আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন করে চাপ তৈরি হচ্ছে। অন্যান্য দেশের মুদ্রার তুলনায় টাকা শক্তিশালী হয়ে ওঠায় বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের দাম তুলনামূলক বেশি পড়ছে। এতে রপ্তানি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে দেশের রিয়েল ইফেক্টিভ এক্সচেঞ্জ রেট (আরইইআর) বেড়ে ১০৩ দশমিক ৯৩-এ উঠেছে। জুনের তুলনায় এই সূচক বেড়েছে ১ দশমিক ২৮ পয়েন্ট।
আরইইআর মূলত মুদ্রার প্রকৃত শক্তিমত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে একটি দেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। এতে বিভিন্ন দেশের মুদ্রার বিনিময় হার, মূল্যস্ফীতি ও বাণিজ্যের পরিমাণ বিবেচনায় নেওয়া হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১৭টি বাণিজ্যিক অংশীদারের মুদ্রাকে বিবেচনায় নিয়ে এই হিসাব করা হয়। ২০২৪ অর্থবছরকে ভিত্তি ধরে সূচকের মান ১০০ নির্ধারণ করা হয়েছে।
সূচক বাড়ার অর্থ হলো, মূল্যস্ফীতি ও বাণিজ্যের হিসাব সমন্বয়ের পর বাস্তব অর্থে টাকার মূল্য তুলনামূলকভাবে বেড়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের দাম প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাড়তে পারে। বিপরীতে আমদানিকারকদের জন্য বিদেশি পণ্য তুলনামূলক সস্তা হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আরইইআর যেভাবে বাড়ছে, তাতে মুদ্রার বিনিময় হার কিছুটা সমন্বয়ের বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। টাকা অতিরিক্ত শক্তিশালী থাকলে রপ্তানি আয়নির্ভর খাতগুলো সমস্যায় পড়তে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
তবে আরইইআর ১০০-এর ওপরে উঠেছে বলেই নির্দিষ্ট হারে টাকা অবমূল্যায়ন করতে হবে—এমন নয়। মূল্যস্ফীতির পার্থক্য, উৎপাদনশীলতা, বৈদেশিক মূলধনের প্রবাহ এবং দেশের বৈদেশিক খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর মুদ্রার প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের মাত্রা নির্ভর করে।
জুলাইয়ের শেষে ডলারের বিপরীতে টাকার নামমাত্র বিনিময় হার ছিল ১২৩ টাকা ৯৮ পয়সা। জুন থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ডলারের বিপরীতে টাকা প্রায় শূন্য দশমিক ৩৫ শতাংশ অবমূল্যায়িত হয়েছে। একই সময়ে ভারতীয় রুপির অবমূল্যায়ন হয়েছে ১ শতাংশেরও বেশি।
ফলে প্রতিযোগী দেশগুলোর মুদ্রার মূল্য যদি দ্রুত কমে যায়, আর বাংলাদেশের আরইইআর তুলনামূলকভাবে উঁচু থাকে, তাহলে দেশের রপ্তানিকারকদের ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ তৈরি পোশাক বা আরএমজি খাত থেকে আসে। কম খরচে উৎপাদনের সুবিধা নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা এই খাতের জন্য বিনিময় হার গুরুত্বপূর্ণ। টাকা শক্তিশালী হয়ে থাকলে একই পণ্যের জন্য বিদেশি ক্রেতাদের তুলনামূলক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে।
অন্যদিকে, আরইইআর কমলে অন্যান্য বিষয় অপরিবর্তিত থাকলে বাংলাদেশি পণ্যের আন্তর্জাতিক মূল্য প্রতিযোগিতামূলক হওয়ার সুযোগ বাড়ে। আর সূচক আরও বাড়তে থাকলে বৈশ্বিক বাজারে রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এ অবস্থায় রপ্তানি আয় ধরে রাখতে মুদ্রার বিনিময় হার, মূল্যস্ফীতি ও উৎপাদন ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

