মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। চলতি বছরের শুরু থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে গেছেন চার লাখ ৮০ হাজার ১০৪ জন। গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল সাত লাখ চার হাজার ৬০৩ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদেশে যাওয়া কর্মীর সংখ্যা কমেছে দুই লাখ ২৪ হাজার ৪৯৯ জন, যা প্রায় ৩২ শতাংশের পতন।
সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। বাংলাদেশের মতো দেশে বিদেশে কর্মসংস্থান লাখো পরিবারের আয়ের অন্যতম প্রধান পথ। একই সঙ্গে প্রবাসী আয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার জোগানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে শুধু অভিবাসন খাত নয়, অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা সৌদি শ্রমবাজারে
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিদেশি শ্রমবাজার সৌদি আরব। কিন্তু চলতি বছর এই বাজারেই সবচেয়ে বড় পতন দেখা গেছে। ১ জানুয়ারি থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত সৌদি আরবে গেছেন দুই লাখ ৬৭ হাজার ১০৩ জন বাংলাদেশি কর্মী। গত বছরের একই সময়ে গিয়েছিলেন চার লাখ ৮২ হাজার ৯১৮ জন। ফলে এক বছরের ব্যবধানে সৌদি আরবে কর্মী যাওয়া কমেছে দুই লাখ ১৫ হাজার ৮১৫ জন, অর্থাৎ প্রায় ৪৫ শতাংশ।
এই একটি বাজারের পতনই সামগ্রিক জনশক্তি রপ্তানির ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে। কারণ বাংলাদেশের বিদেশে কর্মসংস্থানের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি মধ্যপ্রাচ্যের দেশের ওপর নির্ভরশীল। ফলে কোনো একটি বড় বাজারে নিয়োগ কমে গেলে পুরো খাতেই তার প্রতিফলন দেখা যায়।
কাতারের চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়। চলতি বছরের ২২ আগস্ট পর্যন্ত দেশটিতে গেছেন ৪২ হাজার ১০৫ জন বাংলাদেশি। গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৬৬ হাজার ৬৭৩ জন। অর্থাৎ কর্মী যাওয়া কমেছে ২৪ হাজার ৫৬৮ জন, যা প্রায় ৩৭ শতাংশ।
কুয়েতেও একই ধরনের পতন দেখা গেছে। চলতি বছর দেশটিতে গেছেন ১৭ হাজার ২৫০ জন। গত বছরের একই সময়ে গিয়েছিলেন ৩০ হাজার ৪২৯ জন। অর্থাৎ কমেছে ১৩ হাজার ১৭৯ জন বা প্রায় ৪৩ শতাংশ।
সব বাজারে অবশ্য একই চিত্র নয়
মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে কর্মী যাওয়া কমলেও জর্দান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। চলতি বছর জর্দানে গেছেন ১১ হাজার ৪৬৩ জন। গত বছরের একই সময়ে গিয়েছিলেন সাত হাজার ৪৩ জন। অর্থাৎ এ বছর ৪ হাজার ৪২০ জন বেশি কর্মী গেছেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতেও কর্মী যাওয়ার সংখ্যা বেড়েছে। চলতি বছর দেশটিতে গেছেন ১৫ হাজার ৮০৩ জন। গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল সাত হাজার ২০২ জন। ফলে এ বছর ৮ হাজার ৬০১ জন বেশি বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের জন্য সেখানে গেছেন।
ইরাকেও চলতি বছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী গেছেন। ১ জানুয়ারি থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত দেশটিতে গেছেন চার হাজার ৮০৮ জন।
তবে বড় কয়েকটি বাজারের পতনের তুলনায় এসব ইতিবাচক প্রবণতা এখনো সামগ্রিক ঘাটতি পূরণ করতে পারছে না।
মধ্যপ্রাচ্যের ছয় বাজারে বড় পতন
চলতি বছর সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্দান ও ইরাক—এই ছয়টি মধ্যপ্রাচ্যের দেশে মোট তিন লাখ ৪৮ হাজার ৫৩২ জন বাংলাদেশি কর্মী গেছেন।
অন্যদিকে গত বছরের একই সময়ে সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্দানে গিয়েছিলেন পাঁচ লাখ ৯৪ হাজার ২৬৫ জন। তুলনাযোগ্য পাঁচটি প্রধান মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে এ বছর কর্মী যাওয়া কমেছে দুই লাখ ৪৫ হাজার ৭৩৩ জন। পতনের হার প্রায় ৪১ শতাংশ।
এর মধ্যে শুধু সৌদি আরবেই কমেছে দুই লাখ ১৫ হাজার ৮১৫ জন।
এই হিসাব দেখাচ্ছে, বাংলাদেশের শ্রমবাজার কতটা অল্প কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরশীল। একটি বা দুটি বড় বাজারে নিয়োগ কমলেই সামগ্রিক জনশক্তি রপ্তানির পরিসংখ্যান দ্রুত নেমে যায়। অতীতেও বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশের শ্রমবাজারকে কয়েকটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল বলে সতর্ক করেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে কিছুটা আশার আলো
মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বাংলাদেশের অন্যতম বড় শ্রমবাজার সিঙ্গাপুরে চলতি বছর কর্মী যাওয়ার সংখ্যা বেড়েছে। ২২ আগস্ট পর্যন্ত সেখানে গেছেন ৪৯ হাজার ৫৫৭ জন। গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৪৪ হাজার ৩৪৮ জন। অর্থাৎ বেড়েছে পাঁচ হাজার ২০৯ জন।
মালদ্বীপে অবশ্য সামান্য পতন হয়েছে। চলতি বছর সেখানে গেছেন ২০ হাজার ৩০৯ জন। গত বছরের একই সময়ে গিয়েছিলেন ২০ হাজার ৭০৩ জন। ফলে কর্মী যাওয়া কমেছে ৩৯৪ জন।
ইতালিতেও কর্মী যাওয়ার সংখ্যা বেড়েছে। চলতি বছর দেশটিতে গেছেন ছয় হাজার ২৮৪ জন। গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল পাঁচ হাজার ৩৮ জন। অর্থাৎ বেড়েছে এক হাজার ২৪৬ জন।
চলতি বছরের ২২ আগস্ট পর্যন্ত পর্তুগালেও গেছেন চার হাজার ৬৯৯ জন বাংলাদেশি কর্মী।
তবে এসব বাজারে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা বাড়লেও সৌদি আরবসহ বড় মধ্যপ্রাচ্যের বাজারগুলোর ঘাটতি পূরণ করার মতো পর্যায়ে এখনো পৌঁছাতে পারেনি।
শুধু কর্মীর সংখ্যা দিয়ে সাফল্য মাপা যাবে না
অভিবাসন খাতের বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশে কতজন কর্মী গেলেন—শুধু এই সংখ্যা দিয়ে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির সাফল্য বিচার করা ঠিক হবে না। কর্মীদের দক্ষতা, বিদেশে তাঁদের আয় এবং দেশে অর্থ পাঠানোর সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান মনে করেন, গত পাঁচ বছরে সৌদি আরবে প্রায় ২৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মী গেলেও একই সময়ে দেশটি থেকে বাংলাদেশের প্রবাসী আয় প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার কমেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে প্রায় ৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় এসেছিল।
অর্থাৎ শুধু বিপুলসংখ্যক কর্মী বিদেশে পাঠালেই দেশের অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত সুফল নিশ্চিত হয় না। কর্মীরা কী ধরনের কাজ করছেন, তাঁদের বেতন কত, তাঁদের দক্ষতা কতটা এবং তাঁরা দেশে কত অর্থ পাঠাতে পারছেন—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।
শরিফুল ইসলাম হাসানের মতে, মার্চে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সৌদি আরবসহ পুরো অঞ্চলে বৈদেশিক কর্মসংস্থান কমেছে। তবে এই সাময়িক পতনকে বড় সংকট হিসেবে দেখার পরিবর্তে আগামী ছয় মাস, এক বছর বা দুই বছরে আরও দক্ষ কর্মী পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।
মূল দুর্বলতা শ্রমবাজারের বৈচিত্র্যের অভাব
অভিবাসন ও শরণার্থীবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের প্রভাব বছরজুড়ে থাকতে পারে। তবে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বড় সমস্যা হলো শ্রমবাজার যথেষ্ট বিস্তৃত না হওয়া।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মীর চাহিদা থাকলেও বাংলাদেশ এখনো কয়েকটি প্রচলিত বাজারের ওপর বেশি নির্ভরশীল। ফলে এসব বাজারে রাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক মন্দা, নিয়োগনীতি পরিবর্তন কিংবা নিরাপত্তাজনিত সংকট দেখা দিলে বাংলাদেশি কর্মীদের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে।
তাঁর মতে, আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন শ্রমবাজার তৈরি এবং পুরোনো বাজার সম্প্রসারণ করা না গেলে বিদেশে যাওয়ার মানুষের আকাঙ্ক্ষা কমবে না। বরং বৈধ সুযোগ সীমিত হলে ঝুঁকিপূর্ণ পথে যাওয়ার প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।
বৈধ পথ সংকুচিত হলে বাড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা
বাংলাদেশের শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ার আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো অনিয়মিত পথে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে স্থল ও সমুদ্রপথে ইউরোপে অনিয়মিতভাবে যাওয়া অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশিরাই ছিল সবচেয়ে বড় অংশ।
ওই অঞ্চল থেকে ইউরোপে পৌঁছানো প্রায় ৪৭ হাজার ২০০ অভিবাসীর মধ্যে বাংলাদেশিদের অংশ ছিল ৫০ শতাংশ। আফগানিস্তানের অংশ ছিল ৩২ শতাংশ, পাকিস্তানের ১২ শতাংশ এবং ইরানের ৬ শতাংশ।
বাংলাদেশিদের অনিয়মিত ইউরোপযাত্রার অন্যতম প্রধান গন্তব্য ইতালি ও গ্রিস।
আর এই যাত্রার মূল্য অনেক সময় দিতে হচ্ছে জীবন দিয়ে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার নিখোঁজ অভিবাসীবিষয়ক প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বের ৯টি অনিয়মিত অভিবাসনপথে ঘটে যাওয়া ৮৪টি পৃথক দুর্ঘটনায় অন্তত এক হাজার ৩২৯ বাংলাদেশি মারা গেছেন। আরও ৮৫৯ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
অর্থাৎ গত এক দশকে অনিয়মিত অভিবাসনপথে মৃত্যু ও নিখোঁজ মিলিয়ে দুই হাজার ১৮৮ বাংলাদেশির তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে উঠেছে ভূমধ্যসাগরীয় নৌপথ। লিবিয়া বা তিউনিশিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে পৌঁছানোর চেষ্টায় এক হাজার ১৭১ বাংলাদেশি মারা গেছেন এবং ৭৭৩ জন নিখোঁজ হয়েছেন।
কেন মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পথে যাচ্ছে
বৈধ পথে কর্মী যাওয়ার সুযোগ কমে গেলে বিদেশ যেতে আগ্রহী মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করেন। অনেক বাংলাদেশি বৈধ অভিবাসনের সুযোগ না পেয়ে পর্যটক হিসেবে বিদেশে গিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ দালালচক্রের মাধ্যমে বিপজ্জনক স্থল ও সমুদ্রপথ বেছে নিচ্ছেন।
শরিফুল ইসলাম হাসানের মতে, বৈধ পথে কর্মী যাওয়া কমলেও অনিয়মিতভাবে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। বিশেষ করে ইউরোপে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বাংলাদেশি ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিচ্ছেন। এতে বিদেশ গিয়ে বিপদে পড়ার পাশাপাশি মানবপাচারের শিকার হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।
আসিফ মুনীরের মতে, যাঁদের ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা খরচ করার সামর্থ্য আছে, তাঁদের অনেকে মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তে ইউরোপে স্থায়ীভাবে থাকার আশায় বেশি অর্থ ব্যয় করে অবৈধ পথে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার প্রবণতাও কিছুটা বেড়েছে, যার প্রভাব ২০২৫ ও ২০২৬ সালেও রয়েছে।
এখন সবচেয়ে জরুরি নতুন বাজার তৈরি
বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলেও যদি তা কয়েকটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে কোনো একটি অঞ্চলের সংকট পুরো অভিবাসন খাতকে অস্থির করে দিতে পারে।
তাই শুধু বেশি সংখ্যক কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য না রেখে দক্ষ কর্মী তৈরির দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা, কারিগরি পেশা, শিল্পকারখানা, জাহাজ নির্মাণ, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং সেবাখাতের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় বাজারে সরকারি পর্যায়ে ধারাবাহিক আলোচনা ও শ্রমবাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ প্রয়োজন।
কারণ দক্ষ কর্মীর জন্য বিশ্বজুড়ে চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ হলো সেই চাহিদার সঙ্গে দেশের কর্মীদের দক্ষতা ও যোগ্যতাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।
দরকার সমন্বিত উদ্যোগ
বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম মনে করেন, বন্ধ থাকা শ্রমবাজারগুলো নিয়ে সরকার শ্রমখাতের সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি মূল কমিটি গঠন করতে পারে। এই কমিটি একটি বিশেষ কার্যকরী কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে পারে।
একই সঙ্গে শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া দালালচক্র ও সিন্ডিকেটমুক্ত রাখার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
কারণ বিদেশে যাওয়ার খরচ যদি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তাহলে একজন কর্মী বিদেশে গিয়ে আয় শুরু করার আগেই বড় ঋণের বোঝায় পড়ে যান। এর ফলে তাঁর উপার্জনের বড় অংশ ঋণ পরিশোধে চলে যায় এবং দেশে পাঠানো অর্থের পরিমাণও প্রত্যাশার তুলনায় কম হতে পারে।
সংকটের মধ্যেই সুযোগ খুঁজতে হবে
সাত মাসে জনশক্তি রপ্তানির ৩২ শতাংশ পতন নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। তবে এটিকে শুধু সাময়িক পতন হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। বরং এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের একটি দুর্বলতাকে সামনে এনেছে—দেশের শ্রমবাজার এখনো কয়েকটি গন্তব্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত পরিস্থিতি বদলাতে পারে, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে, নতুন নিয়োগও শুরু হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হবে এমন একটি শ্রমবাজার তৈরি করা, যেখানে কোনো একটি দেশের সংকট পুরো খাতকে বিপর্যস্ত করতে না পারে।
একই সঙ্গে দক্ষতা বাড়ানো, অভিবাসন ব্যয় কমানো, দালালচক্র নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা এবং কর্মীদের আয় ও প্রবাসী আয় বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে।
কারণ বিদেশে একজন কর্মী যাওয়া মানে শুধু একটি সংখ্যা বাড়া নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, একটি গ্রামের অর্থনীতি এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার আয়। তাই জনশক্তি রপ্তানির এই পতনকে সাময়িক পরিসংখ্যান হিসেবে না দেখে বাংলাদেশের শ্রমবাজারকে নতুনভাবে সাজানোর একটি সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখা জরুরি।

