বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালু এবং অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ এগিয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে ১৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংক চুক্তি করেছে।
এসব ব্যাংকের অংশগ্রহণে প্রাথমিকভাবে ৪১ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মো. শাহরিয়ার সিদ্দিকী।
চুক্তিবদ্ধ ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে সোনালী, অগ্রণী, রূপালী, ব্র্যাক, সিটি, যমুনা, ডাচ্-বাংলা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, উত্তরা, প্রাইম, ব্যাংক এশিয়া, এনসিসি, পূবালী, ইস্টার্ন, মার্কেন্টাইল, ট্রাস্ট ও সাউথইস্ট ব্যাংক।
গত ২৩ মে বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করাসহ অর্থনীতিকে চাঙা করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার এই তহবিল ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। মোট অর্থের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা আসবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা থেকে।
প্যাকেজের ২০ হাজার কোটি টাকা দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ তহবিল থেকে বেসরকারি উদ্যোক্তারা গড়ে সাড়ে ৭ শতাংশ সুদে ঋণ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তিন ব্যাংকের মধ্যে সোনালী ব্যাংক ২০ হাজার কোটি, অগ্রণী ব্যাংক ২ হাজার কোটি এবং রূপালী ব্যাংক ২ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ফলে শুধু এই তিন ব্যাংকের অংশগ্রহণেই তহবিলে যুক্ত হচ্ছে ২৪ হাজার কোটি টাকা।
তবে ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বেশ কিছু ব্যাংকের অতিরিক্ত অর্থ বিনিয়োগের সক্ষমতা সীমিত। ফলে কয়েকটি ব্যাংক এই তহবিলে অর্থ দিতে অনাগ্রহ দেখালেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে তাদের ওপর চাপ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
শিল্পোদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, শুধু ঋণ দিয়ে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কারখানা টেকসইভাবে চালু করা কঠিন হবে। এর জন্য প্রথমেই জ্বালানি সংকটের সমাধান প্রয়োজন। বর্তমানে চালু থাকা অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানও গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে স্বাভাবিক উৎপাদন চালাতে পারছে না।
তাদের মতে, বছরের পর বছর বন্ধ থাকা কোনো কারখানা নতুন করে ঋণ নিয়ে উৎপাদনে ফিরলেও প্রয়োজনীয় গ্যাস ও বিদ্যুৎ না পেলে সেই উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হবে। তাই শুধু বন্ধ কারখানাকে অর্থায়ন না করে বর্তমানে চালু থাকা কিন্তু সংকটে পড়া সম্ভাবনাময় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে প্রকৃত অবস্থা যাচাই না করে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ করা হলে ভবিষ্যতে তা খেলাপি ঋণে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। কারণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার পেছনে সব সময় শুধু অর্থের অভাব কাজ করে না। অনেক ক্ষেত্রে জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয়, বাজার পরিস্থিতি, শ্রমিক ব্যবস্থাপনা এবং অবকাঠামোগত সমস্যাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শিল্প খাতের সংকটের প্রভাব পড়েছে পোশাক খাতেও। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সদস্য প্রতিষ্ঠান সংখ্যা ২ হাজার থেকে কমে বর্তমানে ৮০০-তে নেমে এসেছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ‘গ্রিন সোয়েটার’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকেও গত এক বছরে পুনরায় উৎপাদনে ফেরানো সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।
ব্যাংকারদের মতে, শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে কম সুদের ঋণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু এটিই যথেষ্ট নয়। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, পর্যাপ্ত গ্যাস, উন্নত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং স্থিতিশীল ব্যবসায়িক পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে।
তাদের আশঙ্কা, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে কম সুদে ঋণ নেওয়া প্রতিষ্ঠানও সময়মতো কিস্তি পরিশোধ করতে ব্যর্থ হতে পারে। এর ফলে ব্যাংকিং খাতে নতুন করে খেলাপি ঋণের চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এ কারণে ঋণ অনুমোদনের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা, উৎপাদন সক্ষমতা, বাজার ও পণ্যের অর্ডারের পরিস্থিতি, জ্বালানি পাওয়ার সম্ভাবনা এবং আগের ঋণের তথ্য যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, যথাযথ যাচাই ও কার্যকর নজরদারির মাধ্যমে এই প্যাকেজ বাস্তবায়ন করা গেলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানো সম্ভব। এর পাশাপাশি রপ্তানি এবং বেসরকারি বিনিয়োগেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে ঋণের অর্থ নির্ধারিত কাজে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজের বড় একটি অংশ যেখানে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে, সেখানে শুধু অর্থের জোগান দিয়ে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাবে না।
শিল্পের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানের পাশাপাশি ঋণ বিতরণ ও ব্যবহারেও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। জ্বালানি সরবরাহ, বাজার পরিস্থিতি, অবকাঠামো এবং বিনিয়োগ পরিবেশের সমস্যাগুলো সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে এই তহবিল শিল্প পুনরুজ্জীবনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যথায় বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ হলেও তার একটি অংশ ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

