বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া পাটজাত পণ্যের ওপর প্রতিরক্ষামূলক শুল্ক বা অ্যান্টিডাম্পিং ডিউটির হার নতুন করে নির্ধারণ করেছে ভারত সরকার। এই নতুন কাঠামোয় একটি বিশেষ দিক হলো, প্রতিষ্ঠানভেদে শুল্কের পরিমাণ সম্পূর্ণ আলাদা হবে—একই পণ্য রপ্তানি করলেও প্রতিষ্ঠানের নাম তালিকায় থাকা বা না থাকার ওপর নির্ভর করে শুল্কের বোঝা অনেকটাই বদলে যাবে।
ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়ের রাজস্ব বিভাগ চলতি মাসের ২৪ তারিখে এই সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এতে বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি করা পাটের সুতা, হেসিয়ান কাপড়, পাটের স্যাকিং ব্যাগ এবং স্যাকিং ক্লথের ওপর নতুন শুল্কহার নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন এই ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় পার্থক্য তৈরি হয়েছে তালিকাভুক্ত ও তালিকার বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে। প্রজ্ঞাপনে নির্দিষ্ট করে ৫৫টি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করে তাদের জন্য তুলনামূলক কম শুল্কহার বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই তালিকার বাইরে থাকা অন্য সব প্রতিষ্ঠানের জন্য শুল্কের হার অনেক বেশি—পাটের সুতা বা টুইনে প্রতি টনে সর্বোচ্চ ৪৪৫ ডলার পর্যন্ত শুল্ক গুণতে হতে পারে, হেসিয়ান কাপড়ে ৮৮ ডলার এবং স্যাকিং ব্যাগে ২৮৩ ডলার। ফলে ভারতের বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে তালিকায় নাম থাকাটা বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য এখন অনেকটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে শুধু তালিকায় নাম থাকলেই চলবে না—শুল্কসুবিধা পাওয়ার জন্য একটি শর্তও রাখা হয়েছে। রপ্তানিকারকদের অবশ্যই বৈধ বাণিজ্যিক চালান দেখাতে হবে, যেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানই পণ্যটি উৎপাদন করেছে। এই ঘোষণা না থাকলে ওই রপ্তানিকারককেও তালিকার বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানের মতো উচ্চ শুল্ক দিতে হবে।
তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও শুল্কের হারে বেশ তারতম্য দেখা যায়। কিছু প্রতিষ্ঠান এমনও আছে, যাদের পাটের সুতা ও হেসিয়ান কাপড়ে শুল্ক একেবারে শূন্য রাখা হয়েছে। অন্যদিকে কিছু প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পাটের সুতায় শুল্ক প্রতি টনে ৬০ থেকে ১৪০ ডলারের মধ্যে, আর স্যাকিং ব্যাগে তা ৯০ থেকে ১৫৫ ডলার পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের একটি পণ্যে শুল্ক থাকলেও অন্য পণ্যে তা শূন্য—যেমন একটি প্রতিষ্ঠানের সুতায় শুল্ক থাকলেও স্যাকিং ব্যাগে কোনো শুল্ক নেই। এভাবে প্রতিষ্ঠানভেদে ও পণ্যভেদে শুল্কহারে যথেষ্ট বৈচিত্র্য দেখা যাচ্ছে নতুন এই কাঠামোয়।
এ বিষয়ে দেশের পাটসুতা রপ্তানিকারকদের একটি সংগঠনের শীর্ষ কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন, এই সিদ্ধান্তের বাস্তবিক গুরুত্ব খুব বেশি নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আগে যারা সুবিধাভোগী তালিকায় ছিল তাদের অনেকেই এখন বাদ পড়েছে, আবার নতুন করে কেউ কেউ তালিকায় যুক্ত হয়েছে—এই পরিবর্তনের কারণ বা পদ্ধতি স্পষ্ট নয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই খাতে আগে সরকারি ভর্তুকি দেওয়া হলেও এখন তা বন্ধ, ফলে এখনো এই শুল্ক আরোপের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে।
এই নতুন শুল্কহার আসার পেছনে রয়েছে একটি দীর্ঘ পর্যালোচনা প্রক্রিয়া। ভারতের বাণিজ্য প্রতিকারবিষয়ক মহাপরিদপ্তর গত বছরের জুন মাসে বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি করা পাটপণ্যের অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক নিয়ে একটি মধ্যবর্তী পর্যালোচনা শুরু করে। প্রায় এক বছর পর, চলতি বছরের জুন মাসে সেই পর্যালোচনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসে, যেখানে বিভিন্ন পাটপণ্যের শুল্কহার নতুনভাবে নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়। সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে অর্থ মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করে।
প্রজ্ঞাপনে একটি বিশেষ বিধানও যুক্ত করা হয়েছে জুট স্যাকিং ক্লথের ক্ষেত্রে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা জুট স্যাকিং ব্যাগের জন্য নির্ধারিত শুল্কহার স্যাকিং ক্লথের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। তবে এই নিয়মের একটি ব্যতিক্রমও রাখা হয়েছে—নির্দিষ্ট দশটি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত স্যাকিং ক্লথকে এই শুল্কের আওতা থেকে সম্পূর্ণ বাদ রাখা হয়েছে।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, ভারতের নতুন এই শুল্ক কাঠামো বাংলাদেশের পাটশিল্পের জন্য একটি জটিল বাস্তবতা তৈরি করেছে—কিছু প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক সুবিধা পাচ্ছে, আবার অনেকে পড়ছে বাড়তি শুল্কের চাপে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিবর্তনের প্রকৃত প্রভাব বোঝা যাবে আগামী কয়েক মাসের রপ্তানি পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলেই।

