পুরান ঢাকার ব্যস্ত ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার ছোট ছোট কারখানা, লেদ মেশিনের শব্দ, ধাতু কাটার কাজ এবং লোহা গলানোর ধোঁয়া সরিয়ে একটি পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল একই জায়গায় লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে একত্রিত করা, উৎপাদন বাড়ানো এবং রপ্তানি সক্ষমতা তৈরি করা।
কিন্তু প্রায় ৩০৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেই শিল্পপার্ক এখন অনেকটাই নীরব পড়ে আছে। কারখানা স্থাপনের স্বপ্ন নিয়ে তৈরি করা মুন্সীগঞ্জের বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) ইলেকট্রিক্যাল ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পনগরীতে চার বছর পার হলেও এখনো কোনো কারখানার উৎপাদন শুরু হয়নি।
৫০ একর জমির ওপর নির্মিত এই শিল্পনগরীতে মোট ৩৬১টি শিল্প প্লট রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ২৯টি প্লট, যা মোট প্লটের মাত্র ৮ শতাংশ। অবকাঠামো তৈরি হলেও উদ্যোক্তাদের অনাগ্রহের কারণে পুরো এলাকা অনেকটা পরিত্যক্ত শিল্পাঞ্চলের মতো হয়ে পড়েছে।
সরেজমিন পরিদর্শন ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই শিল্পনগরীর সবচেয়ে বড় সমস্যা দুটি—জমির উচ্চমূল্য এবং দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা। ফলে অনেক উদ্যোক্তা আগ্রহী হলেও নতুন করে বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।
স্বপ্ন ছিল পুরান ঢাকার শিল্প সরিয়ে নেওয়ার
পুরান ঢাকার বুড়িগঙ্গা ঘেঁষা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ছোট ও মাঝারি আকারের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানা পরিচালিত হয়ে আসছে। কিন্তু ঘনবসতি, সীমিত জায়গা, পরিবেশ দূষণ এবং নিরাপত্তাজনিত সমস্যার কারণে এসব শিল্পকে পরিকল্পিত এলাকায় স্থানান্তরের প্রয়োজন দেখা দেয়।
এই লক্ষ্যেই ২০১৬ সালে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে বিশেষায়িত ইলেকট্রিক্যাল ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পনগরী তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরিকল্পনা ছিল, এখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ শিল্প স্থাপন করা হবে এবং দেশের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানো হবে।
প্রকল্পটি তিন বছরের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও বাস্তবে সময় লাগে ছয় বছর। পুরো প্রকল্পটি সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হয়। শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২১৩ কোটি টাকা। তবে সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যয়ও বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত প্রকল্প ব্যয় দাঁড়ায় ৩০৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকায়।
২০২২ সালের জুনে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়। কিন্তু অবকাঠামো প্রস্তুত হওয়ার পরও শিল্প স্থাপনের মূল লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি।
জমির দাম উদ্যোক্তাদের বড় বাধা
বিসিকের প্লট বরাদ্দ নীতিমালা অনুযায়ী, এই শিল্পনগরীতে প্রতি বর্গফুট জমির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ১০৩ টাকা। এক কাঠা জমির আয়তন ৭২০ বর্গফুট হিসেবে ধরলে প্রতি কাঠার দাম দাঁড়ায় প্রায় ১৫ লাখ ১৪ হাজার টাকা।
উদ্যোক্তাদের মতে, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান ছোট ও মাঝারি আকারের। তাদের জন্য এত বেশি দামে জমি কিনে নতুন করে কারখানা স্থাপন করা কঠিন।
বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুর রাজ্জাক বলেন, বর্তমান দামে জমি নিয়ে শিল্প স্থাপন করা উদ্যোক্তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব।
বিসিকের প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ রাশেদুর রহমান জানান, উদ্যোক্তাদের আকৃষ্ট করার জন্য বিসিক বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছে। তবে উদ্যোক্তারা মূলত জমির দাম বেশি হওয়ার বিষয়টিকেই বড় সমস্যা হিসেবে তুলে ধরছেন।
তার মতে, জমির দাম কমানোর বিষয়টি বিসিকের একক সিদ্ধান্তের মধ্যে পড়ে না। কারণ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী জমি অধিগ্রহণ করে মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কারণেই জমির প্রকৃত মূল্য বেড়েছে।
আট বছরেও শেষ হয়নি সেতু, থমকে আছে যোগাযোগ
শিল্পনগরীর আরেকটি বড় সমস্যা হলো দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা। ঢাকার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ সহজ করার জন্য ধলেশ্বরী নদীর শাখার ওপর মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান ও কেরানীগঞ্জের মধ্যে মোল্লাবাজার সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
২০১৮ সালে শুরু হওয়া এই ২২০ মিটার দীর্ঘ সেতুর কাজ এখনো শেষ হয়নি। করোনা মহামারির সময় কাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরে নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় ঠিকাদার কাজ চালিয়ে যেতে অনাগ্রহ দেখায়। একপর্যায়ে ঠিকাদার পরিবর্তনের বিষয়ও আসে।
দীর্ঘ আট বছর পার হলেও সেতুটির কাজ শেষ না হওয়ায় দুই এলাকার মানুষের ভোগান্তি কমেনি। এখনো নদী পারাপারে অনেককে ফেরির ওপর নির্ভর করতে হয়।
কেরানীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশল কার্যালয়ের প্রকৌশলী মোহাম্মদ গোলাম সারওয়ার জানান, সেতুর মূল অংশের কাজ চললেও সংযোগ সড়ক বা ভায়াডাক্ট অংশের কাজ নিয়ে জটিলতা রয়েছে। নতুন দরপত্র এবং জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হওয়ায় দ্রুত কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম।
এই দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থাই শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য বড় নিরুৎসাহের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিদ্যুৎ, গ্যাস ও বিনিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা
শুধু নতুন শিল্পনগরীর সমস্যাই নয়, উদ্যোক্তারা বিদ্যমান শিল্প পরিচালনা নিয়েও নানা সমস্যার কথা বলছেন।
লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের একজন উদ্যোক্তা জানান, বর্তমানে অনেক কারখানাই বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে ভুগছে। এমন পরিস্থিতিতে পুরোনো ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। সেখানে নতুন জায়গায় আবার বড় বিনিয়োগ করা অনেকের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
তার মতে, সরকার যদি জমির দাম কমায়, সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করে এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করে, তাহলে উদ্যোক্তারা শিল্পনগরীতে যেতে আগ্রহী হবেন।
৮০ শতাংশ ভর্তুকির দাবি
শিল্পনগরী নির্মাণের শেষ পর্যায়ে ২০২২ সালে বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সরকারের কাছে জমির দামে ভর্তুকির দাবি জানিয়েছিল।
তাদের দাবি ছিল, চামড়া শিল্পনগরীর মতো এই শিল্পনগরীর প্লটেও ৮০ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়া হোক। এতে উদ্যোক্তাদের জন্য জমির দাম অনেক কমে আসবে।
বর্তমান দামে যদি ৮০ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়া হয়, তাহলে প্রতি কাঠা জমির দাম প্রায় ৩ লাখ টাকায় নেমে আসতে পারে বলে উদ্যোক্তারা মনে করছেন।
তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
কেন ব্যর্থ হচ্ছে এমন শিল্প উদ্যোগ?
শিল্পপার্ক তৈরির মূল উদ্দেশ্য ছিল উদ্যোক্তাদের জন্য একটি আধুনিক পরিবেশ তৈরি করা। কিন্তু শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই শিল্প গড়ে ওঠে না। প্রয়োজন উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা, সহজ অর্থায়ন, ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ।
মুন্সীগঞ্জের এই শিল্পনগরীর ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, অবকাঠামো তৈরি হলেও উদ্যোক্তাদের প্রধান উদ্বেগগুলো সমাধান হয়নি। ফলে সরকারি বিনিয়োগের বড় অংশ ব্যবহার না হয়ে পড়ে আছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পায়নের জন্য শুধু জমি তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; সেই জমিকে কার্যকর উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন বাস্তবসম্মত মূল্য নির্ধারণ, দ্রুত যোগাযোগ সুবিধা, সহজ ঋণ এবং উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয়।
বাংলাদেশের লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাত দেশের শিল্পায়ন ও রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র। কিন্তু এই খাতের বিকাশের জন্য তৈরি করা একটি বড় শিল্পনগরী যদি চার বছর পরও কারখানাশূন্য থাকে, তাহলে তা শুধু একটি প্রকল্পের সমস্যা নয়, বরং পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে দূরত্বের একটি বড় উদাহরণ।
মুন্সীগঞ্জের এই শিল্পপার্ক এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আছে—সরকারি অর্থে তৈরি অবকাঠামো কি সত্যিই উৎপাদনের কেন্দ্র হয়ে উঠবে, নাকি এটি শুধু আরেকটি অব্যবহৃত শিল্প এলাকার উদাহরণ হয়ে থাকবে?

