দেশের খোলাবাজারে ডলার লেনদেনের ক্ষেত্রে নতুন দাম বেঁধে দিয়েছে মানি চেঞ্জারদের শীর্ষ সংগঠন। এখন থেকে মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি মার্কিন ডলার কিনবে ১২৫ টাকা ৫০ পয়সায়, আর বিক্রি করবে ১২৬ টাকা ৫০ পয়সায়।
গত সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীতে সংগঠনটির প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই দাম ঘোষণা করা হয়। সংগঠনের সভাপতি জানান, খোলাবাজারে ডলারের দাম যাতে হঠাৎ ওঠানামা না করে এবং বাজার একটা স্থিতিশীল অবস্থায় থাকে, সেই লক্ষ্য মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন এই দাম সংগঠনের নিজস্ব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে দেশের সব মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানকে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের মহাসচিব, কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতারা এবং বিভিন্ন মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের মালিকরা।
ডলার বাজারের অস্থিরতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিতর্কের প্রসঙ্গ টেনে সভাপতি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, বাজারে অনিয়ম বা কারসাজির জন্য মানি চেঞ্জারদের দায়ী করাটা সঠিক নয়। তার ভাষ্যমতে, এই খাতের ব্যবসার পরিধি এতটাই সীমিত যে চাইলেও কোনো প্রতিষ্ঠান একা বাজার নিয়ন্ত্রণ বা কারসাজি করার মতো সামর্থ্য রাখে না। বরং করোনা মহামারির পরবর্তী সময়ে ডলার বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক বিপুল অঙ্কের মুনাফা করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। অথচ বাজারে কোনো সমস্যা দেখা দিলেই এর দায় মানি চেঞ্জারদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার একটা প্রবণতা লক্ষ করা যায়, যা তার মতে অযৌক্তিক।
মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিক কী ধরনের কাজ করে, সে বিষয়েও পরিষ্কার ধারণা দেন সভাপতি। তিনি জানান, এসব প্রতিষ্ঠান শুধু হাতে হাতে থাকা বৈদেশিক মুদ্রা বা নগদ ক্যাশ কারেন্সি কেনাবেচা করে থাকে। কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক বা ভার্চুয়াল মুদ্রার লেনদেনে তারা যুক্ত নয়, এমনকি বিদেশ থেকে সরাসরি রেমিট্যান্স আনার সক্ষমতাও তাদের নেই। মূলত বিদেশফেরত যাত্রী এবং প্রবাসে কর্মরত শ্রমিকরা দেশে ফেরার সময় যে নগদ বৈদেশিক মুদ্রা সঙ্গে নিয়ে আসেন, সেটাই এই ব্যবসার প্রধান উৎস। প্রবাসীদের কষ্টার্জিত সেই অর্থ কিনে নিয়ে বৈধ পথে দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত করার মাধ্যমে মানি চেঞ্জাররা পরোক্ষভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতেও ভূমিকা রাখে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণ করার মতো আর্থিক সক্ষমতা মানি চেঞ্জারদের নেই বলেও স্পষ্ট করে জানান সংগঠনের সভাপতি। তার প্রশ্ন, এই খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর যে মূলধন ও পরিধি, তাতে করে দেশের সামগ্রিক ডলার বাজার নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ আদৌ কতটুকু থাকে? তিনি মনে করিয়ে দেন, দেশের অর্থনীতি ও মুদ্রানীতি নিয়ন্ত্রণের মূল দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে। অথচ বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলেই বারবার অভিযোগ ওঠে যে মানি চেঞ্জাররাই দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরও জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক আন্তঃব্যাংক লেনদেনের ক্ষেত্রে নিজেরাই ডলার কেনাবেচা করে এবং তফসিলি ব্যাংকগুলোর জন্য সুনির্দিষ্টভাবে দামও বেঁধে দেয়। কিন্তু মানি চেঞ্জারদের ক্ষেত্রে এমন স্পষ্ট কোনো নীতিমালা বা নির্দেশনা নেই, যার ফলে একধরনের বৈষম্যের মধ্যে পড়তে হয় এই খাতকে। এই বৈষম্য দূর করে বৈধ পথে ডলার লেনদেনের পরিধি বাড়ানো এবং একইসঙ্গে অবৈধ মুদ্রা বাজার বন্ধে নীতিমালা আরও সহজ ও কার্যকর করার আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতি এ বিষয়েও কথা বলেন যে, বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ নিশ্চিত করার স্বার্থে অবৈধ ও লাইসেন্সবিহীনভাবে চলা মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি তালিকা ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সাংবাদিকদের কাছে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লিখিত নির্দেশনাগুলো এই মুহূর্তে কঠোরভাবে মেনে চলা হচ্ছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।
সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, খোলাবাজারে ডলারের এই নতুন দাম নির্ধারণের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন বাজারে একটা সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড তৈরির চেষ্টা হয়েছে, অন্যদিকে মানি চেঞ্জার খাতের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিনের একটি ক্ষোভও প্রকাশ পেয়েছে— নীতিমালার অস্পষ্টতা এবং বাজার অস্থিরতার দায় নিয়ে ব্যাংক ও মানি চেঞ্জারদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব সামনে এসেছে নতুন করে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রবাসী আয়ের একটি বড় অংশ যেহেতু এই খাতের মাধ্যমেই বৈধ পথে দেশে আসে, তাই এই খাতের জন্য স্বচ্ছ ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি হলে তা দেশের সামগ্রিক রেমিট্যান্স প্রবাহ ও রিজার্ভ পরিস্থিতির জন্যও ইতিবাচক হতে পারে।

