জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসরত তরুণদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান পাওয়াটা যেন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, এসব এলাকায় বসবাসকারী তরুণদের ভালো মানের কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা অন্য এলাকার তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ কম। বয়স, লিঙ্গ কিংবা কর্মসংস্থানের ধরনের মতো বিষয়গুলো হিসাবে নেওয়ার পরও এই পার্থক্য পরিসংখ্যানগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রমাণিত হয়েছে।
একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে প্রকাশ করা হয়। “জাস্ট ট্রানজিশন ইন বাংলাদেশ” শীর্ষক এই সমীক্ষায় দেশের নয়টি জেলার ৬২৫ জন তরুণ শ্রমিকের মতামত নেওয়া হয়েছে, যাঁরা মূলত কৃষি, তৈরি পোশাক, নির্মাণ ও পরিবহন খাতে কর্মরত। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় অর্ধেকই কৃষি খাতের, বাকিরা মোটামুটি সমানভাবে বিভক্ত পোশাক ও নির্মাণ-পরিবহন খাতে। উত্তরদাতাদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা প্রায় ৬০ শতাংশ, নারী ৪০ শতাংশের কিছু বেশি।
গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মসূচি পরিচালক অনুষ্ঠানে বলেন, অর্থনৈতিক রূপান্তরের এই সময়ে তরুণরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে থাকলেও দেশকে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির পথে এগিয়ে নিতে তাঁদের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই তরুণদের কেন্দ্র করে তথ্যনির্ভর এই গবেষণা পরিচালনা করা হয়েছে।
গবেষণায় আন্তর্জাতিক শ্রম মান অনুসরণ করে চারটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান যাচাই করা হয়। পরিবহন খাতকে তুলনার ভিত্তি ধরে দেখা যায়, শুধু খাত বিবেচনায় কৃষিতে ভালো কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা ১৫ শতাংশ, নির্মাণে প্রায় ২০ শতাংশ এবং পোশাক খাতে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৭৩ শতাংশ। তবে বয়স, আয় ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মতো অন্যান্য বিষয় যোগ করলে এই ব্যবধান বেশ খানিকটা কমে আসে— কৃষিতে নেমে দাঁড়ায় প্রায় ৮ শতাংশে, নির্মাণে ১০ শতাংশের সামান্য বেশি, আর পোশাক খাতে সাড়ে পঞ্চান্ন শতাংশে। এর অর্থ, পোশাক খাত অন্য খাতের তুলনায় এগিয়ে থাকলেও সেই এগিয়ে থাকাটা পুরোপুরি ভালো কর্মপরিবেশের কারণে নয়— বরং লিখিত নিয়োগচুক্তি ও তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ কাজের ধরনই এখানে বড় ভূমিকা রাখছে।
তরুণদের কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তার আরেকটি বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে অনানুষ্ঠানিক কাজের প্রাধান্য। জরিপ অনুযায়ী, ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী শ্রমিকদের মধ্যে প্রায় সাতাশ শতাংশই প্রাথমিক পর্যায়ের অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত, যাঁদের না আছে লিখিত চাকরির নিশ্চয়তা, না আছে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সুরক্ষা। এর বিপরীতে সামগ্রিক কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাত্র দেড় শতাংশের মতো মানুষ আনুষ্ঠানিক কারিগরি প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন। ফলে হঠাৎ চাকরি হারালে বা কর্মক্ষেত্রে বড় কোনো পরিবর্তন এলে নতুন কাজের জন্য প্রস্তুত হওয়ার সক্ষমতাও তরুণদের মধ্যে সীমিত থেকে যাচ্ছে।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে তরুণদের অগ্রাধিকারের চিত্র। অনুদান বা ব্যবসা শুরুর মূলধনের চেয়ে তাঁরা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন নগদ সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং চাকরি খুঁজে পেতে সরাসরি সহযোগিতাকে। তবে খাতভেদে এই চাহিদায়ও রয়েছে ভিন্নতা— নির্মাণ খাতের তরুণদের কাছে নগদ সহায়তাই সবচেয়ে জরুরি, পোশাক ও পরিবহন খাতের তরুণরা চাকরির সন্ধানে সহায়তাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন, আর কৃষি খাতের তরুণরা নগদ সহায়তা ও প্রশিক্ষণ— দুটিকেই সমান গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন।
কার ওপর তরুণরা বেশি ভরসা করেন, তা নিয়েও খাতভেদে পার্থক্য পাওয়া গেছে। কৃষি খাতে সরকারের প্রতি আস্থা তুলনামূলক বেশি, পোশাক ও নির্মাণ খাতে নিয়োগদাতাদের ভূমিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন শ্রমিকরা, আর পরিবহন খাতে শ্রমিক সংগঠন বা ইউনিয়নের প্রতি আস্থা তুলনামূলক বেশি। গবেষকদের পর্যবেক্ষণ হলো, এই ভিন্নতার কারণে তরুণদের কাছে সহায়তামূলক তথ্য পৌঁছাতে হলে খাতভিত্তিক আলাদা কৌশল নেওয়া প্রয়োজন— সবার জন্য এক ছাঁচের নীতি কার্যকর হবে না।
গবেষণাপত্রে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে, যা এই আলোচনাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। দেশের মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশের বেশিই ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ। তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ৪৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে, আর এই খাতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের রপ্তানি আয়ের ৮৫ শতাংশ। অন্যদিকে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ৯২ শতাংশই এখনো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, যা সবুজ অর্থনীতিতে রূপান্তরের পথে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর পাশাপাশি দেশের মোট কর্মশক্তির প্রায় ৪৫ শতাংশ কৃষি খাতে নিয়োজিত, যে খাতটি ঘূর্ণিঝড়, মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও অনিয়মিত মৌসুমি বৃষ্টিপাতের মতো জলবায়ু ঝুঁকির সরাসরি শিকার।
গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক ও অর্থনীতির একজন অধ্যাপক অনুষ্ঠানে মন্তব্য করেন, ন্যায্য রূপান্তর বা জাস্ট ট্রানজিশনের বিষয়টি এখন বৈশ্বিক ও জাতীয়— উভয় পর্যায়েই একটি জরুরি অগ্রাধিকারের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো এবং জলবায়ু-স্পর্শকাতর খাতগুলোর ওপর ব্যাপক নির্ভরতার কারণে এই আলোচনায় দেশের অবস্থান তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সবমিলিয়ে গবেষণাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে— তরুণদের জন্য নীতি প্রণয়ন করলেই হবে না, বরং নীতি তৈরির প্রক্রিয়ায় তাঁদের সরাসরি সম্পৃক্ত করাটাই একটি কার্যকর ও ন্যায্য রূপান্তরের প্রকৃত পূর্বশর্ত। জলবায়ু ঝুঁকি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সন্ধিক্ষণে তরুণদের প্রকৃত চাহিদা বুঝে খাতভিত্তিক সুনির্দিষ্ট সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণই হতে পারে টেকসই সমাধানের মূল চাবিকাঠি।

