বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত একটি বিষয় হলো আন্তর্জাতিক অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম পেপ্যালের আগমন। দেশের ফ্রিল্যান্সার, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করা পেশাজীবীরা বহু বছর ধরে সহজ ও নির্ভরযোগ্য বৈদেশিক অর্থ লেনদেন ব্যবস্থার দাবি জানিয়ে আসছেন। এবার সেই অপেক্ষার অবসানের সম্ভাবনা কিছুটা জোরালো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তর্জাতিক ডিজিটাল পেমেন্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেশের বাজারে আনার জন্য নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে দেশের ব্যাংকগুলোকে বৈশ্বিক ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে অংশীদারত্ব করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রায় ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহারের পথও সহজ করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক কয়েকটি সিদ্ধান্তের ফলে ফ্রিল্যান্সার, অনলাইন ব্যবসায়ী এবং বিদেশে অর্থ ব্যয়কারী ব্যক্তিদের জন্য বৈধ পথে আন্তর্জাতিক লেনদেনের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
গত ১৫ দিনের মধ্যে জারি করা তিনটি পৃথক নির্দেশনার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের কিছু নিয়ম শিথিল করেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে দেশের ব্যাংকগুলোর সহযোগিতার সম্ভাবনা বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম পেপ্যালের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পেপ্যাল বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশের বিষয়টি পর্যালোচনা করছে।
ডলার ওয়ালেট ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২৯ জুলাইয়ের একটি নির্দেশনার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল পেমেন্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রাভিত্তিক হিসাব খোলার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এসব হিসাবকে ডিজিটাল মূল্য হিসাব বলা হচ্ছে।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ভবিষ্যতে একজন গ্রাহক তার ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে যুক্ত ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহার করে বিদেশ থেকে অর্থ গ্রহণ এবং বিদেশে অর্থ পাঠানোর সুযোগ পেতে পারেন।
বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য এটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বর্তমানে অনেক ফ্রিল্যান্সার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আয় করেন, কিন্তু সব অর্থ আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশে আসে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমানে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সেবার মাধ্যমে বছরে ৫০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ আনুষ্ঠানিক পথে আসে। তবে প্রকৃত বাজারের আকার প্রায় ১৫০ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে। কারণ ফ্রিল্যান্সিংয়ের একটি বড় অংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক বা বিকল্প চ্যানেলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
এই অর্থ যদি পুরোপুরি বৈধ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আনা যায়, তাহলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক পেমেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও বাংলাদেশ একটি আকর্ষণীয় বাজার হয়ে উঠবে।
শুধু ফ্রিল্যান্সিং নয়, বড় বাজার রয়েছে ভ্রমণ ও ব্যবসায়
আন্তর্জাতিক ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার প্রয়োজন শুধু ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিদেশ ভ্রমণ, চিকিৎসা, ব্যবসায়িক ব্যয় এবং শিক্ষার মতো ক্ষেত্রেও এর বড় ব্যবহার রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত ভ্রমণ, ব্যবসায়িক ভ্রমণ, চিকিৎসা এবং বিভিন্ন প্রয়োজনে দেশের বাইরে যে অর্থ ব্যয় হয়, তার বাজারও অনেক বড়। সব মিলিয়ে এই খাতে বছরে প্রায় ১৫০ কোটি থেকে ২০০ কোটি ডলারের সম্ভাবনা রয়েছে।
এর আগে পেপ্যালের জন্য বাংলাদেশের মূল আকর্ষণ ছিল বিদেশ থেকে অর্থ গ্রহণের সুযোগ। তবে নতুন নীতির কারণে এখন দেশের ভেতর থেকে বিদেশে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাংলাদেশের বাজার আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
বিদেশে অর্থ পাঠানোর নিয়ম সহজ হচ্ছে
বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের কয়েকটি ক্ষেত্রে নিয়ম সহজ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ভ্রমণ ব্যয়, ব্যবসায়িক খরচ, অনলাইন আন্তর্জাতিক লেনদেন, ফ্রিল্যান্সিং সংশ্লিষ্ট ব্যয় এবং শিক্ষার জন্য অর্থ প্রদান।
এর আগে অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে বিদেশে লেনদেনের জন্য নগদ অর্থ বহন করতে হতো। আন্তর্জাতিক কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা ছিল।
ব্যক্তিগত ভ্রমণের জন্য বর্তমানে বছরে ১২ হাজার ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে বিদেশে চিকিৎসার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে প্রতিবার ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
নতুন ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবস্থা চালু হলে মানুষ আরও সহজে আন্তর্জাতিক লেনদেন করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে শুধু প্রচলিত কার্ড ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমবে না, বরং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনাও আরও আধুনিক হবে।
পেপ্যাল এখনো কেন আসেনি?
বাংলাদেশে পেপ্যাল আসার আলোচনা নতুন নয়। এর আগেও কয়েক দফা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের সাবেক সভাপতি এবং বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ কে এম ফাহিম মাশরুর জানান, ২০১৩ সালে পেপ্যালকে বাংলাদেশে আনার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
সে সময় পেপ্যালের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসেছিল এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিল। তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমানও বিষয়টিতে ইতিবাচক ছিলেন।
তবে পরবর্তী সময়ে পেপ্যালের নিজস্ব ব্যবসায়িক কৌশলে পরিবর্তন আসে। ফলে বাংলাদেশসহ কয়েকটি উন্নয়নশীল দেশে প্রবেশের পরিকল্পনা থেকে প্রতিষ্ঠানটি সরে যায়।
পরবর্তী কয়েক বছর এ বিষয়ে তেমন অগ্রগতি হয়নি। তবে ২০২৪ সালের পর পেপ্যাল আবার বাংলাদেশ ও এশিয়ার কয়েকটি বাজার নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে।
ফাহিম মাশরুরের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে পেপ্যাল না আসার পেছনে বড় কোনো প্রযুক্তিগত বা আইনি বাধা নেই। বরং এটি মূলত পেপ্যালের নিজস্ব সিদ্ধান্তের বিষয়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনের অবকাঠামো রয়েছে এবং স্থানীয় ব্যাংকগুলোও বিভিন্ন বৈশ্বিক পেমেন্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে।
পেপ্যালের বিকল্প থাকলেও চাহিদা রয়েছে
বর্তমানে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা পেপ্যালের বিকল্প হিসেবে পেওনিয়ার, ওয়াইজসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন। ফলে পেপ্যাল এখন আর একমাত্র সমাধান নয়।
তবে অনেক আন্তর্জাতিক গ্রাহক এখনো পেপ্যালকে বেশি পছন্দ করেন। কারণ প্রতিষ্ঠানটির ক্রেতা সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
ফাহিম মাশরুর বলেন, একজন ফ্রিল্যান্সারের একাধিক আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্ট থাকতে পারে। তাই যত বেশি বৈধ পেমেন্ট অপশন থাকবে, ততই তাদের জন্য সুবিধা হবে।
তবে পেপ্যাল ব্যবহারের খরচ তুলনামূলক বেশি। বিভিন্ন ধরনের চার্জ মিলিয়ে অনেক ক্ষেত্রে লেনদেনের প্রায় ৪ শতাংশ পর্যন্ত খরচ হতে পারে। অন্য কিছু প্ল্যাটফর্ম তুলনামূলক কম খরচে সেবা দিয়ে থাকে।
ব্যাংকগুলোও প্রস্তুতি নিচ্ছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন কাঠামোর পর দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও আন্তর্জাতিক ডিজিটাল পেমেন্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্ভাব্য অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন নির্দেশনার আলোকে তারা কী ধরনের পণ্য ও সেবা চালু করা যায়, তা নিয়ে পর্যালোচনা করছে।
তবে এ ক্ষেত্রে বড় বিষয় হলো আন্তর্জাতিক পেমেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের ব্যাংকের সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক তৈরি করতে চায়।
শুধু পেপ্যাল নয়, গুগল ওয়ালেট, পেওনিয়ার, ওয়াইজসহ আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিভিত্তিক অর্থ লেনদেন প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্য অংশীদার হতে পারে।
তবে এসব প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিয়েও ব্যাংকগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ সব ডিজিটাল পেমেন্ট প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকির মাত্রা এক নয়।
সম্ভাবনা আছে, তবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে পেপ্যালকেই
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন উদ্যোগ আন্তর্জাতিক ডিজিটাল অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করেছে। এটি সফল হলে ফ্রিল্যান্সার, উদ্যোক্তা এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীরা আরও সহজে বৈধ পথে অর্থ লেনদেন করতে পারবেন।
তবে শুধু নীতিগত অনুমোদন দিলেই পেপ্যাল বাংলাদেশে চলে আসবে না। প্রয়োজন হবে পেপ্যালের নিজস্ব সিদ্ধান্ত, স্থানীয় ব্যাংকের সঙ্গে কার্যকর অংশীদারত্ব এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সমন্বয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশে পেপ্যালের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত প্রবেশ এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় কাছাকাছি এসেছে। তবে শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগ বাস্তবে রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত এবং স্থানীয় অংশীদারদের প্রস্তুতির ওপর।

