বিশেষ বিশ্লেষণ
একটা গাড়ি কেনার সময় আমরা সাধারণত দামটাই দেখি। ২০ লাখ, ৩০ লাখ, ৫০ লাখ; যত বড় অঙ্ক, সিদ্ধান্তটাও তত বড়। কিন্তু গাড়ি কেনার আসল হিসাবটা শুধু শোরুমের দামে শেষ হয় না। প্রশ্ন হলো, গাড়িটি আপনার জন্য ভবিষ্যতে কোনো আয় বা আর্থিক সুবিধা তৈরি করবে কি না। নাকি কেনার পর থেকেই এটি জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ, বীমা, কর, ঋণের সুদ এবং মূল্য কমে যাওয়ার মাধ্যমে নিয়মিত টাকা খেতে থাকবে? এখানেই ‘গাড়ি বিনিয়োগ কি না’ এই প্রশ্নের আসল উত্তর লুকিয়ে আছে। গাড়ি কেনা কারো কারো জন্য বিনিয়োগ হলেও আবার কারো জন্য দায়বদ্ধতা হতে পারে; এটি নির্ভর করে অনেক রকম হিসাবের উপর। চলুন, বিষয়টি বোঝার চেস্টা করি।
আগে একটি ভুল ধারণা পরিষ্কার করা যাক
অর্থনীতির ভাষায় ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়িকে সরাসরি ‘দায়’ বলা পুরোপুরি সঠিক নয়। গাড়ি আপনার মালিকানাধীন একটি সম্পদ। বিপরীতে গাড়ি কেনার জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে সেই ঋণটি হলো দায়। তবে ব্যক্তিগত অর্থব্যবস্থার দৃষ্টিতে গাড়ি অনেক সময় এমন একটি সম্পদ, যার মূল্য সময়ের সঙ্গে কমে এবং মালিককে নিয়মিত খরচ বহন করতে হয়। অর্থাৎ হিসাবের খাতায় এটি সম্পদ হলেও, আপনার মাসিক বাজেটে এটি বড় ধরনের খরচের উৎস হতে পারে। এই পার্থক্যটা না বুঝেই অনেক মানুষ গাড়িকে ‘বিনিয়োগ’ ধরে নেন।
ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ডস (আইএএস) ১৬তেও সম্পদের মূল্য কমার বিষয়টি ‘ডিপ্রিসিয়েশন’ বা অবচয়ের মাধ্যমে বিবেচনা করা হয়। মূল নীতিটি হলো, কোনো সম্পদ থেকে ভবিষ্যতে যে অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে, ব্যবহারের সঙ্গে সেই সুবিধা ধীরে ধীরে কমে গেলে তার মূল্যও হিসাবের মধ্যে কমতে থাকে। ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে আইএএস ১৬ অনুযায়ী হিসাব করতে হয় না, কিন্তু এই অর্থনৈতিক ধারণাটি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নতুন গাড়ি কেনার পর সেটি একই দামে বিক্রি করতে না পারার বিষয়টি মূলত এখানেই হিসাব করা হয়।
এবার নিজের জীবনের একটি সাধারণ হিসাব ভাবুন। আপনি ৩০ লাখ টাকায় একটি গাড়ি কিনলেন। কয়েক বছর পর সেটি বিক্রি করে যদি ২০ লাখ টাকা পাওয়া যায়, তাহলে শুধু ক্রয়মূল্য আর বিক্রয়মূল্যের পার্থক্যেই ১০ লাখ টাকা কমে গেছে। এর সঙ্গে যদি ঋণের সুদ, জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ, বীমা, নিবন্ধন ও অন্যান্য খরচ যোগ হয়, তাহলে গাড়িটির প্রকৃত মালিকানা-খরচ আরও বড় হয়। আর গাড়ি কেনার জন্য নিজের সঞ্চয়ের টাকা ব্যবহার করলে আরেকটি খরচ সামনে আসে, অপর্চুনিটি কস্ট। সেই ৩০ লাখ টাকা অন্য কোনো সম্পদ, ব্যবসা বা সুদবাহী বিনিয়োগে রাখলে যে সম্ভাব্য আয় হতে পারত, সেটিও গাড়ি কেনার সিদ্ধান্তের অংশ।
ঋণ নিলে হিসাবটা আরও বদলে যায়
বাংলাদেশে ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান ভোক্তা অর্থায়ন বিধিমালায় ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়ির অটো ঋণের সর্বোচ্চ মেয়াদ পাঁচ বছর এবং একজন ব্যক্তির এই খাতে সর্বোচ্চ অর্থায়নের সীমা ৫০ লাখ টাকা নির্ধারিত আছে। গাড়ির মূল্যের অন্তত ১০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট রাখার শর্তও রয়েছে। একই সঙ্গে ঋণ নেওয়া গাড়ির বীমা এবং খেলাপি হলে পুনর্দখলের বিষয়েও বিধান রয়েছে। অর্থাৎ গাড়ি কেনা শুধু ‘মাসে কত টাকা কিস্তি দিতে পারব’ এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; ব্যাংকও এটিকে একটি ঝুঁকিপূর্ণ ভোক্তা ঋণ হিসেবে বিবেচনা করে।
এখানে সবচেয়ে বিপজ্জনক ভুলটি হয় কিস্তিকে গাড়ির প্রকৃত খরচ ধরে নেওয়া। ধরুন, কোনো গাড়ি কিনতে ২০ লাখ টাকা ঋণ নিলেন। মাসিক কিস্তি হয়তো আপনার আয় অনুযায়ী সামলানো সম্ভব। কিন্তু কিস্তির বাইরে জ্বালানি, সার্ভিসিং, টায়ার, বীমা, কর ও অন্যান্য খরচ রয়েছে। ফলে ‘কিস্তি দিতে পারছি’ মানেই ‘গাড়িটি আমার সামর্থ্যের মধ্যে’ এমন সিদ্ধান্ত ঠিক নয়। একটি ব্যাংকের জুলাই ২০২৬-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাদের খুচরা ঋণের বেস রেট ছিল ৯ দশমিক ৪০ শতাংশ; প্রকৃত অটো ঋণের সুদ নির্ধারণে এর সঙ্গে নির্দিষ্ট মার্জিন যুক্ত হয়। অর্থাৎ সুদের হারও স্থির ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশে গাড়ির মালিকানার সঙ্গে সরকারি কর ও ফিও যুক্ত থাকে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বর্তমান আয়কর কাঠামোয় মোটরযানের ইঞ্জিন ক্ষমতা অনুযায়ী অগ্রিম আয়করের বিধান রয়েছে, আর বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী গাড়ির নিবন্ধন, ফিটনেস, রোড ট্যাক্সসহ বিভিন্ন ফি ও করও মালিককে বহন করতে হয়। অর্থাৎ গাড়ির দাম দিয়ে গাড়ির মোট খরচ শেষ হয়ে যায় না। গাড়ি যত বেশি ব্যবহার করবেন, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বাড়বে; কম ব্যবহার করলেও অবচয়, কর, বীমা ও মালিকানার অন্যান্য স্থায়ী খরচ থাকবে।
তাহলে কখন গাড়ি সত্যিই ‘বিনিয়োগ’ হতে পারে?
এখানেই বিষয়টি একেবারে সাদা-কালো নয়। একজন ব্যক্তি গাড়ি কিনে সেটি দিয়ে যদি ব্যবসায়িক পরিবহন চালান, পণ্য সরবরাহ করেন, ভাড়ায় ব্যবহার করেন বা এমন কোনো কাজ করেন যার মাধ্যমে নিয়মিত আয় তৈরি হয়, তাহলে গাড়িটি উৎপাদনশীল সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তখন হিসাবটা হবে, গাড়ি থেকে বছরে কত আয় আসছে, সেই আয় থেকে জ্বালানি, চালক, রক্ষণাবেক্ষণ, বীমা, কর, ঋণের সুদ এবং অবচয়ের মতো খরচ বাদ দেওয়ার পর কী থাকে। যদি নিট অর্থনৈতিক সুবিধা গাড়িটির মালিকানা ও মূলধনের খরচকে ছাড়িয়ে যায়, তখন গাড়ি কেনার সিদ্ধান্তকে বিনিয়োগের কাছাকাছি বলা যায়।
কিন্তু ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়ির ক্ষেত্রে হিসাবটি অন্যরকম। এখানে গাড়ি সাধারণত সরাসরি আয় তৈরি করে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে গাড়িটির কোনো আর্থিক মূল্য নেই। প্রতিদিন দীর্ঘ যাতায়াতে সময় বাঁচানো, গণপরিবহনের সীমাবদ্ধতা এড়ানো, পরিবারের সদস্যদের চলাচলের সুবিধা এসবেরও অর্থনৈতিক মূল্য আছে। কিন্তু সেগুলোকে ‘বিনিয়োগের রিটার্ন’ বলার আগে দেখতে হবে, একই সুবিধা কম খরচে অন্য কোনো উপায়ে পাওয়া যেত কি না। যদি গণপরিবহন, রাইড শেয়ারিং বা ভাড়া গাড়ির মাধ্যমে একই প্রয়োজন মেটানো যায় এবং তার খরচ ব্যক্তিগত গাড়ির মোট মালিকানা-খরচের তুলনায় অনেক কম হয়, তাহলে গাড়ি কেনা আর্থিকভাবে সবচেয়ে দক্ষ সিদ্ধান্ত নাও হতে পারে।
এখানে একটি সহজ পরীক্ষাই সবচেয়ে কার্যকর। গাড়ি কেনার আগে শুধু ‘আমি কিস্তি দিতে পারব কি না’ নয়; বরং হিসাব করুন,গাড়ির জন্য বছরে মোট কত টাকা বের হবে এবং এর বিনিময়ে আপনি কী পাবেন। ক্রয়মূল্য ও ভবিষ্যৎ বিক্রয়মূল্যের পার্থক্য, ঋণের সুদ, জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ, বীমা, কর ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রকৃত মালিকানা-খরচ বের করুন। তারপর দেখুন, গাড়িটি যে আয় তৈরি করবে বা যে সময় ও বিকল্প পরিবহন খরচ বাঁচাবে, তার মূল্য সেই খরচকে যৌক্তিক করে কি না। এই হিসাবের উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে গাড়ি আপনার জন্য অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিসঙ্গত সম্পদ হতে পারে। উত্তর ‘না’ হলে, গাড়িটি যত দামিই হোক, সেটিকে বিনিয়োগ বলা কঠিন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গাড়ি ভালো না খারাপ, বিনিয়োগ না খরচ এমন কোনো সার্বজনীন উত্তর নেই। একই গাড়ি একজন ব্যবসায়ীর জন্য আয় তৈরির যন্ত্র হতে পারে, আবার আরেকজনের জন্য এমন একটি ভোগ্য সম্পদ হতে পারে যার মূল্য সময়ের সঙ্গে কমে এবং খরচ বাড়ে। তাই গাড়ি কেনার সিদ্ধান্তের আসল প্রশ্ন ‘গাড়ির দাম কত?’ নয়; বরং ‘এই গাড়ি আমার টাকা কোথায় নিয়ে যাবে; আয় তৈরি করবে, নাকি প্রতি মাসে আরও টাকা বের করে নেবে?’ সেই হিসাবটি পরিষ্কার থাকলে গাড়ি কেনা আবেগের সিদ্ধান্ত না হয়ে আর্থিক সিদ্ধান্তে পরিণত হয়।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

