গাজীপুরের পোশাক কারখানায় কাজ করতেন আলাউদ্দিন। ওভারটাইমসহ মাসে ১৫ হাজার টাকার বেশি আয় হতো তাঁর। কিন্তু এক মাসের ব্যবধানে সেই আয় নেমে এসেছে ১০ হাজার টাকার মূল বেতনের কাছাকাছি। কারখানায় কাজের সময় কমে যাওয়ায় ওভারটাইমের সুযোগও নেই।
৪০ বছর বয়সী এই মেশিন অপারেটরের মতো একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন গাজীপুরের অনেক পোশাকশ্রমিক। একদিকে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে কাজের সময় কমে যাওয়ায় সরাসরি কমছে শ্রমিকদের আয়।
আলাউদ্দিনের কথায়, আগে দুপুরে ভাত খেতেন। এখন খরচ সামলাতে রুটি আর কলা খেয়েই থাকতে হচ্ছে।
অর্ধেক নেমেছে কারও আয়
কোনাবাড়ীর একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন আসমা আক্তার। তাঁর মাসিক আয়ও কমে প্রায় অর্ধেকে দাঁড়িয়েছে।
তিনি জানান, আগে মাসে প্রায় ২০ হাজার টাকা আয় করতেন। এখন পান ১০ হাজার টাকা। কারখানায় কাজের সময় কমে যাওয়ায় ওভারটাইমও বন্ধ।
সন্তান ও পরিবার নিয়ে গাজীপুরে থাকা আসমার জন্য আয় কমে যাওয়া বড় চাপ তৈরি করেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দাম সামলাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে অর্ধেক আয় নিয়ে সংসার চালানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পোশাক কারখানাগুলোতে সাধারণত কাজের চাপ বেশি থাকে। বড়দিনের বাজার ধরতে এই সময়ে অনেক কারখানা প্রায় দিন-রাত উৎপাদন চালায়। ফলে শ্রমিকদেরও ওভারটাইম করে বাড়তি আয় করার সুযোগ থাকে।
কিন্তু এবার গ্যাস সংকট সেই চিত্র বদলে দিয়েছে।
অর্ডার আছে, কাজ নেই
গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে এক মাসের বেশি সময় ধরে গ্যাস সংকট চলছে। কক্সবাজারে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর সংকট আরও তীব্র হয়। আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও পরে আবার গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসে।
ফলে অনেক কারখানায় পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় বয়লার ও উৎপাদন যন্ত্র চালানো যাচ্ছে না। কোথাও কাজের সময় কমানো হয়েছে, কোথাও আবার শ্রমিকদের বিভিন্ন শিফটে ভাগ করে কাজ চালানোর চেষ্টা চলছে।
গাজীপুর শহরে শিল্প পুলিশের হিসাবে বর্তমানে ২ হাজার ৬৭৪টি পোশাক ও শিল্পকারখানা চালু রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোর কাছেই পর্যাপ্ত রপ্তানি আদেশ রয়েছে। সমস্যা হচ্ছে, গ্যাসের অভাবে সেই অর্ডারের পণ্য সময়মতো তৈরি ও সরবরাহ করা যাচ্ছে না।
ডিজেলে উৎপাদন চালাতে বাড়তি খরচ
গ্যাসের বিকল্প হিসেবে কিছু কারখানা ডিজেল ব্যবহার করছে। এতে উৎপাদন চালু রাখা গেলেও বাড়ছে খরচ।
এমএম নিটওয়্যার লিমিটেডের উৎপাদন পরিচালক নুরুল হক জানান, জরুরি রপ্তানি আদেশের সময়সীমা ধরে রাখতে তাদের প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ টাকার ডিজেল কিনতে হচ্ছে।
তাঁর মতে, এভাবে দীর্ঘদিন অতিরিক্ত ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। উৎপাদন কমে গেলে এবং শ্রমিকদের সময়মতো মজুরি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়লে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতারাও বাংলাদেশ থেকে অর্ডার সরিয়ে নিতে পারেন।
ডিবিএল গ্রুপের মানবসম্পদ বিভাগের ব্যবস্থাপক এম নাঈমুল হক বলেন, বড়দিনের মৌসুম সামনে রেখে তাদের পর্যাপ্ত অর্ডার রয়েছে। অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে কাজ পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
উৎপাদন কমেছে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ
তিতাস গ্যাসের গাজীপুর কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন জানান, চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ খুবই কম। যতটুকু পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়েই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
শিল্প পুলিশের সুপারিনটেনডেন্ট আমজাদ হোসেন বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে গাজীপুরের কারখানাগুলোর উৎপাদন প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমেছে।
এখন পর্যন্ত শিফট বাড়ানো এবং শ্রমিকদের বিভিন্নভাবে কাজে ভাগ করে দিয়ে বড় ধরনের সংকট এড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে দীর্ঘদিন এই পরিস্থিতি চললে কারখানা মালিকদের জন্যও চাপ বাড়বে।
আনন্তা গ্রুপের গাজীপুরে চারটি কারখানায় প্রায় ১৮ হাজার কর্মী কাজ করেন। প্রতিষ্ঠানটির মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক মাজহারুল ইসলাম মিলন জানান, গ্যাসনির্ভর উৎপাদন চালু রাখতে তাদেরও ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে। শুধু ওয়াশিং মেশিন চালাতেই প্রতিদিন প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকার ডিজেল প্রয়োজন হচ্ছে।
চাকরি হারানোর আশঙ্কা
গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারেন শ্রমিকেরা।
ন্যাশনাল গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আশরাফুজ্জামান বলেন, উৎপাদন বন্ধ বা কমে গেলেও কারখানা মালিকদের শ্রমিকদের বেতন ও বিভিন্ন ভাতা দিতে হচ্ছে। কিন্তু পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে লোকসান কমাতে কিছু মালিক ছাঁটাই বা কারখানা বন্ধের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হতে পারেন।
এতে বর্তমানে কমে যাওয়া আয়ের পাশাপাশি অনেক শ্রমিকের চাকরিও হারানোর আশঙ্কা তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, গ্যাস সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক ও মালিকদের জন্য সরকারের আলাদা সহায়তা কর্মসূচি নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, শুধু গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার দিকে নজর দিলেই হবে না; গ্যাস সংকটের কারণে কতজন শ্রমিকের চাকরি গেছে বা আয় কমেছে, তার হিসাবও করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের সাময়িক সহায়তার ব্যবস্থা করা জরুরি।
সংকটের প্রভাব ছড়াতে পারে পুরো সমাজে
শ্রমিকের আয় কমে গেলে তার প্রভাব শুধু একটি পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকে না। বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, খাবার ও চিকিৎসার খরচ—সবকিছুর ওপরই চাপ পড়ে।
সুলতান উদ্দিন আহমেদের মতে, একজন শ্রমিক আয় হারালে তার ওপর নির্ভরশীল পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার সেই শ্রমিক যে বাড়িতে ভাড়া থাকেন, বাড়ির মালিকের আয়েও এর প্রভাব পড়ে। এভাবে একটি পরিবারের সংকট ধীরে ধীরে অন্য পরিবারেও ছড়িয়ে পড়ে।
দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট তাই শুধু শিল্প উৎপাদন বা জ্বালানি সরবরাহের সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শ্রমিকের আয়, কর্মসংস্থান, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।
তাই গ্যাস সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করার পাশাপাশি ইতোমধ্যে আয় হারানো ও কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়া শ্রমিকদের জন্য কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করাও এখন জরুরি।

