একসময় কাঁচা চামড়া ও পশুর চামড়া সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল ছিল বাংলাদেশের চামড়া শিল্প। সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলেছে। এখন চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ, চামড়াজাত পণ্য ও জুতা তৈরির বিস্তৃত শিল্পে পরিণত হয়েছে এ খাত। প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ চামড়া প্রক্রিয়াজাতের পাশাপাশি দেশে তৈরি হচ্ছে কোটি কোটি জোড়া জুতা। রপ্তানি আয়ও এখন ১৭০ কোটি ডলারের বেশি।
দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ, উন্নত প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা এবং পণ্যে বাড়তি মূল্য যোগ করার ফলে চামড়া শিল্প ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। এখন এ খাতের লক্ষ্য রপ্তানি আয় ১৭৭ কোটি ডলারে উন্নীত করা।
তবে সামনে এগিয়ে যেতে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না। পরিবেশগত মানদণ্ড মেনে চলা, পণ্যের উৎপত্তি ও সরবরাহের তথ্য নিশ্চিত করা, আধুনিক অবকাঠামো তৈরি এবং বিশ্বের উচ্চমূল্যের বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা বাড়ানো—এসব বিষয়ই হয়ে উঠবে চামড়া শিল্পের পরবর্তী উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি।
বাংলাদেশের চামড়া শিল্পে এখন কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ চামড়া প্রক্রিয়াজাত ও জুতা উৎপাদন হচ্ছে। অর্থাৎ, কাঁচামাল রপ্তানির পর্যায় পেরিয়ে শিল্পটি এখন ধীরে ধীরে মূল্য সংযোজনের আরও উঁচু ধাপে উঠছে।
জুতা তৈরির ইতিহাস বহু পুরোনো। একসময় একজন কারিগরই একজন ক্রেতার পায়ের মাপ নেওয়া থেকে শুরু করে কাঠের ছাঁচ তৈরি, ওপরের অংশ ও তলা কাটা, সেলাই এবং শেষ ধাপের কাজ—সবই করতেন। ফলে প্রতিটি জোড়া জুতার মধ্যে কিছুটা পার্থক্য থাকত। উৎপাদনও ছিল সীমিত এবং তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল।
জুতা তৈরির ক্ষেত্রে কাঠের ছাঁচটি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জুতার আকৃতি, মাপ ও পরার আরাম অনেকটাই নির্ভর করত এর ওপর। ওপরের অংশকে সেই ছাঁচের সঙ্গে হাতের কাজের মাধ্যমে বসিয়ে আকৃতি দেওয়ার প্রক্রিয়াটিও ছিল সময়সাপেক্ষ এবং দক্ষ শ্রমিকনির্ভর।
উনিশ শতকে যন্ত্রের ব্যবহার শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। তলা কাটার যন্ত্র, সেলাইয়ের যন্ত্র এবং পরে জুতার আকৃতি দেওয়ার যন্ত্র উৎপাদনের গতি বাড়িয়ে দেয়। ১৮৮৩ সালে জ্যান আর্নস্ট ম্যাটজেলিগারের তৈরি আকৃতি দেওয়ার যন্ত্র ছিল এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি। হাতে একজন দক্ষ কারিগর যে সময়ে ৫০ জোড়া জুতার আকৃতি দিতে পারতেন, যন্ত্রটি একই সময়ে প্রায় ৭০০ জোড়া তৈরির সক্ষমতা দেখায়।
এর ফলে একজন কারিগরের হাতে পুরো জুতা তৈরির পরিবর্তে কাজ ভাগ হয়ে যায়। কেউ চামড়া কাটেন, কেউ সেলাই করেন, কেউ জুতার আকৃতি দেন, আবার কেউ তলা লাগানো ও শেষ করার কাজ করেন। এভাবেই ধীরে ধীরে জুতার কারখানা বড় আকারের শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিণত হয়।
শুধু চামড়াই নয়, সময়ের সঙ্গে রাবার ও বিভিন্ন কৃত্রিম উপকরণও জুতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। উনিশ শতকে প্রক্রিয়াজাত রাবারের ব্যবহার শুরু হওয়ার পর টেকসই ও পানিরোধী তলা তৈরি করা সহজ হয়।
পরবর্তী সময়ে কৃত্রিম রাবার, পিভিসি, পলিইউরেথেন এবং হালকা ফেনাজাতীয় উপকরণের ব্যবহার জুতা তৈরিতে আরও বৈচিত্র্য আনে। আঠার সাহায্যে জুতার তলা লাগানো, তাপ ও চাপ প্রয়োগ করে রাবার বসানো এবং ছাঁচে গলানো উপকরণ ঢেলে তলা তৈরির মতো পদ্ধতি ব্যাপকভাবে চালু হয়।
এর ফলে স্যান্ডেল, খেলাধুলার জুতা, স্কুলের জুতা, নিরাপত্তা জুতা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন ব্যবহারের বিভিন্ন ধরনের জুতা বড় পরিসরে উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে।
বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় জুতা তৈরির কাজ মূলত ছোট কারখানা ও কারিগরদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। বড় পরিসরে শিল্পভিত্তিক উৎপাদনের শুরু ১৯৬২ সালে, যখন বাটা টঙ্গীতে কারখানা স্থাপন করে। এরপর ১৯৬৭ সালে ইস্টার্ন প্রগ্রেসিভ শু ইন্ডাস্ট্রিজ শিল্পভিত্তিক উৎপাদনে আসে এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন, চেকোস্লোভাকিয়া ও ইংল্যান্ডে জুতা রপ্তানি শুরু করে।
তবে চামড়া শিল্পের বড় পরিবর্তন আসে ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে। কাঁচা ও অর্ধপ্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানির পরিবর্তে দেশে চামড়া প্রক্রিয়াজাত ও তৈরি পণ্য উৎপাদনের দিকে নীতিগতভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ১৯৯০ সালে ভেজা অবস্থার প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর চামড়াকে আরও উন্নত পর্যায়ে প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানির প্রবণতা বাড়ে। পাশাপাশি চামড়াজাত পণ্য ও জুতা তৈরিতে বিনিয়োগও বাড়তে থাকে।
পরবর্তী সময়ে রপ্তানিমুখী কারখানাগুলো উন্নত যন্ত্রপাতি ও উৎপাদন পদ্ধতি ব্যবহার শুরু করে। চামড়া কাটার যন্ত্র, পাতলা করার যন্ত্র, সেলাইয়ের যন্ত্র, জুতার সামনের ও পেছনের অংশের আকৃতি দেওয়ার যন্ত্র, তলা চাপ দিয়ে বসানোর যন্ত্রসহ বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও নির্ভুল করে।
ফলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে শুধু কাঁচা চামড়া বা অর্ধপ্রক্রিয়াজাত চামড়া সরবরাহকারী দেশ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য তৈরি পণ্য উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়।
জুতা তৈরির ক্ষেত্রে এখন পরিবর্তন শুধু কারখানার উৎপাদন লাইনে নয়, নকশা তৈরির পর্যায় থেকেও শুরু হচ্ছে। কম্পিউটারের মাধ্যমে জুতার নকশা তৈরি, বিভিন্ন মাপ অনুযায়ী নকশা পরিবর্তন এবং উপকরণ কাটার পরিকল্পনা করা যায়। এতে উৎপাদনের আগে ভুল কমানো এবং উপকরণের অপচয় কমানো সম্ভব হচ্ছে।
বাংলাদেশেও এ ধরনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন ২০১৫ সালে কম্পিউটারভিত্তিক নকশা ও উৎপাদন সহায়তা কেন্দ্র চালু করে। সেখানে নকশা তৈরি, বিভিন্ন মাপে নকশা প্রস্তুত, লেজার কাটিং এবং নকশাবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
ত্রিমাত্রিক নকশা ও ডিজিটাল নমুনা তৈরির প্রযুক্তি এই পরিবর্তনকে আরও এগিয়ে নিচ্ছে। কোনো জুতা বাস্তবে তৈরি করার আগে কম্পিউটারে তার রং, আকৃতি ও উপকরণের সমন্বয় দেখা সম্ভব হচ্ছে। এতে বারবার নমুনা তৈরির প্রয়োজন কমে, সময় ও উপকরণ দুটোই সাশ্রয় হয়।
প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও জুতা তৈরির পুরো প্রক্রিয়া এখনো যন্ত্রনির্ভর হয়ে ওঠেনি। চামড়া, কাপড় ও অন্যান্য নমনীয় উপকরণকে বিভিন্ন আকৃতিতে কাটা, সেলাই করা এবং একসঙ্গে জোড়া লাগানোর কাজে মানুষের দক্ষতা এখনও গুরুত্বপূর্ণ।
কিছু ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চামড়া কাটা, তলা তৈরি, আঠা লাগানো ও সেলাইয়ের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু জুতার নকশা দ্রুত পরিবর্তন হওয়া এবং বিভিন্ন উপকরণের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হওয়ায় সব কাজ যন্ত্রের মাধ্যমে করানো এখনো ব্যয়বহুল ও জটিল।
বাংলাদেশের শিল্প খাতেও তাই যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন থাকবে। উন্নত নকশা তৈরি, মান নিয়ন্ত্রণ, যন্ত্র পরিচালনা, জুতার আকৃতি দেওয়া এবং উৎপাদন তদারকির মতো কাজে প্রশিক্ষিত কর্মীর চাহিদা বাড়ছে।
ভবিষ্যতের জুতার কারখানা তাই শুধু রোবটনির্ভর বিশাল উৎপাদন কেন্দ্র হবে না। বরং দক্ষ কর্মী ও আধুনিক যন্ত্রের সমন্বয়েই উৎপাদন আরও নির্ভুল ও কার্যকর হবে।
জুতা শিল্পের প্রযুক্তি এখন আরও দ্রুত বদলাচ্ছে। কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত বুনন পদ্ধতিতে কম সংখ্যক আলাদা অংশ ব্যবহার করে জুতার ওপরের অংশ তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। ত্রিমাত্রিক মুদ্রণ প্রযুক্তির মাধ্যমে জুতার মাঝের তলা বা বিশেষ আকৃতির অংশও তৈরি করা যাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে ছাঁচের চারপাশে সরাসরি উপকরণ প্রয়োগ করে কাটাকাটি, সেলাই ও আঠা ব্যবহারের প্রয়োজনও কমানো সম্ভব হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য এখন মূল লক্ষ্য শুধু উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানো নয়। প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদনের মান বাড়ানো, উপকরণের অপচয় কমানো, দ্রুত নতুন পণ্য তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবেশ ও শ্রমমানসংক্রান্ত কঠোর শর্ত পূরণ করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
এ জন্য যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগের পাশাপাশি নকশাবিদ, নকশা প্রকৌশলী, কারিগরি কর্মী, উৎপাদন পরিকল্পনাবিদ ও মান নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ তৈরি করতে হবে। শুধু বিদেশি ক্রেতার দেওয়া নকশা অনুযায়ী পণ্য তৈরি না করে ধীরে ধীরে নিজেদের নকশা ও পণ্য উন্নয়নের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
একসময় যে জুতা একজন কারিগর একাই তৈরি করতেন, সেটিই আজ অসংখ্য মানুষের দক্ষতা ও আধুনিক যন্ত্রের সমন্বয়ে তৈরি হচ্ছে। আগামী দিনের বাংলাদেশি জুতা ও চামড়া শিল্পের সাফল্য নির্ভর করবে কত বেশি জোড়া জুতা তৈরি করা যায় তার চেয়ে, প্রতিটি জোড়া জুতায় কত বেশি জ্ঞান, প্রযুক্তি, মান ও মূল্য যোগ করা যায় তার ওপর।
বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের সামনে তাই বড় সম্ভাবনা রয়েছে। উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে নকশা, প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও উন্নত মান নিশ্চিত করতে পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও উচ্চমূল্যের পণ্যের সরবরাহকারী হিসেবে দেশের অবস্থান শক্ত করা সম্ভব।

