বিশেষ বিশ্লেষণ
দীর্ঘ এগারো বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে গত সোমবার, ৩১ আগস্ট, মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিয়েছে নবম জাতীয় বেতন স্কেলের। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অনুমোদিত এই বেতনকাঠামোয় সবচেয়ে নিচের গ্রেডের কর্মচারীর মূল বেতন বাড়ছে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ, আর সবচেয়ে ওপরের গ্রেডে বাড়ছে ১০০ শতাংশ। খবরটা শুনতে যত সহজ, এর পেছনের হিসাবটা ততটাই জটিল। কারণ এই বেতন বৃদ্ধির টাকা আসবে কোথা থেকে, তা নিয়ে খোদ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলই (আইএমএফ) প্রশ্ন তুলেছিল ঋণ কর্মসূচির শর্ত হিসেবে। প্রায় সোয়া চৌদ্দ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন একসঙ্গে এতটা বাড়লে সেই টাকা বাজারে ঢুকবে, আর বাজারে হুট করে বাড়তি টাকা ঢুকলে তার আঁচ লাগে সবার গায়েই, শুধু যাদের বেতন বাড়ল তাদের নয়। তাই প্রশ্নটা শুধু “সরকারি কর্মচারীদের সুখবর” দিয়ে শেষ হয় না, বরং শুরু হয় সেখান থেকেই।
এক বিকেলের সিদ্ধান্ত, যার প্রস্তুতি চলেছে বছরজুড়ে
নতুন এই বেতন কাঠামোয় বিদ্যমান বিশটি গ্রেডই বহাল রাখা হয়েছে, শুধু মূল বেতনের অঙ্কগুলো নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে। কার্যকর হবে গত ১ জুলাই থেকে, অর্থাৎ পেছনের তারিখ থেকেই ধরা হবে হিসাব। তবে পুরো বেতনকাঠামো একবারে কার্যকর হচ্ছে না। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ও মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে চলতি ২০২৬-২৭ এবং আগামী ২০২৭-২৮ এই দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়ন করা হবে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো, স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে দশম গ্রেড ও তার নিচের কর্মীদের আগে সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তি স্পষ্ট; গত এক দশকে যাদের প্রকৃত আয় মূল্যস্ফীতির চাপে সবচেয়ে বেশি কমেছে, তাদেরকেই আগে স্বস্তি দেওয়া। বাংলাদেশে সর্বশেষ অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে, তারপর প্রতি বছর নির্ধারিত হারে ইনক্রিমেন্ট মিললেও, নতুন কোনো বেতন কাঠামো আসেনি এতদিন।
কার পকেটে সবচেয়ে বেশি টাকা ঢুকবে
শতাংশের হিসাবে তাকালে মনে হবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছেন সবচেয়ে কম বেতনের কর্মীরাই। বিশতম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন আট হাজার আড়াইশ টাকা থেকে বেড়ে হচ্ছে বিশ হাজার টাকা, অর্থাৎ বৃদ্ধি ১৪২ শতাংশ। অন্যদিকে সর্বোচ্চ গ্রেডের, অর্থাৎ সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তার বেতন আটাত্তর হাজার টাকা থেকে বেড়ে হচ্ছে এক লাখ ছাপ্পান্ন হাজার টাকা, বৃদ্ধি ঠিক ১০০ শতাংশ। প্রথম থেকে একাদশ গ্রেড পর্যন্ত বেতন বাড়ছে সমান হারে, দ্বিগুণ। বারো থেকে বিশ নম্বর গ্রেডে বৃদ্ধির হার তার চেয়েও বেশি, সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। কিন্তু আসল হিসাবটা লুকিয়ে আছে টাকার অঙ্কে। বিশতম গ্রেডের একজন কর্মচারীর মাসিক আয় বাড়ছে এগারো হাজার সাতশ পঞ্চাশ টাকা, আর প্রথম গ্রেডের কর্মকর্তার আয় বাড়ছে আটাত্তর হাজার টাকা অর্থাৎ শতাংশের হিসাবে কম হলেও, টাকার অঙ্কে একজন সচিবের বাড়তি আয় একজন পিয়নের চেয়ে প্রায় সাত গুণ বেশি। সরকারি হিসাব বলছে, বর্তমানে কর্মরত প্রায় সাড়ে চৌদ্দ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর মধ্যে প্রায় বারো লাখ ষাট হাজার জনই দশম থেকে বিশতম গ্রেডে, অর্থাৎ সংখ্যার বিচারে এই বেতন বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী নিচের সারির কর্মীরাই। তবে টাকার প্রবাহের বিচারে ওপরের গ্রেডের অল্প কিছু কর্মকর্তার হাতে যে অঙ্ক যাচ্ছে, তা মোট ব্যয়ের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে নেবে। পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রয়োগ হয়েছে, মাসে বিশ হাজার টাকার কম পেনশন পাওয়া মানুষদের পেনশন বাড়ছে প্রায় ১০০ শতাংশ, বিশ থেকে চল্লিশ হাজারের মধ্যে থাকাদের ৭৫ শতাংশ, আর চল্লিশ হাজারের বেশি পেনশনভোগীদের ৫৫ শতাংশ।
টাকাটা আসছে কোথা থেকে
এবার আসা যাক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে। জাতীয় বেতন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, এই কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে সরকারের বাড়তি ব্যয় হবে প্রায় এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা, যাতে বেতন-ভাতা খাতে মোট ব্যয় বর্তমান চুরাশি হাজার একশ চৌদ্দ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় এক লাখ নব্বই হাজার কোটি টাকায়। মজার বিষয় হলো, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের নয় লাখ আটত্রিশ হাজার কোটি টাকার বাজেটে এই বাড়তি ব্যয়ের জন্য আলাদা কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। অর্থাৎ এই টাকা আসবে হয় রাজস্ব আদায় বাড়িয়ে, নয়তো ঋণ করে। আর রাজস্ব আদায়ের চিত্রটা এই মুহূর্তে মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়, বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় সাতাশি হাজার পাঁচশ কোটি টাকা কম আদায় করেছে, যদিও প্রবৃদ্ধি হয়েছে বারো শতাংশের মতো। চলতি অর্থবছরে আবার এনবিআরকে ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে, যা অর্জন করতে হলে পঁয়তাল্লিশ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি লাগবে। বাস্তবে যা অর্জিত হওয়ার নজির সাম্প্রতিক সময়ে নেই। এই বাস্তবতায় বাড়তি এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকার স্থায়ী ব্যয়ের একটা বড় অংশ শেষ পর্যন্ত মেটাতে হতে পারে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অথবা ভবিষ্যতে নতুন কর আরোপ করে। এখানেই “আপনার করের টাকায় বেতন বাড়ছে” কথাটার আসল মানে। কর দেন সবাই, ভ্যাট দেন সবাই বাজার করতে গিয়ে, কিন্তু সরাসরি বেতনটা বাড়ছে শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের। বাকি জনগণের জন্য এই সিদ্ধান্তের ফল আসবে ঘুরপথে, কর বাড়লে বা ঋণনির্ভরতা বাড়লে তার দায়ও শেষমেশ বহন করতে হয় সাধারণ করদাতাকেই।
বাজারে টাকা ঢুকলে চাপ পড়বে আগে কোথায়
অর্থনীতির একটা সহজ ও বহুল প্রমাণিত সূত্র আছে। কোনো অর্থনীতিতে উৎপাদন বা জোগান একই রেখে হঠাৎ চাহিদা বা টাকার প্রবাহ বাড়িয়ে দিলে, তার প্রথম প্রভাব পড়ে দামের ওপর। একে বলা হয় চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতি, অর্থনীতির একেবারে প্রাথমিক ও সর্বজনস্বীকৃত একটি নীতি। আইএমএফ নিজেই এই আশঙ্কার কথা সরাসরি জানিয়েছে, নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে বাজারে একলাফে বিপুল অর্থপ্রবাহ ঘটবে, যা মানুষের ভোগব্যয় বাড়িয়ে ইতিমধ্যে চড়া মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। এখানে আরেকটি অর্থনৈতিক নীতি কাজ করে, যাকে বলে প্রান্তিক ভোগপ্রবণতা অর্থাৎ কম আয়ের মানুষ বাড়তি আয়ের তুলনামূলক বড় অংশ সঞ্চয় না করে সঙ্গে সঙ্গে খরচ করে ফেলেন, বিশেষত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসে। যেহেতু এই বেতন বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় অংশ যাচ্ছে বারো লাখেরও বেশি নিচু ও মাঝারি গ্রেডের কর্মীর হাতে, আর তাদের অনেকেই জুলাই থেকে হিসাব করা বকেয়া টাকা একসঙ্গে হাতে পাবেন, তাই এই টাকা বাজারে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই সবচেয়ে আগে চাপ পড়ার কথা বাসাভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের বাজারে। শহরাঞ্চলে বাড়িওয়ালারা সাধারণত সরকারি বেতন বৃদ্ধির খবরে দ্রুত ভাড়া সমন্বয় করেন, আর চাল-ডাল-শাকসবজির মতো নিত্যপণ্যের বাজারেও চাহিদা বাড়লে দাম বাড়তে সময় লাগে না। বর্তমানে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি জুলাইয়ে আট দশমিক বত্রিশ শতাংশে নেমে আট মাসের সর্বনিম্নে পৌঁছেছিল, খাদ্য মূল্যস্ফীতি নেমেছিল সাত দশমিক ষোলো শতাংশে। এই নিম্নমুখী ধারাটা কতটা টিকবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে বাড়তি বেতনের টাকা বাজারে ঢোকার গতি ও পরিমাণের ওপর।
২০১৫ সালের শিক্ষা এবং আজকের বাস্তবতা
এই আশঙ্কা নতুন নয়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা খাতে বরাদ্দ ছিল আটাশ হাজার সাতশ নয় কোটি টাকা। অষ্টম পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার পরের বছরই সেই বরাদ্দ একলাফে বেড়ে দাঁড়ায় পঞ্চাশ হাজার সাতশ পঁচাত্তর কোটি টাকায়। এবারের বৃদ্ধি তার চেয়েও অনেক বড় পরিসরের। মোট বেতন-ভাতা খাত প্রায় সোয়া দুই গুণ হতে যাচ্ছে। ফারাকটা শুধু অঙ্কের নয়, প্রেক্ষাপটেরও। ২০১৫ সালে যখন অষ্টম পে-স্কেল এসেছিল, তখন মূল্যস্ফীতি ছিল তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে। এবার বেতন বাড়ছে এমন এক সময়ে, যখন মূল্যস্ফীতি এখনো মহামারি-পূর্ব স্বাভাবিক পাঁচ-ছয় শতাংশের অনেক ওপরে, আর রাজস্ব আদায়ও তার লক্ষ্যমাত্রা থেকে বহু দূরে। তাই এবারের সিদ্ধান্তে ঝুঁকিটা তুলনামূলক বেশি, আর সেই ঝুঁকি সামলাতেই সরকার ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পথ বেছে নিয়েছে।
সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বহুদিন ধরেই বলে আসছেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতার সিদ্ধান্ত শুধু তাদের আয়-ব্যয়ের বিষয় নয়, এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে সরকারের রাজস্ব আয়, মূল্যস্ফীতি ও সামগ্রিক বাজেট ব্যবস্থাপনা। সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হানের প্রশ্নটাও প্রাসঙ্গিক, সরকারি কর্মচারীরা কিছুটা স্বস্তি পাবেন ঠিকই, কিন্তু মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট বাকি জনগণের জন্য কী ব্যবস্থা থাকছে। অর্থনীতিবিদ শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকীও একই সুরে বলেছেন, পর্যাপ্ত রাজস্ব সংগ্রহ ছাড়া এত বড় স্থায়ী ব্যয়ের জোগান দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ, আর ঋণ করে বা টাকা ছাপিয়ে এই চাপ সামলানো আরও বিপজ্জনক পথ। সব মিলিয়ে বলা যায়, এগারো বছরের প্রতীক্ষার অবসান নিঃসন্দেহে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বড় স্বস্তি, বিশেষ করে যাদের বেতন এতদিন মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেনি। কিন্তু এই স্বস্তির পুরো হিসাব মেলাতে হলে আগামী কয়েক মাসে চোখ রাখতে হবে বাসাভাড়ার নোটিশ আর কাঁচাবাজারের দামের দিকেই কারণ অর্থনীতির নিয়ম বলছে, বাড়তি টাকা সবার আগে সেখানেই তার চিহ্ন রেখে যায়।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

