বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্র তৈরি করতে সৃজনশীল অর্থনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এই খাতকে মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে আরও শক্তভাবে যুক্ত করে জিডিপিতে এর অবদান ১.৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন করে ৫ লাখ কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তরুণ, শিল্পী, কারুশিল্পী, কনটেন্ট নির্মাতা ও সৃজনশীল উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি দেশের সংস্কৃতি ও সৃজনশীল পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করা হবে।
দেশজুড়ে তৈরি হবে সৃজনশীল কেন্দ্র
বাজেট নথি অনুযায়ী, সৃজনশীল শিল্পের টেকসই বিকাশে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হবে। এ জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হবে, যার বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমাও নির্ধারণ করা হবে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে ‘সৃজনশীল কেন্দ্র’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব কেন্দ্রে সাংস্কৃতিক আয়োজনের স্থান, পাঠের সুযোগসহ বইয়ের দোকান, চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ব্যবস্থা, ছোট খাবারের দোকান এবং স্থানীয় পণ্য প্রদর্শন ও বিপণনের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা থাকবে।
দেশজুড়ে আঞ্চলিক সৃজনশীল কেন্দ্র গড়ে তুলতে ১০ বছর মেয়াদি বিনিয়োগ কৌশল ও সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছে।
এ ছাড়া পূর্বাচলে ১৬০ একর জমির ওপর সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে বিশ্বমানের একটি কেন্দ্রীয় সৃজনশীল কেন্দ্র গড়ে তোলার সম্ভাব্যতা যাচাইও জরুরি ভিত্তিতে করা হচ্ছে।
কারওয়ান বাজারে, তেজগাঁওয়ে সার্ভে জেনারেলের কার্যালয়ের পাশের অব্যবহৃত জমি এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের খালি শিল্প প্লটেও এ ধরনের কেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাই করছে সরকার।
বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও সৃজনশীল কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতেও এমন কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়েও হবে উদ্ভাবন কেন্দ্র
প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইতোমধ্যে উদ্ভাবন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও স্নাতক পর্যায়ের কলেজগুলোতেও এসব কেন্দ্র স্থাপনের জন্য একটি রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে।
এদিকে ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ উদ্যোগের আওতায় সৃজনশীল অর্থনীতিভিত্তিক পণ্য চিহ্নিত ও উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এই তালিকায় রয়েছে তাঁতপণ্য, মৃৎশিল্প, বয়নপণ্য, শীতলপাটি, শতরঞ্জি, কাঠের খেলনা, হাতে তৈরি গয়না এবং পোড়ামাটির বিভিন্ন পণ্য।
স্থানীয় পণ্যের নকশায় আসবে পরিবর্তন
সৃজনশীল পণ্যের মান ও নকশা আরও উন্নত করতে দেশের শীর্ষস্থানীয় নকশাবিদদের নিয়ে একটি ‘জাতীয় নকশাবিদ পুল’ গড়ে তোলা হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় এবং খ্যাতনামা ফ্যাশন ডিজাইনারদের সহযোগিতায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের নকশা কেন্দ্রকে আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সরকারের লক্ষ্য, স্থানীয় কারুশিল্প ও সৃজনশীল পণ্যকে শুধু দেশের বাজারে সীমাবদ্ধ না রেখে আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী করে তোলা।
সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ঘিরে বাড়বে পর্যটন
সৃজনশীল অর্থনীতির সঙ্গে পর্যটন খাতকেও যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং পুরোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক পর্যটন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে দুই থেকে তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে দুটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এর আওতায় ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উৎসব আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
পর্যটন খাতের দক্ষতা বাড়াতে আন্তর্জাতিক মানের একটি বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। রান্নাবান্নাসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পেশায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রশিক্ষণের মান নিশ্চিত করতে ‘আন্তর্জাতিক আতিথেয়তা মানদণ্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
একই সঙ্গে দেশের পর্যটনের সম্ভাবনা, বৈচিত্র্য এবং আধুনিক সৃজনশীল বিষয়গুলোকে বিবেচনায় নিয়ে একটি সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করার কাজও চলছে।
বিশ্ববাজারে যাবে ‘বাংলাদেশে তৈরি’ সৃজনশীল পণ্য
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সৃজনশীল পণ্যের পরিচিতি বাড়াতে স্থানীয় কনটেন্ট নির্মাতা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশি বাজারে প্রবেশে সহায়তা করবে সরকার।
আন্তর্জাতিক উৎসব ও বাজারে দেশের সৃজনশীল সক্ষমতা তুলে ধরতে ‘বাংলাদেশে তৈরি’ নামে একটি জাতীয় ব্র্যান্ড চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক মানের অনলাইন বিনোদন প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়াতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন স্টুডিও স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নতুন উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং রপ্তানির উপযোগী বাণিজ্যিক প্রকল্প উৎসাহিত করতে ফলাফলভিত্তিক অনুদান ব্যবস্থাও চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
গ্রামীণ কারুশিল্পীদেরও যুক্ত করা হবে বৈশ্বিক বাজারে
সরকারের পরিকল্পনায় গ্রামের কারুশিল্পীদেরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পণ্যের মান উন্নয়ন, নকশায় বৈচিত্র্য আনা এবং কারুশিল্পীদের মূলধারার অর্থায়ন ও উন্নয়ন কার্যক্রমের আওতায় নিয়ে আসার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে প্রাথমিকভাবে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এর পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা খাত থেকেও আরও ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সংস্কৃতি, শিল্প, কারুশিল্প, পর্যটন, চলচ্চিত্র ও ডিজিটাল সৃষ্টিশীলতার মতো খাতগুলো শুধু সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবেও সামনে আসতে পারে।

