দীর্ঘ ১২ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো চূড়ান্ত করেছে সরকার, যার ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বছরে অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় এক লাখ পাঁচ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি, চড়া মূল্যস্ফীতি এবং সীমিত অর্থনৈতিক সামর্থ্যের মধ্যেও এই বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পেনশন বৃদ্ধি, ‘এক পদ এক পেনশন’ নীতি বাস্তবায়ন এবং বিভিন্ন ভাতার সংযোজনও।
গত সোমবার অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুমোদিত হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা অনুযায়ী, নতুন বেতনকাঠামো ও পেনশন সুবিধা—দুটিই কার্যকর ধরা হয়েছে গত ১ জুলাই থেকে। বৈঠক শেষে সন্ধ্যায় তথ্য অধিদপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তুলে ধরেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। তিনি জানান, চলতি সপ্তাহেই এ-সংক্রান্ত একাধিক প্রজ্ঞাপন জারি হবে এবং আইনি পর্যালোচনা শেষে কিছু বিষয় সংবিধিবদ্ধ নিয়ন্ত্রক আদেশ আকারেও প্রকাশ করা হবে। তার ভাষ্যে, সাধারণত পাঁচ বছর অন্তর বেতন কাঠামোয় পরিবর্তন আসার কথা থাকলেও এবার তা হতে সময় লেগেছে ১২ বছর। জীবনযাত্রার ব্যয় এবং বাজারে সম্ভাব্য প্রভাব—উভয় দিক বিবেচনায় নিয়েই এই সমন্বয় করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
নতুন স্কেলেও আগের মতো ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। তবে সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন সাড়ে আট হাজার টাকার কাছাকাছি অঙ্ক থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে, আর সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকায়। হিসাব করলে দেখা যায়, সর্বনিম্ন গ্রেডে বৃদ্ধির হার প্রায় ১৪২ শতাংশ, যেখানে সর্বোচ্চ গ্রেডে তা ১০০ শতাংশ। অর্থাৎ শতাংশের হিসাবে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছেন নিচের সারির কর্মীরাই।
সরকার একই সঙ্গে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের মধ্যকার ব্যবধানও কমিয়ে আনার চেষ্টা করেছে। আগে এই অনুপাত ছিল প্রায় ১:১.৯৪৫, নতুন কাঠামোয় তা নামিয়ে আনা হয়েছে ১:১.৭৮-এ। দশম থেকে বিশতম গ্রেডের কর্মীদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে, যার মূল লক্ষ্য বেতন কাঠামোয় বৈষম্য কমিয়ে আনা।
গ্রেডভিত্তিক পরিবর্তন খতিয়ে দেখলে দেখা যায়, নিচের দিকের গ্রেডগুলোতেই শতাংশের হিসাবে সবচেয়ে বড় লাফ পড়েছে। যেমন ১৪ থেকে ১৯তম গ্রেড পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির হার ১৩০ থেকে ১৪১ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, আর একেবারে সর্বনিম্ন গ্রেডে তা ছাড়িয়ে গেছে ১৪২ শতাংশ। বিপরীতে উপরের সারির গ্রেডগুলোতে বৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম, মোটামুটি ১০০ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থাৎ টাকার অঙ্কে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বেতন দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও শতাংশের বিচারে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হচ্ছেন নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরাই।
যদিও নতুন কাঠামো কাগজে-কলমে গত ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে, বাস্তবে পুরো সুবিধা একবারে মিলবে না। সরকারের আর্থিক সামর্থ্য এবং মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য চাপের কথা মাথায় রেখে ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮—এই দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়িত হবে। সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, মূল বেতন আগামী ২০২৭ সালের জুলাই পর্যন্ত তিন ধাপে দেওয়া হবে, আর বিভিন্ন ভাতা একযোগে কার্যকর হবে ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে।
শুধু কর্মরত কর্মচারীরাই নন, সুবিধা পাচ্ছেন অবসরভোগীরাও। যাদের মাসিক নিট পেনশন তুলনামূলক কম, তাদের জন্য স্ল্যাবভিত্তিক বৃদ্ধির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মাসে ৯ হাজার টাকা বা তার কম পেনশনপ্রাপ্তদের পেনশন বাড়বে পুরো ১০০ শতাংশ। এরপর আয়ের স্তর যত বাড়বে, বৃদ্ধির হার তত কমতে থাকবে—২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয়ের ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ, ৩০ হাজার পর্যন্ত ৬৫ শতাংশ, ৪০ হাজার পর্যন্ত ৬০ শতাংশ এবং তার বেশি আয়ের পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার দাঁড়াবে ৫৫ শতাংশ। এই বিন্যাস থেকে স্পষ্ট, দীর্ঘদিন আগে অবসরে যাওয়া এবং তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া মানুষরাই এবার সবচেয়ে বেশি স্বস্তি পেতে চলেছেন।
সাবেক অর্থ উপদেষ্টা পর্যায়ের একজন বিশ্লেষক এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এই বেতন কাঠামো আরও আগে হওয়া উচিত ছিল। তবে তার আশঙ্কা, এর প্রভাবে বেসরকারি খাতেও একধরনের বেতন-বৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে। তার পরামর্শ, মূল্যস্ফীতির বাস্তবতা মাথায় রেখে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এমনকি সংবাদমাধ্যম খাতেও অনুরূপ বেতন সমন্বয় হওয়া দরকার। পাশাপাশি সরকারি প্রশাসনে অপ্রয়োজনীয় জনবল কমিয়ে আনা গেলে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের এই চাপ কিছুটা প্রশমিত হতে পারে বলেও তিনি মত দেন।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের ধারণা, এই বেতন কাঠামো একদিকে যেমন সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানে স্বস্তি আনবে, তেমনি রাষ্ট্রীয় ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নে আগামী দুই অর্থবছর সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষাও বটে। বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া কতটা মসৃণভাবে এগোয় এবং তা বাজারে কী প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের বিষয়।

