দেশের ১৩টি মহানগরীর ৫১ হাজারের বেশি বেকার ও চাকরিপ্রত্যাশী তরুণ-তরুণীকে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ দিতে ৬৮৩ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণদের আয়মূলক কাজে যুক্ত করার পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তা তৈরিই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
‘দেশের সকল মহানগরীতে কর্মহীন যুবকদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি’ শীর্ষক প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করেছে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর। অনুমোদনের জন্য প্রস্তাবটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় আধুনিক ও চাহিদাভিত্তিক বিভিন্ন বিষয়ে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীদের অন্তত ৬০ থেকে ৭০ শতাংশকে আয়মূলক কাজে যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
শুধু কারিগরি দক্ষতা নয়, অনলাইন মার্কেটপ্লেসে কাজের পদ্ধতি, প্রোফাইল ও পোর্টফোলিও তৈরি, কাজ পাওয়ার কৌশল, বিডিং এবং বিদেশি ক্লায়েন্টের সঙ্গে যোগাযোগ ও কাজ পরিচালনার বিষয়েও প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে অংশগ্রহণকারীদের একটি বড় অংশ আয় শুরু করতে পারবেন। প্রশিক্ষণ শেষে সনদ দেওয়ার পাশাপাশি জব লিংকেজ, মেন্টরশিপ ও ফলো-আপ সহায়তার পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রশিক্ষণ শেষে তরুণরা যাতে সরাসরি অনলাইন কাজ শুরু করতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী ল্যাপটপসহ প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম দেওয়ার কথাও প্রকল্প প্রস্তাবে রাখা হয়েছে।
প্রকল্পে নিম্নআয়ের ও প্রান্তিক পরিবারের তরুণদের পাশাপাশি নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। মোট প্রশিক্ষণার্থীর ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ নারী রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকার মনে করছে, এর মাধ্যমে নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে একটি শক্তিশালী ফ্রিল্যান্সার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সম্ভব হবে। অভিজ্ঞ ফ্রিল্যান্সারদের মাধ্যমে নতুনদের মেন্টরশিপ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ) প্রিয়সিন্ধু তালুকদার বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ চাকরির বাজারে সুযোগ সীমিত হলেও ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের জন্য উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি থাকা বাধ্যতামূলক নয়। কম্পিউটারের মৌলিক জ্ঞান এবং শেখার আগ্রহ থাকাই গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর মতে, প্রশিক্ষণ কোর্স সাধারণত তিন মাসের হবে। এতে বেসিক ও অ্যাডভান্সড—দুই স্তর থাকবে। বেসিক পর্যায়ে ভালো ফল করা প্রশিক্ষণার্থীদের পরবর্তী পর্যায়ে অ্যাডভান্সড প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া হবে। তবে শুধু প্রশিক্ষণ দিলেই সাফল্য নিশ্চিত হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিয়মিত অনুশীলন, আগ্রহ ও মনোযোগের ওপরও প্রশিক্ষণার্থীদের সফলতা নির্ভর করবে।
প্রকল্পের আওতায় ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ চট্টগ্রাম, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, খুলনা, রাজশাহী, বগুড়া, সিলেট, রংপুর, বরিশাল, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ—এই ১৩ মহানগরীতে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
কর্মকর্তাদের মতে, এসব মহানগরে দেশের বিভিন্ন এলাকার বিপুলসংখ্যক তরুণ বসবাস করেন। ফলে মহানগরভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তুলনামূলক বেশি তরুণকে ডিজিটাল কর্মসংস্থানের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠী রয়েছে। এই জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা গেলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে জনমিতিক সুবিধা বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগ দীর্ঘস্থায়ী নয়। তাই দ্রুত দক্ষতা উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখের বেশি। এর একটি বড় অংশ তরুণ। এমন পরিস্থিতিতে ডিজিটাল দক্ষতা বাড়িয়ে দেশি-বিদেশি অনলাইন মার্কেটপ্লেসে তরুণদের যুক্ত করাকে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাময় পথ হিসেবে দেখছে সরকার।
তবে প্রকল্পটির সফলতা শুধু প্রশিক্ষণ দেওয়ার সংখ্যায় নয়, প্রশিক্ষণ শেষে কতজন বাস্তবে কাজ পাচ্ছেন এবং নিয়মিত আয় করতে পারছেন—তার ওপর নির্ভর করবে। বিশেষ করে ল্যাপটপ, মেন্টরশিপ, আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে প্রবেশ এবং প্রশিক্ষণ-পরবর্তী সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এ উদ্যোগ তরুণদের কর্মসংস্থানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

