নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর দেশের অর্থনীতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এত অল্প সময়ে একটি দেশের অর্থনীতির দীর্ঘদিনের সমস্যা পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়, বিশেষ করে যখন ব্যাংকিং, জ্বালানি, বিনিয়োগ ও মূল্যস্ফীতির মতো খাতে আগে থেকেই বড় ধরনের চাপ জমে থাকে। তারপরও ছয় মাস এমন একটি সময়, যখন সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের দিকনির্দেশনা, অগ্রাধিকার এবং সমস্যাগুলো মোকাবিলার সক্ষমতা সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে বড় বিজয়ের পর বিএনপি সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করে। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পাঁচ বছরের জন্য দায়িত্ব নেন। ১৭ আগস্ট সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে এবং এখন তারা সপ্তম মাসে প্রবেশ করেছে।
সাধারণত একটি নতুন সরকারের প্রথম কয়েক মাসকে তুলনামূলক স্বস্তির সময় হিসেবে দেখা হয়। নতুন প্রশাসন তখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিজেদের কাজের কাঠামো তৈরি করে, পরিকল্পনা সাজায় এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে। জনগণও এ সময় সরকারকে কিছুটা সুযোগ দেয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকায় কঠিন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও থাকে।
কিন্তু সময় যত এগোয়, সরকারের কাজ তত বেশি কঠোরভাবে মূল্যায়িত হতে শুরু করে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতেও সেটিই ঘটছে। কারণ অর্থনীতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক এমন বার্তা দিচ্ছে, যা সরকারের জন্য উদ্বেগের।
সবচেয়ে বড় সমস্যা এখনো মূল্যস্ফীতি।
মানুষের দৈনন্দিন জীবনে অর্থনীতির সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়ে বাজারদরের মাধ্যমে। আয় যতই বাড়ুক, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যদি তার চেয়ে দ্রুত বাড়ে, তাহলে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। বর্তমানে বাংলাদেশে ঠিক এই চাপটাই দেখা যাচ্ছে।
জুলাই ২০২৬-এ সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এটি গত আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন হলেও সাধারণ মানুষের জন্য এখনো যথেষ্ট বেশি। কারণ একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতিকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি।
কৃষি, শিল্প ও সেবা—এই তিনটি বড় খাত নিয়ে গঠিত মজুরি হার সূচক জুলাইয়ে সামান্য বেড়ে ৮ দশমিক ২২ শতাংশ হয়েছে। জুনে এটি ছিল ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। অর্থাৎ মজুরি বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু জুলাইয়ের ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ মূল্যস্ফীতির তুলনায় তা এখনো নিচে রয়েছে।
এই ব্যবধান ছোট মনে হলেও সাধারণ পরিবারের ওপর এর প্রভাব বড়। কারণ এর অর্থ হলো, কাগজে আয় বাড়লেও সেই আয় দিয়ে আগের সমপরিমাণ পণ্য ও সেবা কেনা যাচ্ছে না। দীর্ঘ সময় এমন পরিস্থিতি চললে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের সঞ্চয় কমে এবং পরিবারের খরচের অগ্রাধিকার বদলাতে শুরু করে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর উৎস একক নয়। খাদ্য সরবরাহ, জ্বালানি ব্যয়, আমদানি খরচ, পরিবহন, মুদ্রাবাজার, সুদের হার এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা—সবকিছুই দামের ওপর প্রভাব ফেলে। ফলে শুধু একটি পদক্ষেপের মাধ্যমে এই চাপ কমানো কঠিন।
অর্থনীতির দ্বিতীয় বড় উদ্বেগ বিনিয়োগের গতি।
নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রত্যাশা ছিল, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়লে বিনিয়োগ পরিবেশও দ্রুত উন্নত হবে। কিন্তু ছয় মাস পরও সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার বড় ব্যবধান দেখা যাচ্ছে।
এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যায় ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধিতে।
জুনের শেষ নাগাদ সরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩০ দশমিক ৪৩ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম নিম্ন হার।
এই পার্থক্য অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বেসরকারি খাত নতুন শিল্প, ব্যবসা সম্প্রসারণ, যন্ত্রপাতি কেনা কিংবা নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সাধারণত ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়। বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি খুব কম থাকা তাই বিনিয়োগের দুর্বলতার একটি বড় সংকেত।
ব্যাংকগুলোতে অর্থের অভাব আছে—এমনটিও বলা যাচ্ছে না।
জুনে ব্যাংক খাতের অতিরিক্ত তারল্য, সরকারি ও অন্যান্য আর্থিক সিকিউরিটিসহ, ৩৯ দশমিক ৪০ শতাংশ বেড়ে ৪ দশমিক ০৮ ট্রিলিয়ন টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ ব্যাংকের হাতে অর্থ আছে, কিন্তু সেই অর্থের বড় অংশ নতুন বেসরকারি বিনিয়োগে যাচ্ছে না।
এখানেই অর্থনীতির একটি বড় বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়।
একদিকে ব্যাংকে অতিরিক্ত অর্থ জমছে, অন্যদিকে উদ্যোক্তারা নতুন ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক। এর কারণ হিসেবে উচ্চ সুদের হার, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং আইনশৃঙ্খলা ও আইনের শাসন নিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগকে সামনে আনা হচ্ছে। উৎপাদন ব্যয় যখন বেশি থাকে এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকে, তখন উদ্যোক্তারা সাধারণত নতুন বিনিয়োগ স্থগিত রাখেন।
বিদেশি বিনিয়োগেও একই ধরনের দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে।
২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে নিট প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ ১৮ শতাংশ কমে ১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে নেমেছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে ২০২৫–২৬ অর্থবছরের পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়া শুধু অর্থের প্রবাহ কমার বিষয় নয়। এর সঙ্গে প্রযুক্তি, দক্ষতা, নতুন কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংযোগও জড়িয়ে থাকে। ফলে এই ধারা দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে।
তবে বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হিসেবে সামনে এসেছে জ্বালানি সংকট।
বাংলাদেশের শিল্প ও অর্থনীতির বড় একটি অংশ এখন জ্বালানির ওপর এমনভাবে নির্ভরশীল যে বিদ্যুৎ কিংবা গ্যাস সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা দেখা দিলে তার প্রভাব সরাসরি উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে পড়ে।
বর্তমান সরকার এমন একটি জ্বালানি খাত পেয়েছে, যেখানে আমদানিনির্ভরতার মাত্রা আগে থেকেই অনেক বেশি। ২০০৯–২০২৪ সময়কালে দেশ ক্রমেই আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। একই সময়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ হয়নি বলে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা রয়েছে।
২০১৫ সালের দিকে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান বড় হতে শুরু করে। এরপর ২০১৭ সালে গ্যাস খাতের একটি মহাপরিকল্পনায় ঘাটতি মোকাবিলায় আমদানিনির্ভর সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানি শুরু করে।
মূল প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, তৎকালীন সরকারের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি, মন্ত্রী, আমলা ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সিদ্ধান্তের ফলে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের বদলে আমদানিনির্ভরতা বেড়ে যায়। এসব অভিযোগের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায় নিয়ে আলাদা অনুসন্ধান প্রয়োজন হলেও একটি বিষয় স্পষ্ট—বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতা এখন অনেক বেশি।
বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। ফলে গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও সঙ্গে সঙ্গে চাপ পড়ে।
২০১৪ সালে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করে। এর সুফল যেমন ছিল, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার ঝুঁকিও দেশের অর্থনীতির ভেতরে প্রবেশ করে।
এই ঝুঁকির প্রথম বড় ধাক্কা দেখা যায় ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়। সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য তখন জ্বালানি সংগ্রহ ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে এবং দেশে বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দেয়।
মূল লেখার তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় বড় ধাক্কা আসে চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর পর। ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং বাংলাদেশ নতুন করে জ্বালানি সংকটের মুখে পড়ে।
এই পরিস্থিতি দেখিয়ে দেয়, জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল অর্থ দিয়ে বিদেশ থেকে জ্বালানি কেনার বিষয় নয়। সরবরাহপথ, ভূরাজনীতি, চুক্তি, পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক সংঘাত—সবকিছুর ওপর আমদানিনির্ভর দেশকে নজর রাখতে হয়।
৫ আগস্ট ২০২৪ ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। প্রায় ১৮ মাস দায়িত্বে থাকা সেই সরকার আর্থিক খাত ও জ্বালানি খাতে আগের ক্ষতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও জ্বালানি খাতে খুব বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়নি। এর অন্যতম কারণ হিসেবে দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস ও বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তিগুলোকে দায়ী করা হয়েছে। অনেক চুক্তি এমনভাবে করা হয়েছিল যে, সেগুলো বাতিল বা পরিবর্তন করতে গেলেও বাংলাদেশকে বড় আর্থিক মূল্য দিতে হতে পারে।
বর্তমান বিএনপি সরকারও একই সীমাবদ্ধতার মধ্যে সমাধান খুঁজছে।
এর একটি উদাহরণ ভারত থেকে আদানির বিদ্যুৎ আমদানি।
২০২৪–২৫ অর্থবছরে আদানি থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের গড় মূল্য ছিল প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ১৪ টাকা ৮৬ পয়সা। ২০১৭ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মেয়াদ ২৫ বছর। ফলে বর্তমান সরকার চাইলেও সহজে চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না। মূল প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তির কিছু শর্ত বাংলাদেশের জন্য প্রতিকূল হওয়ায় তা বাতিল করতে গেলে আরও বড় আর্থিক দায় তৈরি হতে পারে।
এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি পুরোনো কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সামনে আনে—একটি সরকারের নেওয়া দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের মূল্য অনেক সময় পরবর্তী সরকারকেও দিতে হয়।
বর্তমান জ্বালানি সংকট দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম। বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিল্প খাত।
কারখানায় নিয়মিত বিদ্যুৎ ও গ্যাস না থাকলে উৎপাদনের সময় বেড়ে যায়। নিজস্ব জেনারেটর চালাতে বাড়তি অর্থ ব্যয় হয়। উৎপাদনের ব্যয় বাড়ে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও কমতে পারে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্যও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বিনিয়োগকারী যদি মনে করেন কারখানা স্থাপনের পর পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ বা গ্যাস পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকবে, তাহলে তিনি নতুন প্রকল্প স্থগিত রাখতে পারেন কিংবা অন্য দেশে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
ফলে জ্বালানি সংকটকে শুধু বিদ্যুতের সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, উৎপাদন এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশের অর্থনীতির এই সমস্যাগুলো এখন একে অন্যকে আরও জটিল করে তুলছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমাচ্ছে। উচ্চ সুদের হার ব্যবসায়ীদের নতুন ঋণ নিতে নিরুৎসাহিত করছে। বিনিয়োগ কম থাকায় নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে ধীরগতিতে। আবার জ্বালানি সংকট উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং বিদ্যমান ব্যবসাকেও চাপের মধ্যে ফেলছে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রবৃদ্ধি কমে গেলে সরকারের রাজস্ব আহরণও চাপে পড়তে পারে। রাজস্ব কমলে অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন খাতে ব্যয়ের সক্ষমতাও সীমিত হয়ে যায়।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু হতাশার দৃষ্টিতে দেখলে পুরো বাস্তবতা ধরা পড়বে না। সরকার এখনো তার মেয়াদের শুরুর পর্যায়ে রয়েছে। ছয় মাসে বহু বছরের কাঠামোগত সমস্যা সমাধান করা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু কোন সমস্যাকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করা হচ্ছে, সেটিই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি আর্থিক নীতির সঙ্গে সমন্বয় প্রয়োজন। বিনিয়োগ বাড়াতে শুধু ঋণ সহজলভ্য করলেই হবে না; ব্যবসায়ীদের আস্থা, অবকাঠামো, নিরাপত্তা এবং নীতির ধারাবাহিকতাও নিশ্চিত করতে হবে।
জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে বড় ধরনের বিনিয়োগ ছাড়া আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি কমানো কঠিন হবে। একই সঙ্গে পুরোনো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চুক্তিগুলোর আর্থিক প্রভাব স্বচ্ছভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ এখন এমন একটি পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে অর্থনৈতিক নীতির ভুলের মূল্য অনেক বেশি হতে পারে।
জুলাই ২০২৬-এ ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি, ৪ দশমিক ০৮ ট্রিলিয়ন টাকার অতিরিক্ত ব্যাংক তারল্য এবং প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগে ১৮ শতাংশ পতন—এসব সূচক আলাদা আলাদা তথ্য নয়। এগুলো একসঙ্গে অর্থনীতির বর্তমান দুর্বলতার একটি বড় চিত্র তুলে ধরে।
এর সঙ্গে যদি দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট যুক্ত হয়, তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও কমতে পারে এবং কর্মসংস্থানের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সরকার কি এই সমস্যাগুলোকে বিচ্ছিন্ন সংকট হিসেবে দেখবে, নাকি মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ, জ্বালানি, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধিকে একই অর্থনৈতিক কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করে সমন্বিত পদক্ষেপ নেবে।
নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস হয়তো চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু ভবিষ্যৎ অর্থনীতি কোন দিকে যাবে, তার প্রাথমিক সংকেত ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।
আগামী কয়েক মাসে মূল্যস্ফীতি কতটা নিয়ন্ত্রণে আসে, বেসরকারি বিনিয়োগ ফিরতে শুরু করে কি না এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে জ্বালানি সরবরাহ কতটা স্থিতিশীল করা যায়—এই তিনটি বিষয়ই বাংলাদেশের অর্থনীতির পরবর্তী পথ অনেকাংশে নির্ধারণ করবে।

