নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে চলতি অর্থবছরে প্রায় আট হাজার কোটি টাকা মূল্যের পণ্য কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকারি বিপণন প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং কর্পোরেশন। ভোজ্যতেল, মসুর ডাল ও চিনির পাশাপাশি এবার ছোলা ও খেজুরও এই ক্রয় তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে।
সংস্থাটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব পণ্যের প্রায় অর্ধেক সংগ্রহ করা হবে দেশীয় বাজার থেকে, বাকি অর্ধেক আনা হবে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে। তবে বৈশ্বিক বাজারে দাম যদি তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক ও সরবরাহ নির্ভরযোগ্য মনে হয়, তাহলে বিদেশ থেকে আমদানির পরিমাণ আরও বাড়ানো হতে পারে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সংস্থাটির চেয়ারম্যান এসব তথ্য জানিয়েছেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নিত্যপণ্যের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে চলতি অর্থবছরের জন্য একটি নির্দিষ্ট ক্রয় পরিকল্পনা তৈরি করেছে সংস্থাটি। এই পরিকল্পনার আওতায় প্রায় বাইশ কোটি লিটার ভোজ্যতেল, দুই লাখ বিশ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল, এক লাখ দশ হাজার মেট্রিক টন চিনি, চৌদ্দ হাজার মেট্রিক টন ছোলা এবং প্রায় সাড়ে চার হাজার মেট্রিক টন খেজুর কেনা হবে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে।
সরবরাহ যাতে কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়, সেজন্য প্রতি মাসের চাহিদা, বরাদ্দ, গুদামে থাকা মজুত এবং সরবরাহ পাইপলাইনে থাকা পণ্যের পরিমাণ নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করছে সংস্থাটি। এর পাশাপাশি মজুত ব্যবস্থাপনা আরও মজবুত করতে গুদামের ধারণক্ষমতা বাড়ানোরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে সংস্থাটির মোট চল্লিশটি গুদাম রয়েছে, যার মধ্যে নয়টি নিজস্ব আর বাকি একত্রিশটি ভাড়ায় নেওয়া। এসব গুদামের মোট ধারণক্ষমতা প্রায় আটচল্লিশ হাজার মেট্রিক টনের কাছাকাছি— যার মধ্যে নিজস্ব গুদামে রাখা যায় সাড়ে তেরো হাজার মেট্রিক টন এবং ভাড়া নেওয়া গুদামে রাখা যায় প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার মেট্রিক টন।
সংস্থাটির চেয়ারম্যান জানান, বর্তমান মজুত পরিস্থিতি সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে। বিশেষ করে সরকারি সহায়তায় পণ্য পাওয়া নিম্ন আয়ের ভোক্তাদের কথা মাথায় রেখেই ক্রয় ও মজুত ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনার লক্ষ্যেও কাজ করছে সংস্থাটি। প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য কিনে তা সামান্য মুনাফায় বিক্রির মাধ্যমে ধীরে ধীরে ভর্তুকিনির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। চেয়ারম্যানের ভাষায়, বাজারের চাহিদার সঙ্গে দ্রুত সাড়া দিতে সক্ষম একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে সংস্থাটিকে, যাতে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ ও বাজার স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে এর ভূমিকা আরও কার্যকর হয়।
পরিসংখ্যান তুলে ধরে চেয়ারম্যান জানান, দেশের মোট ভোজ্যতেলের বাজারের প্রায় পনেরো শতাংশ সরবরাহ করে থাকে তাদের সংস্থা, যা বছরে দাঁড়ায় প্রায় আড়াই লাখ মেট্রিক টনে। তবে পরিবার পর্যায়ে হিসাব করলে এর প্রকৃত বাজার অংশীদারত্ব আরও বেশি। ডাল ও চিনির ক্ষেত্রেও পরিবারগুলোর চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ করে সংস্থাটি, যা এসব পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে সহায়ক ভূমিকা রাখে বলে তিনি জানান।
পণ্যের তালিকাও ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত করছে সংস্থাটি। প্রচলিত ভোজ্যতেল, ডাল ও চিনির পাশাপাশি পরীক্ষামূলকভাবে সাবান, ডিটারজেন্ট ও লবণ বিক্রি ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। আগামীতে আটা, বিভিন্ন মসলা, মরিচ ও হলুদও এই তালিকায় যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে নতুন যুক্ত হওয়া এসব পণ্যে সরকারি ভর্তুকি দেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন চেয়ারম্যান— এগুলো শুধু নিয়মিত বাজারদরের তুলনায় কিছুটা কম দামে সরবরাহ করা হবে।
সুবিধাভোগীদের চিহ্নিতকরণের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত স্মার্ট কার্ড কার্যক্রমেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমানে প্রায় আশি লাখ স্মার্ট কার্ড অনুমোদিত হয়েছে, যার মধ্যে ইতিমধ্যে পঁচাত্তর লাখের মতো কার্ড বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি সুবিধাভোগীদের হাতে আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগেই কার্ড পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। চেয়ারম্যান জানান, এই তালিকা স্থির কোনো বিষয় নয়— মৃত্যু, ঠিকানা পরিবর্তন বা অন্য নানা কারণে সুবিধাভোগীদের নাম যুক্ত, বাদ বা পরিবর্তন হতে থাকবে নিয়মিতভাবে।
সরবরাহব্যবস্থাকে পুরোপুরি ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করার দিকেও এগোচ্ছে সংস্থাটি। এখন পর্যন্ত ডিলাররা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে স্মার্ট কার্ড যাচাই করেন। তবে খুব শিগগিরই বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে পয়েন্ট অব সেল যন্ত্র চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যার মাধ্যমে ভোক্তারা প্রতিটি লেনদেনের রসিদ হাতে পাবেন। এর পাশাপাশি স্মার্টফোন ব্যবহারকারী সুবিধাভোগীদের জন্য একটি পৃথক মোবাইলভিত্তিক ব্যবস্থাও তৈরি করা হচ্ছে, যেখান থেকে তারা নিজেদের স্মার্ট কার্ডের তথ্য দেখতে পারবেন এবং মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে মূল্য পরিশোধও করতে পারবেন।
চেয়ারম্যান জানান, তাদের তৈরি এই ডিজিটাল কাঠামোর সঙ্গে ভবিষ্যতে প্রায় একুশটি ভিন্ন সরকারি কর্মসূচি যুক্ত করা সম্ভব। ফলে অন্যান্য সরকারি সংস্থাও চাইলে তাদের নিজস্ব সুবিধাভোগীকেন্দ্রিক কর্মসূচি এই একই প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সংযুক্ত করতে পারবে, যা দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসনিক ব্যয় কমাতেও সহায়ক হতে পারে।
গুদাম সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও নতুন পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। ভাড়া করা গুদামের ওপর নির্ভরতা কমাতে প্রায় দশ হাজার মেট্রিক টন অতিরিক্ত নিজস্ব মজুত সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য নিয়েছে সংস্থাটি। তার ভাষায়, বাজারে হস্তক্ষেপের সক্ষমতা ও পণ্য ক্রয়ের পরিধি বাড়াতে হলে লজিস্টিক অবকাঠামো মজবুত করা অপরিহার্য।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে চেয়ারম্যান বলেন, মানের সঙ্গে কোনো আপস না করে সাশ্রয়ী মূল্যে ভোক্তাদের কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়াই তাদের মূল লক্ষ্য। কোনো নতুন পণ্য বাজারে যুক্ত করার আগে ভোক্তাদের মতামত নেওয়ার জন্য নিয়মিত জরিপ চালানো হয় বলেও জানান তিনি। নতুন যুক্ত হওয়া কোনো পণ্য কেনা বাধ্যতামূলক নয়— এটি সম্পূর্ণভাবে ভোক্তার ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।
সার্বিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শুধু জরুরি সময়ে পণ্য সরবরাহকারী একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনয়নকারী একটি প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার চেষ্টা করছে সংস্থাটি। ডিজিটাল অবকাঠামো, গুদাম সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পণ্য তালিকার সম্প্রসারণ— এই তিন দিক থেকে একযোগে অগ্রসর হওয়ার এই কৌশল সফল হলে তা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

