যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ও ভিয়েতনামের তুলনায় সামান্য শুল্ক সুবিধা পাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশটির বাজারে বাংলাদেশি পোশাকের কার্যকর শুল্কহার এখন ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ। বিপরীতে চীন ও ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে এ হার যথাক্রমে ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ ও ২৮ দশমিক ১ শতাংশ।
গত ২৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানির বিষয়টি উল্লেখ করে এই শুল্ক আরোপ করা হয়। নতুন শুল্ক যুক্ত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের কার্যকর শুল্কহার দাঁড়িয়েছে ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ।
কার্যকর শুল্ক বলতে কোনো পণ্যের ওপর প্রযোজ্য সব ধরনের মার্কিন আমদানি শুল্ক ও সারচার্জ হিসাব করার পর যে মোট হার দাঁড়ায়, সেটিকে বোঝানো হয়। চীনের ক্ষেত্রে বর্তমান শুল্কহারের মধ্যে ২০২০ সালে আরোপ করা ৭ দশমিক ৫ শতাংশ সারচার্জও রয়েছে।
বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও কম্বোডিয়াও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ কার্যকর শুল্কের মুখোমুখি হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট শুল্কহার রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড) যাচাই করেছে।
সংখ্যার হিসাবে চীন ও ভিয়েতনামের তুলনায় বাংলাদেশের শুল্ক কিছুটা কম হওয়ায় প্রতিযোগিতায় বাড়তি সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে পোশাক খাতের উদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই ব্যবধান খুব বেশি নয়। ফলে শুধু শুল্কের সুবিধা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করা কঠিন হতে পারে।
এর সঙ্গে দেশের চলমান জ্বালানি সংকটও পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিতে বাধা তৈরি করছে। হা-মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান এ কে আজাদ বলেন, কম শুল্ক বাংলাদেশকে সুবিধা দিতে পারে। কিন্তু বর্তমানে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় মার্কিন ক্রেতারা শুল্কের চেয়ে সময়মতো পণ্য সরবরাহের বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কম শুল্কের সুবিধা নিতে হলে সরকারকে দ্রুত জ্বালানি সংকটের সমাধান করতে হবে।
র্যাপিডের চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাকও বাংলাদেশের শুল্ক সুবিধাকে খুব বড় করে দেখছেন না। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি এখনো অনিশ্চিত এবং দেশটির প্রশাসন নিয়মিত হার পরিবর্তন করছে। তার ওপর চীন ও ভিয়েতনামের সঙ্গে বাংলাদেশের শুল্কহারের ব্যবধানও খুব বেশি নয়।
রাজ্জাকের মতে, নতুন করে শুল্ক বাড়ায় শেষ পর্যন্ত মার্কিন ক্রেতারা পোশাকের দাম কমানোর চাপ দিতে পারেন অথবা বাড়তি ১০ শতাংশ শুল্কের একটি অংশ বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের বহন করতে বলতে পারেন।
চীনের আরেকটি সুবিধা হলো, দেশটি ভিয়েতনাম ও মেক্সিকোর মতো সংযোগকারী গন্তব্য ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ব্যবসা চালাতে পারে। বাংলাদেশের এখনো এমন বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
তবে বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান মনে করেন, তুলনামূলক কম শুল্ক বাংলাদেশকে কিছুটা হলেও সুবিধা দেবে। যদিও তিনি স্বীকার করেন, জ্বালানি সংকট দেশের উৎপাদন সক্ষমতায় বড় প্রভাব ফেলছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৪ দশমিক ০১ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ রপ্তানি ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ কম।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, মার্কিন ক্রেতারা শুধু শুল্কহার বিবেচনা করেন না; পণ্য হাতে পেতে তাদের মোট কত খরচ হচ্ছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তাই শুল্কের এই সামান্য সুবিধাকে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতামূলক শক্তিতে পরিণত করতে হলে বাংলাদেশকে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পর্যাপ্ত জ্বালানি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বন্দরের কার্যক্রম আরও দক্ষ করা এবং অন্যান্য খরচ কমানো জরুরি। একই সঙ্গে তুলার বাইরে বিভিন্ন ধরনের পোশাক উৎপাদন বাড়িয়ে পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে।

