বাংলাদেশের চা শিল্পে এক ধরনের বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। একদিকে দেশে চায়ের উৎপাদন ধীরে ধীরে বাড়ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমছে। কারণ শুধু মোট উৎপাদন বাড়লেই বিশ্ববাজারে সাফল্য পাওয়া যায় না; প্রয়োজন কম খরচে বেশি উৎপাদন, উন্নত মান, বৈচিত্র্যময় পণ্য এবং শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড পরিচিতি।
বর্তমানে বাংলাদেশের চা শিল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উৎপাদনশীলতার ঘাটতি। একই পরিমাণ জমি ব্যবহার করে বিশ্বের শীর্ষ চা উৎপাদনকারী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ অনেক কম চা উৎপাদন করছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে উৎপাদন খরচে। প্রতি কেজি চা উৎপাদনে খরচ বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চা দামের দিক থেকে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
চা খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের প্রতি হেক্টর জমিতে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কেজি চা উৎপাদিত হয়। অথচ কেনিয়ার মতো বড় উৎপাদনকারী দেশে একই জমি থেকে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কেজি এবং ভিয়েতনামে ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৩০০ কেজি পর্যন্ত চা উৎপাদন করা হয়। এই উৎপাদন ব্যবধানই বাংলাদেশের চায়ের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বড় দুর্বলতা তৈরি করেছে।
ফিনলে টি কোম্পানির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা তাহসিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, কম উৎপাদনশীলতার কারণে প্রতি কেজি চায়ের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ টি বোর্ডের গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগের সদস্য ও যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এক কেজি চা উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় ২০০ থেকে ২২০ টাকা। অথচ ভারত ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোতে এই খরচ প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে থাকে। অর্থাৎ উৎপাদন ব্যয়ের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে বাড়তি চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ কেজি চা উৎপাদন হয়। এর মধ্যে ৯ কোটির বেশি কেজি চা দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেই ব্যবহার হয়ে যায়। ফলে রপ্তানির জন্য উদ্বৃত্ত চায়ের পরিমাণ খুব বেশি থাকে না।
দেশের মানুষের মধ্যে চায়ের চাহিদা বাড়ছে, যা স্থানীয় শিল্পের জন্য ইতিবাচক। তবে একই সঙ্গে এটি রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে একটি সীমাবদ্ধতাও তৈরি করছে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে বড় পরিসরে সরবরাহ করতে হলে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি রপ্তানিযোগ্য উদ্বৃত্তও তৈরি করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের চা শিল্প দীর্ঘদিন ধরে মূলত কালো চায়ের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বিশ্ববাজারে এখন সবুজ চা, সাদা চা, গাঢ় চা এবং বিশেষ ধরনের সুগন্ধযুক্ত চায়ের চাহিদা বাড়ছে। এসব উচ্চমূল্যের চায়ের বাজারে চীন ও জাপানের মতো দেশগুলো শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
তাহসিন আহমেদ চৌধুরীর মতে, শুধু সাধারণ কালো চায়ের ওপর নির্ভর না করে বাংলাদেশকে মূল্য সংযোজিত চায়ের দিকে এগোতে হবে। কারণ উন্নত মানের বিশেষায়িত চা তৈরি ও বাজারজাত করতে পারলে একই পরিমাণ উৎপাদন থেকে বেশি আয় করা সম্ভব।
বাংলাদেশের চা শিল্পের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শক্তিশালী ব্র্যান্ড পরিচিতির অভাব। দেশের অনেক চা নিলামের মাধ্যমে বিক্রি হয় এবং পরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরিবেশক এসব চা নিজেদের ব্র্যান্ডের মাধ্যমে বাজারজাত করে।
এ কারণে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের নিজস্ব চায়ের পরিচিতি খুব বেশি তৈরি হয়নি। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা শুধু উৎপাদন বা দামের ওপর নির্ভর করে না; একটি দেশের পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশে নির্ভর করে তার ব্র্যান্ড মূল্য ও ভোক্তার আস্থার ওপর।
এম এম ইস্পাহানি লিমিটেডের নেপচুন টি এস্টেটের ব্যবস্থাপক কাজী আরফান উল্লাহ বলেন, বাংলাদেশের চা উৎপাদকদের আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ব্র্যান্ড তৈরির দিকে আরও মনোযোগ দিতে হবে।
বাংলাদেশের চা রপ্তানির পরিসংখ্যানেও এই সংকট স্পষ্ট। গত এক দশকে উৎপাদনে ওঠানামা থাকলেও রপ্তানি আয় প্রত্যাশিতভাবে বাড়েনি।
২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ চা রপ্তানি করে ৪ দশমিক ৪৭ মিলিয়ন ডলার আয় করেছিল। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই আয় কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৩৩ মিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ এক দশকে রপ্তানি আয় কমেছে ১ দশমিক ১৪ মিলিয়ন ডলার বা ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
এই সময়ে রপ্তানি আয়ে বিভিন্ন ওঠানামা দেখা গেছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আয় কমে ২ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন ডলারে এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২ দশমিক ৮২ মিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। পরে ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩ দশমিক ১২ মিলিয়ন ডলার এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
তবে ২০২১-২২ অর্থবছরে রপ্তানি আয় এক দশকের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে, মাত্র ২ দশমিক ১৪ মিলিয়ন ডলারে। এরপর কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ দশমিক ৩৪ মিলিয়ন ডলার, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৫৪ মিলিয়ন ডলার এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ দশমিক ১০ মিলিয়ন ডলার আয় হয়।
কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবারও আয় কমে যায়। আগের বছরের তুলনায় ৭ লাখ ৭০ হাজার ডলার বা ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ কমে রপ্তানি আয় দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৩৩ মিলিয়ন ডলারে।
চায়ের উৎপাদন বৃদ্ধির তথ্য দেখলে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন মনে হতে পারে। জানুয়ারি মাসের উৎপাদন ২০২৪ সালে ছিল ১ লাখ ৭৫ হাজার কেজি। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৩ লাখ ৯ হাজার কেজি এবং ২০২৬ সালে ৫ লাখ ৭৩ হাজার কেজিতে পৌঁছেছে।
অর্থাৎ জানুয়ারি ২০২৬-এর উৎপাদন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ লাখ ৬৪ হাজার কেজি বেশি এবং ২০২৪ সালের তুলনায় ৩ লাখ ৯৮ হাজার কেজি বেশি। এটি গত তিন বছরের জানুয়ারি মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ উৎপাদন।
তবে এই পরিসংখ্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে। শুধু উৎপাদন বাড়লেই রপ্তানি আয় বাড়ে না। উৎপাদনের সঙ্গে যদি উৎপাদন খরচ কমানো, মান উন্নয়ন, বাজার সম্প্রসারণ এবং ব্র্যান্ড তৈরি করা না যায়, তাহলে বাড়তি উৎপাদন আন্তর্জাতিক বাজারে বড় সুবিধা তৈরি করতে পারে না।
চা শিল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাংলাদেশের সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, একই জমি থেকে বেশি উৎপাদনের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত জাতের চারা এবং বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, উৎপাদন খরচ কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে চা বাগানে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের মতো উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে। অব্যবহৃত জমি ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করলে বাগানের অতিরিক্ত আয় তৈরি হতে পারে এবং উৎপাদন ব্যয়ও কমানো সম্ভব।
তৃতীয়ত, চায়ের পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে। শুধু কাঁচা বা সাধারণ কালো চা রপ্তানি না করে উচ্চমূল্যের বিশেষায়িত চা উৎপাদনে মনোযোগ দিতে হবে।
চতুর্থত, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের নিজস্ব ব্র্যান্ড পরিচিতি তৈরি করতে হবে। কারণ বিশ্ববাজারে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান তৈরি করতে হলে শুধু পণ্য বিক্রি করলেই হবে না, একটি দেশের চায়ের আলাদা পরিচয়ও প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
বাংলাদেশের চা শিল্পের বর্তমান চিত্র তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। উৎপাদন বাড়ানো প্রয়োজন, কিন্তু সেটিই একমাত্র সমাধান নয়। কম খরচে উৎপাদন, উন্নত মান, নতুন ধরনের পণ্য এবং শক্তিশালী আন্তর্জাতিক পরিচিতি—এই চারটি বিষয়ের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই বাংলাদেশের চা আবার বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।

