পুঁজিবাজারে অর্থ আত্মসাতের শিকার হওয়া পাঁচটি ব্রোকারেজ হাউসের ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের জন্য অবশেষে সুখবর এসেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর (সোমবার) থেকে এসব বিনিয়োগকারীদের পাওনা টাকা ফেরত দেওয়া শুরু করবে। ইনভেস্টরস প্রোটেকশন ফান্ড (আইপিএফ) থেকে এই অর্থ পরিশোধ করা হবে। ডিএসই চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম গত মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর নিকুঞ্জে ডিএসই টাওয়ারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার এবং আইপিএফের চেয়ারপারসন নাসরিন বেগম। ডিএসই চেয়ারম্যান এই উদ্যোগকে পুঁজিবাজারের জন্য ‘একটি মাইলফলক’ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা হলেন মশিউর সিকিউরিটিজ, তামহা সিকিউরিটিজ, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ, বাঙ্কো সিকিউরিটিজ এবং শাহ মোহাম্মদ সগীর অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের গ্রাহক। এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠান ২০২০ সাল থেকে কয়েক বছরে বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রি করে অর্থ হাতিয়ে নেয়। ২০২১ সালের নভেম্বরে তামহা সিকিউরিটিজের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় ডিএসই। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, এই পাঁচটি ব্রোকারেজ হাউসের মাধ্যমে বিনিয়োগ করে মোট ১৭ হাজার ৯২৫ জন বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের যাচাইকৃত দাবির পরিমাণ প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৭ হাজার ৩৩২ জন বিনিয়োগকারী, অর্থাৎ প্রায় ৯৭ শতাংশ, তাদের বিনিয়োগের পুরো টাকা ফেরত পাবেন।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেক বিনিয়োগকারী সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের অর্থ আইপিএফ থেকে ফেরত পাবেন। এই প্রক্রিয়ায় মোট ৭২ কোটি টাকা বিতরণ করা হবে। এর আগে সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউস ও আইপিএফের যৌথ উদ্যোগে ৩৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে। নতুন এই উদ্যোগের ফলে ১৭ হাজার ৩৩২ জন বিনিয়োগকারীর পাওনা সম্পূর্ণরূপে পরিশোধিত হবে। ডিএসই চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, পুরো অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া শেষ করতে সর্বোচ্চ দুই মাস সময় লাগতে পারে। প্রথম পর্যায়ে মশিউর সিকিউরিটিজের যাচাইকৃত বিনিয়োগকারীদের টাকা ২৮ সেপ্টেম্বর দেওয়া হবে। অন্য চারটি প্রতিষ্ঠানের যাচাইকৃত বিনিয়োগকারীদের পাওনা টাকা পরে ঘোষিত সময় অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে দেওয়া হবে।
৫ লাখ টাকার বেশি পাওনা থাকা ৫৯৩ জন বড় বিনিয়োগকারীর অবশিষ্ট পাওনা উদ্ধারে খেলাপি ব্রোকারেজ হাউসগুলোর শেয়ার, সম্পত্তি ও পরিচালকদের ব্যক্তিগত সম্পদ বিক্রির আইনি পদক্ষেপ চলমান রয়েছে। ডিএসই চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, দরকার হলে আইপিএফে জমা হওয়া ভবিষ্যৎ অর্থ থেকেও এই ৫৯৩ জন বিনিয়োগকারীর পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এই ব্রোকারেজ হাউসগুলোর বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান। চারটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা হয়েছে এবং একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা চলমান। ইতোমধ্যে দুদক দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছে।
এই উদ্যোগকে শুধু আইনি দায়িত্ব পালন নয়, বরং নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব হিসেবে দেখছেন ডিএসই চেয়ারম্যান। কারণ ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, বিচারক, ব্যাংকার এবং বিভিন্ন পেশার মানুষ, যারা তাদের সঞ্চয় ও পেনশনের টাকা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে বিপাকে পড়েছেন। ডিএসই চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘‘এই উদ্যোগ পুঁজিবাজারের প্রতি সাধারণ মানুষের হারানো আস্থা অনেকটাই পুনরুদ্ধার করবে।’’ আইপিএফের চেয়ারপারসন জানিয়েছেন, এই ক্ষতিপূরণ কোনো অনুদান বা দান নয়, বরং এটি আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী একটি নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া। আইপিএফ তহবিলে অর্থ আসে ব্রোকারেজ হাউসগুলোর ট্রেড কমিশন থেকে নির্দিষ্ট হারে এবং ২০২৫ সালের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্রোকারেজ হাউসগুলোর হিসাবে থাকা অর্থের সুদের ২৫ শতাংশ থেকেও।
এই ধরনের জালিয়াতি ভবিষ্যতে রোধে ডিএসই একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। ডিএসই চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, ব্রোকারেজ হাউসগুলোকে বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাতের সুযোগ কমাতে ইতোমধ্যে প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। বিএসইসি ব্রোকারেজ হাউসগুলোর জন্য সনদপ্রাপ্ত এবং সম্পাদনাযোগ্য নয় এমন ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে। ডিএসই চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, গত আড়াই বছরে Consolidated Customer Account (সিসিএ) থেকে অর্থ আত্মসাতের কোনো ঘটনা ঘটেনি। ভবিষ্যতে শেয়ারবাজারকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে ডিএসই ‘রিস্ক-বেজড ক্যাপিটাল সুপারভিশন’ এবং ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে। এছাড়া ডিএসই একটি নতুন ওয়েবসাইট চালু করেছে, যেখানে রিয়েল-টাইম মার্কেট আপডেটসহ তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে। বিনিয়োগকারীরা যাতে সহজেই তথ্য পেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সেই লক্ষ্যে এই উদ্যোগ।

