বিশেষ বিশ্লেষণ
একটি ব্যবসা ১০০ টাকা নিজের পুঁজি দিয়ে ১০০ টাকার সম্পদ কিনল। আরেকটি ব্যবসা একই ১০০ টাকা নিজের পুঁজি রেখে আরও ১০০ টাকা ধার করে ২০০ টাকার সম্পদে বিনিয়োগ করল। বাজার ভালো থাকলে দ্বিতীয় ব্যবসাটিই বেশি লাভ করতে পারে। কিন্তু বাজার একটু উল্টো দিকে গেলেই একই হিসাব বদলে যায়। এখানেই লিভারেজের আসল গল্প; এটি লাভকে শুধু বড় করে না, ভুল সিদ্ধান্তের ক্ষতিকেও বড় করে।
ধার করা টাকা কখন শক্তি, কখন বোঝা?
সহজ ভাষায়, লিভারেজ হলো নিজের পুঁজির সঙ্গে ধার করা অর্থ ব্যবহার করে বড় পরিসরে বিনিয়োগ বা ব্যবসা করা। কোম্পানি ঋণ নিয়ে কারখানা বাড়াতে পারে, ব্যাংক আমানত নিয়ে ঋণ দিতে পারে, আবার বিনিয়োগকারী ব্রোকারের কাছ থেকে টাকা ধার করে শেয়ার কিনতে পারেন। উদ্দেশ্য একটাই, নিজের পুঁজির চেয়ে বড় অঙ্কের সম্পদ বা বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণ করা। অর্থনীতির ভাষায় এটি খারাপ কোনো বিষয় নয়। বরং ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ঋণ বহু প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক অর্থায়ন পদ্ধতি। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন ধার করা টাকার পরিমাণ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে সামান্য আয় কমে গেলেও সুদ ও অন্যান্য দায় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে।
একটি সহজ উদাহরণ ধরা যাক। একটি কোম্পানির নিজের পুঁজি ১০০ কোটি টাকা। সে আরও ১০০ কোটি টাকা ৬ শতাংশ সুদে ধার করে মোট ২০০ কোটি টাকা ব্যবসায় লাগাল। ওই ২০০ কোটি টাকা থেকে যদি বছরে ১০ শতাংশ হারে আয় তৈরি হয়, তাহলে আয় দাঁড়াবে ২০ কোটি টাকা। সুদ দিতে হবে ৬ কোটি টাকা। সরল হিসাবে সুদ বাদে থাকবে ১৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ নিজের ১০০ কোটি টাকার ওপর রিটার্ন ১৪ শতাংশ। ঋণ না নিলে এবং একই ১০ শতাংশ সম্পদ-রিটার্ন ধরে নিজের ১০০ কোটি টাকা দিয়েই ব্যবসা করলে রিটার্ন হতো ১০ কোটি টাকা, অর্থাৎ ১০ শতাংশ। ধার করা টাকা এখানে শেয়ারহোল্ডারের রিটার্ন বাড়িয়েছে।
কিন্তু গল্পের দ্বিতীয় অংশটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ধরুন, ব্যবসার রিটার্ন ১০ শতাংশ না হয়ে ৩ শতাংশে নেমে গেল। ২০০ কোটি টাকার ওপর আয় হবে মাত্র ৬ কোটি টাকা। অথচ সুদ দিতে হবে সেই ৬ কোটি টাকাই। কর, অবচয় বা অন্য খরচ ধরার আগেই মালিকের জন্য লাভ প্রায় শূন্য। আর ব্যবসার আয় যদি সুদের খরচের নিচে নেমে যায়, তখন ঋণ আর ‘গ্রোথের হাতিয়ার’ থাকে না; সেটিই হয়ে যায় চাপের প্রধান উৎস। অর্থাৎ লিভারেজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসাব হলো শুধু কত টাকা ধার করা হয়েছে তা নয়, বরং ধার করা টাকার বিপরীতে সেই অর্থ কতটা আয় তৈরি করছে।
লাভের হিসাবের আড়ালে যে ঝুঁকিটা লুকিয়ে থাকে
এখানে একটি বিষয় অনেক সময় চোখ এড়িয়ে যায়। ঋণের সুদ সাধারণত চুক্তিভিত্তিক দায়। কিন্তু ব্যবসার আয় চুক্তিভিত্তিক নয়। বিক্রি কমতে পারে, পণ্যের দাম পড়ে যেতে পারে, সুদের হার বাড়তে পারে, ডলারের বিনিময় হার বদলাতে পারে কিংবা কোনো বড় প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত নগদপ্রবাহ নাও আসতে পারে। অর্থাৎ আয় কমার ঝুঁকি পরিবর্তনশীল, কিন্তু ঋণের দায় অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট। এই দুইয়ের ব্যবধান যত বাড়ে, লিভারেজের ঝুঁকিও তত বাড়ে।
এই কারণেই কোনো কোম্পানিকে শুধু তার মুনাফা দেখে শক্তিশালী মনে করা ভুল হতে পারে। একই ২০ কোটি টাকা লাভ করা দুটি কোম্পানির ঝুঁকি এক নাও হতে পারে। একটি হয়তো ২০০ কোটি টাকা নিজের পুঁজি দিয়ে ২০ শতাংশ আয় করেছে, অন্যটি ৫০ কোটি টাকা নিজের পুঁজি এবং ১৫০ কোটি টাকা ধার করে শতাংশ আয় করেছে। দ্বিতীয় কোম্পানির সম্পদের ওপর রিটার্ন একই রকম মনে হলেও শেয়ারহোল্ডারের ওপর ঋণের চাপ অনেক বেশি। ফলে বিনিয়োগ বিশ্লেষণে লাভের অঙ্কের পাশাপাশি ঋণ, সুদের খরচ, নগদপ্রবাহ এবং নিজের পুঁজির পরিমাণ একসঙ্গে দেখা জরুরি।
আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অতিরিক্ত লিভারেজ নিয়ে এত সতর্কতার কারণও এখানেই। ব্যাসেল থ্রি কাঠামোয় ব্যাংকের জন্য লিভারেজ রেশিওকে একটি আলাদা ‘ব্যাকস্টপ’ হিসেবে রাখা হয়েছে, যাতে ঝুঁকি-ভিত্তিক মূলধন অনুপাত ভালো দেখালেও অতিরিক্ত ঋণ ও এক্সপোজার জমে না যায়। ব্যাসেল কাঠামোর ন্যূনতম লিভারেজ রেশিও ৩ শতাংশ, যার অর্থ সরলভাবে বললে টিয়ার ওয়ান ক্যাপিটাল এর তুলনায় ব্যাংকের মোট এক্সপোজার কতটা বড় হয়ে উঠছে, সেটিও আলাদাভাবে নজরে রাখা হয়।
শেয়ারবাজারে লিভারেজের ধাক্কা আরও দ্রুত আসে
শেয়ারবাজারে লিভারেজের সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ হলো মার্জিন ঋণ। নিজের ১০ লাখ টাকা দিয়ে ১০ লাখ টাকার শেয়ার কেনার বদলে যদি বিনিয়োগকারী আরও ১০ লাখ টাকা ধার করেন, তাহলে তিনি ২০ লাখ টাকার শেয়ার নিয়ন্ত্রণ করছেন। শেয়ারের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে মোট বিনিয়োগের মূল্য ২ লাখ টাকা বাড়ে। ঋণের সুদ বাদ দেওয়ার আগে নিজের ১০ লাখ টাকার ওপর লাভের হার দাঁড়ায় ২০ শতাংশ। এখানেই লিভারেজের আকর্ষণ।
কিন্তু শেয়ারের দাম ১০ শতাংশ কমলে একই ২ লাখ টাকা ক্ষতি হবে। অর্থাৎ নিজের ১০ লাখ টাকার ওপর ক্ষতির হারও প্রায় ২০ শতাংশ হয়ে যাবে, সুদ ধরার আগেই। বাজার আরও নিচে নামলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। মার্জিনের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীকে অতিরিক্ত অর্থ বা জামানত দিতে হতে পারে, আবার নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ব্রোকার জামানত হিসেবে থাকা শেয়ার বিক্রি করে ঋণ সমন্বয় করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনও মার্জিন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকিগুলো স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছে।
বাংলাদেশেও মার্জিন অর্থায়ন নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর বাইরে নয়। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের বর্তমান আইন ও বিধিমালার তালিকায় ২০২৫ সালের মার্জিন বিধিমালা এবং ২০২৬ সালের সংশোধনের তথ্য রয়েছে। অর্থাৎ বাজারে ধার করে বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও সেটি সীমাহীনভাবে নেওয়ার বিষয় নয়; নিয়ন্ত্রক কাঠামোর উদ্দেশ্যই হলো বিনিয়োগকারীর অতিরিক্ত ঝুঁকি এবং বাজারের অস্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণ করা।
আসল প্রশ্ন ‘ঋণ কত’ নয়, ‘ঋণ সামলানোর ক্ষমতা কত’
লিভারেজ বিচার করার সময় সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো শুধু ঋণ-ইকুইটির অনুপাত দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া। কারণ একই মাত্রার ঋণ এক ব্যবসার জন্য সহনীয় হতে পারে, অন্য ব্যবসার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। যেই কোম্পানির আয় নিয়মিত এবং নগদপ্রবাহ শক্তিশালী, তার নির্দিষ্ট পরিমাণ ঋণ সামলানোর ক্ষমতা হয়তো বেশি। বিপরীতে আয় অনিয়মিত এমন কোম্পানি একই পরিমাণ ঋণ নিলে ঝুঁকি অনেক বেশি। তাই লিভারেজের সঙ্গে সুদ পরিশোধের সক্ষমতা, নগদপ্রবাহ, ঋণের মেয়াদ, সুদের হার এবং সম্পদের প্রকৃতি সবকিছু একসঙ্গে দেখা দরকার।
এখানেই আমার কাছে লিভারেজ বিশ্লেষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি হলো ‘বাফার’। ব্যবসা যখন ভালো করছে, তখন ঋণ নেওয়া সহজ মনে হয়। কিন্তু একজন বিচক্ষণ বিনিয়োগকারী বরং জানতে চাইবেন; ব্যবসা ১০ শতাংশ খারাপ করলে কী হবে? সুদের হার বাড়লে কী হবে? বিক্রি ছয় মাস কমে গেলে কী হবে? সম্পদের দাম পড়ে গেলে ব্যাংক বা ঋণদাতা কী পদক্ষেপ নিতে পারে? কারণ লিভারেজের ঝুঁকি ভালো সময়ের হিসাব দিয়ে বোঝা যায় না; খারাপ সময়ের পরিস্থিতি ধরে হিসাব করলেই আসল চিত্র বেরিয়ে আসে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সাম্প্রতিক চিত্রও এই বিষয়টির গুরুত্ব বোঝায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে ব্যাংকিং খাতে মূলধন সক্ষমতার বড় অবনতির কথা উঠে এসেছে; প্রতিবেদনে খাতটির সি-আর-এ-আর ২০২৪ সালের ৩.০৮ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ঋণাত্মক ২.৬৪ শতাংশে নেমে যাওয়ার এবং লিভারেজ রেশিওতেও বড় দুর্বলতার কথা বলা হয়েছে। এটি শুধু একটি অনুপাতের গল্প নয়; মূলধনের তুলনায় ঝুঁকিপূর্ণ এক্সপোজার কতটা বেড়েছে এবং ক্ষতি হলে সেই ক্ষতি শোষণ করার সক্ষমতা কতটা আছে, সেটিই এখানে বড় প্রশ্ন।
লিভারেজের ভালো দিকও আছে
তবে লিভারেজ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আরেকটি ভুল করা যাবে না। ঋণ মানেই খারাপ, এমন ধারণাও অর্থনৈতিকভাবে ঠিক নয়। একটি ভালো ব্যবসা যদি ৮ শতাংশ খরচে ঋণ নিয়ে এমন প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে পারে, যেখান থেকে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি সমন্বয় করে তার চেয়ে বেশি রিটার্ন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে ঋণ শেয়ারহোল্ডারের মূল্য বাড়াতে পারে। উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানো, নতুন কারখানা করা বা লাভজনক প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও ধার করা অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সমস্যা হলো, ভালো সময়ের রিটার্নকে অনেক সময় স্থায়ী ধরে নেওয়া হয়। তখন ঋণ বাড়ে, সম্পদের দাম বাড়ে, মুনাফা বাড়ে এবং সবাই মনে করে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু সম্পদের দাম পড়তে শুরু করলে একই লিভারেজ উল্টো দিকে কাজ করে। আন্তর্জাতিক আর্থিক সংকটের অভিজ্ঞতা থেকেই ব্যাসেল কমিটি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অতিরিক্ত লিভারেজ জমা হওয়াকে আলাদা ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করেছে; কারণ সংকটের সময় একসঙ্গে ঋণ কমানোর চেষ্টা সম্পদের দাম ও ঋণপ্রবাহের ওপর আরও চাপ তৈরি করতে পারে।
তাই একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে কোনো কোম্পানি, ব্যাংক বা বিনিয়োগের সুযোগ দেখলে শুধু ‘লাভ কত’ প্রশ্ন করলেই হবে না। বরং আরও কয়েকটি বিষয় বুজতে হবে; এই লাভ করতে কত টাকা ধার করতে হয়েছে, ঋণের সুদ কত, ব্যবসার নগদপ্রবাহ কি সেই সুদ ও মূলধন পরিশোধের জন্য যথেষ্ট, সম্পদের দাম কমলে কী হবে, আয় কমে গেলে প্রতিষ্ঠানটির হাতে কতটা নিরাপত্তা-বাফার থাকবে; এইগুলো সবই বিবেচনায় নিতে হবে।
লিভারেজ আসলে অনেকটা মাইক্রোফোনের মতো। ভালো কণ্ঠকে এটি আরও জোরালো করে, আবার ভুল সুরকেও অনেক বেশি স্পষ্ট করে তোলে। তাই লিভারেজ নিজে লাভ বা ক্ষতির কারণ নয়; এটি ব্যবসার ফলাফলকে বড় করে দেখায়। সেই কারণে কোনো প্রতিষ্ঠান কতটা ঋণ নিয়েছে, সেটি একা দেখে ভয় পাওয়ার যেমন কারণ নেই, তেমনি ঋণ নিয়ে দ্রুত মুনাফা করছে দেখে উচ্ছ্বসিত হওয়ারও কারণ নেই। আসল হিসাবটা করতে হবে ঋণের খরচ, সম্পদ থেকে আয়, নগদপ্রবাহ এবং খারাপ সময়ে ক্ষতি সামলানোর সক্ষমতা – এই চারটি একসঙ্গে রেখে। কারণ ভালো সময়ে লিভারেজ আপনাকে বড় দেখাতে পারে, কিন্তু খারাপ সময়ে সেটিই বলে দেবে আপনি আসলে কতটা শক্তিশালী।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

