বাংলাদেশের বন্ধ ও সংকটে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার উৎপাদনে ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া বড় অঙ্কের পুনঃঅর্থায়ন উদ্যোগ এখনো কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি। পোশাক, বস্ত্রসহ বিভিন্ন খাতের চার শতাধিক প্রতিষ্ঠান আর্থিক সহায়তার জন্য আবেদন করলেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠানই এই তহবিল থেকে ঋণ পায়নি বলে সংশ্লিষ্ট শিল্প খাতের সূত্র জানিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০০ বিলিয়ন টাকার প্রাক্অর্থায়ন কর্মসূচির আওতায় এসব প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা দেওয়ার কথা। কর্মসূচিটির মূল উদ্দেশ্য হলো মূলধনের সংকটে বন্ধ হয়ে যাওয়া অথবা সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন করা বড় শিল্প ও সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার সচল করা।
শিল্প খাতের সংগঠনগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন ১৩৫টি কারখানার নাম সুপারিশ করেছে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন সুপারিশ করেছে ১৪৫টি কারখানার নাম। আর বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ১০০টি প্রতিষ্ঠানকে সহায়তার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
এর বাইরে অন্যান্য খাতের আরও ২০টির বেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে মোট আবেদনকারীর সংখ্যা চার শতাধিক।
বড় উদ্যোগ, কিন্তু অর্থ ছাড়ে ধীরগতি
বাংলাদেশ ব্যাংক ৪ জুন ২০২৬ তারিখে ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণ ও নীতি বিভাগ থেকে জারি করা ১৩ নম্বর প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতের জন্য এই বিশেষ প্রাক্অর্থায়ন কর্মসূচি চালু করে।
তিন বছর মেয়াদি এই আবর্তনশীল অর্থায়ন ব্যবস্থার লক্ষ্য হচ্ছে সংকটে থাকা বড় শিল্প ও সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় চলতি মূলধন দেওয়া। অর্থের জোগান পেলে এসব প্রতিষ্ঠান আবার পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে ফিরতে পারবে—এমন প্রত্যাশা থেকেই কর্মসূচিটি নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, কর্মসূচি ঘোষণার পর আবেদন ও সুপারিশের কাজ এগোলেও ঋণ ছাড়ের জায়গায় এখনো বড় ধরনের অচলাবস্থা রয়েছে।
শিল্প সংগঠনগুলো জানিয়েছে, যাচাই-বাছাই শেষে তাদের সুপারিশপত্র বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সচিবালয়ে ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণ ও নীতি বিভাগের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে। যেসব কারখানা পুরোপুরি বন্ধ নয়, বরং আংশিকভাবে উৎপাদনে রয়েছে এবং চলতি মূলধনের সংকটে ভুগছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো স্বীকৃতিপত্রও দিয়েছে।
তবে এসব সুপারিশের পরও এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ ছাড় হয়নি।
ছয় লাখ কোটি টাকার সমন্বিত উদ্যোগ
বন্ধ ও দুর্বল শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগটি বাংলাদেশ ব্যাংকের আরও বড় একটি অর্থায়ন পরিকল্পনার অংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মোট ৬০০ বিলিয়ন টাকার সমন্বিত অর্থায়ন কর্মসূচি নিয়েছে।
এর মধ্যে ৪১০ বিলিয়ন টাকা ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন অর্থায়ন প্যাকেজের আওতায় সংগ্রহ করা হবে। বাকি ১৯০ বিলিয়ন টাকা আসবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে।
ব্যাংকের মাধ্যমে দেওয়া ৪১০ বিলিয়ন টাকার মধ্যে বড় শিল্প ও সেবা খাতের প্রাক্অর্থায়ন কর্মসূচির জন্য রাখা হয়েছে ২০০ বিলিয়ন টাকা।
এ ছাড়া ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পের জন্য ৫০ বিলিয়ন টাকা, রপ্তানি বহুমুখীকরণের জন্য ৩০ বিলিয়ন টাকা, কৃষি ও গ্রামীণ কর্মকাণ্ডের জন্য ১০০ বিলিয়ন টাকা এবং উত্তরাঞ্চলীয় কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য ৩০ বিলিয়ন টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনা শুধু বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে তারল্য বাড়িয়ে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড সচল রাখার একটি বড় পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সাত ব্যাংক চুক্তি করলেও ঋণ ছাড় হয়নি
কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য ২০ আগস্ট সাতটি ব্যাংকের সঙ্গে অংশগ্রহণ চুক্তি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র বলছে, মোট ৪১০ বিলিয়ন টাকার ব্যাংকভিত্তিক তহবিল সংগ্রহে ১৮টি ব্যাংককে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত অংশগ্রহণকারী ব্যাংকের সংখ্যা সাতটিতে সীমাবদ্ধ থাকায় অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়ায় ধীরগতি তৈরি হয়েছে বলে শিল্প খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আবেদনকারীদের বিভিন্ন ধরনের যাচাই-বাছাই এবং ব্যাংকিং প্রক্রিয়া। ঋণ অনুমোদনের আগে আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের ঋণসংক্রান্ত তথ্যও পরীক্ষা করা হবে।
পোশাক খাতের দাবি, দ্রুত অর্থ ছাড়
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি মোহাম্মদ শেহাব উদ্দুজা চৌধুরী জানিয়েছেন, সংগঠনটি যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে কারখানাগুলোর কাগজপত্র যাচাই করেই পুনঃঅর্থায়নের জন্য নাম সুপারিশ করেছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, যেসব কারখানা আংশিকভাবে চালু রয়েছে এবং চলতি মূলধনের সংকটে রয়েছে, সেগুলোকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে অর্থ সঠিক প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা বাড়বে।
তবে পুরোপুরি বন্ধ থাকা কারখানাগুলোর ক্ষেত্রে ব্যাংকের আস্থার সংকট রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। কারণ বর্তমানে উৎপাদন বন্ধ থাকায় ব্যাংকগুলোর কাছে এসব প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
তারপরও তিনি আশা করছেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যে অর্থ ছাড় শুরু হতে পারে।
সোমবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও তফসিলি ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের মধ্যে একটি ভার্চুয়াল বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া দ্রুত করা এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান শর্তগুলো কীভাবে সহজ করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা।
কঠোর শর্তে বাদ পড়তে পারে অনেক কারখানা
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল অবশ্য মনে করছেন, বর্তমান শর্তের কারণে অনেক সংকটগ্রস্ত কারখানা এই অর্থায়ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
তার মতে, পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচিতে শ্রেণিকৃত ঋণসংক্রান্ত যে শর্ত রাখা হয়েছে, সেটিই অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার ঋণ শ্রেণিকৃত হওয়ার বিষয়টি অস্বাভাবিক নয় বলে তিনি মনে করেন। কারণ কোনো প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন উৎপাদনের বাইরে থাকলে তার আর্থিক অবস্থার অবনতি হওয়া স্বাভাবিক।
কিন্তু সরকারের উদ্দেশ্য যদি সত্যিই এসব কারখানাকে পুনরায় চালু করা হয়, তাহলে অন্তত দুই বছরের জন্য শ্রেণিকৃত ঋণসংক্রান্ত শর্ত শিথিল করা প্রয়োজন বলে তিনি মত দিয়েছেন।
তার মতে, আগামী দুই বছর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহও অনিশ্চিত থাকতে পারে। তাই শিল্প মালিকদের জন্য দুই বছরের জন্য শর্তমুক্ত পুনঃঅর্থায়ন এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয়গুলোর একটি।
একই সঙ্গে কোনো শিল্পগোষ্ঠীর একটি প্রতিষ্ঠান শ্রেণিকৃত ঋণের আওতায় পড়লে একই গোষ্ঠীর অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঋণ সুবিধা থেকে বাদ না দেওয়া হয়, সে বিষয়েও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তিনি।
শুধু অর্থ দিলেই কারখানা চালু হবে না
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম মনে করেন, এই অর্থায়ন কর্মসূচি অনেক সংকটগ্রস্ত কারখানাকে উৎপাদনে ফেরার সুযোগ করে দিতে পারে।
তবে তার মতে, শুধু ঋণ বা পুনঃঅর্থায়ন দিয়ে বন্ধ কারখানা টেকসইভাবে চালু করা সম্ভব নয়।
কারখানায় পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে হবে।
কারণ চলতি মূলধনের অভাবে একটি কারখানা বন্ধ থাকলেও উৎপাদন শুরু করার পর সেটিকে নিয়মিত জ্বালানি, বিদ্যুৎ, কাঁচামাল ও ব্যাংকিং সুবিধা প্রয়োজন হবে। এসব নিশ্চিত না হলে পুনঃঅর্থায়নের অর্থ পাওয়ার পরও উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে ফিরবে না।
শিল্প খাতে একসঙ্গে কয়েকটি সংকট
বর্তমানে দেশের অনেক কারখানা একাধিক সমস্যার চাপে রয়েছে। কোথাও নগদ অর্থের সংকট, কোথাও অর্ডার কমে যাওয়া, আবার কোথাও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট এবং ব্যাংকের দায় বাড়তে থাকা।
ফলে কোনো একটি সমস্যার সমাধান করলেই সব প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
একটি কারখানার উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পেছনে যদি মূলধনের ঘাটতি থাকে, তাহলে পুনঃঅর্থায়ন কার্যকর হতে পারে। কিন্তু একই কারখানায় যদি জ্বালানি সংকট থাকে, উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিক হয় কিংবা ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় লেনদেন সুবিধা না পাওয়া যায়, তাহলে নতুন অর্থ পেলেও উৎপাদন পুরোপুরি স্বাভাবিক করা কঠিন।
এই বাস্তবতাই শিল্প মালিকদের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে।
আবেদনকারীদের যাচাইয়ে গুরুত্ব পেয়েছে সক্ষমতা
পুনঃঅর্থায়নের জন্য যেসব প্রতিষ্ঠানকে সুপারিশ করা হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো বিভিন্ন বিষয় যাচাই করেছে।
প্রতিষ্ঠানগুলো বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন কোনো শিল্প সংগঠনের নিবন্ধিত সদস্য কি না এবং তাদের সদস্যপদ হালনাগাদ আছে কি না, তা দেখা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি রপ্তানিমুখী নাকি অভ্যন্তরীণ বাজারনির্ভর, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
পর্যালোচনার সময় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, যন্ত্রপাতি, উৎপাদন সক্ষমতা, ব্যবসায়িক অনুমতিপত্র এবং আয়করসংক্রান্ত নথিও যাচাই করা হয়েছে।
শিল্প সংগঠনগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় চলতি মূলধন পেলে সুপারিশ করা অনেক কারখানাই আবার পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে ফিরতে পারবে।
ঋণ তথ্য যাচাইও বড় বাধা
তবে ঋণ তথ্য যাচাইসংক্রান্ত জটিলতা এখন নতুন করে সামনে এসেছে।
শিল্প মালিকদের অভিযোগ, ঋণ তথ্য ভাণ্ডারের প্রতিবেদনে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ থাকলে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও অনেক সময় ঋণ সুবিধা পেতে সমস্যায় পড়ে।
অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, একটি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের তথ্যের কারণে একই গোষ্ঠীর অন্য প্রতিষ্ঠানকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঋণ সুবিধার অযোগ্য করা উচিত নয়।
শিল্প উদ্যোক্তাদের দাবি, আদালতের স্থগিতাদেশ বা নির্দেশনা থাকার পরও কিছু ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংক সংশ্লিষ্ট বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করছে না।
তাদের মতে, এই বিষয়টি দ্রুত সমাধান করা জরুরি। কারণ কেবল প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে এমন অনেক কারখানা পুনঃঅর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হতে পারে, যেগুলো বাস্তবে আবার চালু হওয়ার সক্ষমতা রাখে।
সুপারিশ আছে, অর্থ নেই
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এতগুলো প্রতিষ্ঠানকে যাচাই করে সুপারিশ করার পরও কেন এখন পর্যন্ত একটি প্রতিষ্ঠানও অর্থ পায়নি।
শিল্প খাতের সূত্রগুলো বলছে, অংশগ্রহণকারী ব্যাংকের সংখ্যা এখনো সীমিত থাকা এর অন্যতম কারণ। এর পাশাপাশি আবেদনকারীদের প্রয়োজনীয় যাচাই এবং ব্যাংকিং প্রক্রিয়া শেষ করতেও সময় লাগছে।
কিন্তু সংকটগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য সময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকলে শ্রমিক ধরে রাখা কঠিন হয়। বাজারের ক্রেতা হারানোর ঝুঁকি বাড়ে। ব্যাংকের দায় বাড়তে থাকে। যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোর ব্যবহার কমে গিয়ে প্রতিষ্ঠানকে আবার সচল করার খরচও বাড়তে পারে।
ফলে পুনঃঅর্থায়নের অর্থ ছাড় যত বিলম্বিত হবে, অনেক প্রতিষ্ঠানের পুনরুদ্ধার তত কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
কর্মসংস্থান বাঁচাতেও দ্রুত সিদ্ধান্ত জরুরি
বন্ধ বা অর্ধচালু কারখানা শুধু মালিকের ব্যবসায়িক সমস্যা নয়। এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থান জড়িত।
একটি কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে শ্রমিকের আয় বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি সরবরাহকারী, পরিবহন, কাঁচামাল ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় অর্থনীতির ওপরও প্রভাব পড়ে।
তাই পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচির সাফল্য কেবল কত টাকা বিতরণ হলো, তা দিয়ে বিচার করা যাবে না। কতগুলো কারখানা উৎপাদনে ফিরল, কত মানুষের কর্মসংস্থান রক্ষা হলো এবং কতটা উৎপাদন সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা গেল—এসবও গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠবে।
সামনে মূল চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০০ বিলিয়ন টাকার প্রাক্অর্থায়ন কর্মসূচি সংকটগ্রস্ত শিল্পের জন্য বড় একটি সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু অর্থ বরাদ্দ থাকলেই যে সংকটের সমাধান হবে, বর্তমান পরিস্থিতি তার বিপরীত চিত্রই দেখাচ্ছে।
শিল্প মালিকদের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো দ্রুত অর্থ ছাড়, বাস্তবসম্মত ঋণ শর্ত, ঋণ তথ্যসংক্রান্ত জটিলতার সমাধান এবং পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ।
ব্যাংকগুলোকেও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি পুনরুজ্জীবনযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিহ্নিত করে বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংককে নিশ্চিত করতে হবে, সরকারি সহায়তার অর্থ যেন প্রকৃত সংকটগ্রস্ত কিন্তু পুনরায় সচল হওয়ার সক্ষমতা থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পৌঁছায়।
কারণ এই কর্মসূচির প্রকৃত সাফল্য হবে তখনই, যখন কাগজে থাকা আবেদন ও সুপারিশ বাস্তবে উৎপাদনমুখী কারখানায় রূপ নেবে। শুধু তহবিল ঘোষণা নয়, দ্রুত ও স্বচ্ছ অর্থ ছাড়ের মাধ্যমেই বন্ধ শিল্পকে আবার অর্থনীতির মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

