলে অর্থনীতির স্থায়ী পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।
এ জন্য আগামী সময়ে রাজস্ব, ব্যাংকিং, জ্বালানি, উন্নয়ন ব্যয়, বিনিয়োগ ও প্রশাসনিক সংস্কারকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে একটি সমন্বিত কর্মসূচির আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি। সার্বিকভাবে সিপিডির বার্তা হলো—সরকারের প্রথম ছয় মাসে কিছু স্বস্তির জায়গা তৈরি হলেও অর্থনীতির বড় কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো এখনো কাটেনি। তাই পরবর্তী সময়ে উদ্যোগের চেয়ে বাস্তবায়নের গতি এবং সংস্কারের সমন্বয়ই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

