বিলাসবহুল গাড়ি পুরো অবস্থায় আমদানি না করে কেটে-ছেঁটে বিভিন্ন অংশে ভাগ করে দেশে আনার অভিযোগ উঠেছে। এসব চালানে কাগজপত্রে গাড়ির বদলে ‘ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ’ উল্লেখ করা হচ্ছে। পরে সেই অংশগুলো দেশের বিভিন্ন গ্যারেজে জোড়া লাগিয়ে তৈরি করা হচ্ছে পুরো গাড়ি।
সম্প্রতি কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের (সিআইআইডি) কয়েকটি অভিযানে এমন একাধিক চালানের সন্ধান মিলেছে। এতে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকির পাশাপাশি আমদানি নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে বিলাসবহুল গাড়ি দেশে আনার নতুন কৌশল ব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মোংলা বন্দরে ‘ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ’ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া একটি চালানে চারটি বিলাসবহুল গাড়ির বিভিন্ন অংশ শনাক্ত করেন কাস্টমস কর্মকর্তারা। কক্সবাজারেও একই ধরনের অভিযোগে টয়োটা সুপ্রা, হোন্ডা সিভিক ও মাজদা এমএক্স-৫ জব্দ করা হয়েছে।
এ ছাড়া দুবাই থেকে যন্ত্রাংশ হিসেবে আনা একটি বিএমডব্লিউ চট্টগ্রামে স্থানীয়ভাবে জোড়া লাগিয়ে পুরো গাড়িতে রূপান্তর করার অভিযোগও তদন্ত করছে সিআইআইডি। অভিযোগ রয়েছে, পরে অন্য একটি পুরোনো বিএমডব্লিউর নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে গাড়িটি চট্টগ্রামের সড়কে চালানো হচ্ছিল।
সর্বশেষ আরেকটি চালানে লেক্সাস এলএক্স৬০০, লেক্সাস এসসি৪৩০ ও বিএমডব্লিউ এম৫-এর বিভিন্ন কাটা অংশ শনাক্ত করেছে সিআইআইডি। ওই চালানে হোন্ডা বি১৮সি টাইপ আর ইঞ্জিন, বিভিন্ন ধরনের কাটা গাড়ির অংশসহ আরও বেশ কিছু যন্ত্রাংশও ছিল।
সিআইআইডির সহকারী পরিচালক প্রণয় চাকমা জানান, এখন পর্যন্ত একটি চালানের রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হয়েছে। তাঁর হিসাবে, সর্বশেষ জব্দ করা চালানটিতে সরকারের প্রায় ১২ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। অন্য চালানগুলোর হিসাব শেষ হলে মোট রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
মোংলা বন্দরের ঘটনাটি পুরো বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে। কাস্টমস গোয়েন্দারা দেখতে পান, ‘ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ’ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া একটি চালানে চারটি বিলাসবহুল গাড়ির এমন অংশ রয়েছে, যেগুলো এখনো পুরো গাড়ির মৌলিক কাঠামো ও বৈশিষ্ট্য ধরে রেখেছে।
গাড়িগুলো হলো ২০১৭ সালের রেঞ্জ রোভার ভোগ, ২০১০ সালের বিএমডব্লিউ ৬৫০আই, ২০১৬ সালের লেক্সাস এলএক্স৫৭০ এবং টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেট।
কাস্টমসের প্রাথমিক হিসাবে, বাংলাদেশে এসব গাড়ির সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৪ কোটি থেকে সাড়ে ৬ কোটি টাকা বা তারও বেশি হতে পারে।
কিন্তু পুরো চালানে ১৪ ধরনের ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ দেখিয়ে যে মূল্য ঘোষণা করা হয়েছিল, তা মাত্র ৭ হাজার ৯৩৫ ডলার। নির্ধারিত বিনিময় হার ও অন্যান্য খরচ হিসাব করে এর মূল্যায়নযোগ্য মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৯ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। আর এর বিপরীতে শুল্ক ও করের পরিমাণ ধরা হয়েছিল প্রায় ৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
প্রাথমিক তদন্তে আরও দেখা যায়, গাড়িগুলো সাধারণ খুচরা যন্ত্রাংশের মতো সম্পূর্ণভাবে খুলে ফেলা হয়নি। বরং প্রতিটি গাড়িকে মাত্র তিন বা চারটি বড় অংশে কেটে দেশে আনা হয়েছে।
ফলে এসব অংশ পরবর্তী সময়ে জোড়া লাগিয়ে আগের গাড়ির কাঠামো ও বৈশিষ্ট্য প্রায় আগের মতো ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
গাড়িগুলো শনাক্ত করতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ ও খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া হয়। বিভিন্ন অংশে থাকা স্টিকার, পরিচিতিচিহ্ন, নম্বর ও অন্যান্য দাগ পরীক্ষা করার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হয়েছে।
এ ধরনের সব ঘটনায় সরকারের মোট কত টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে, তা এখনো চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা হয়নি।
চট্টগ্রাম কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মতে, এসব গাড়িকে সাধারণ ‘ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ’ হিসেবে নয়, বরং নির্দিষ্ট শুল্ক বিধির আওতায় আংশিকভাবে সংযোজিত গাড়ি হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে গাড়ির মূল্য, ইঞ্জিনের ক্ষমতা, বয়স, অবচয়, নির্ধারিত শুল্কমূল্য বা ন্যূনতম মূল্য এবং প্রযোজ্য শুল্ক-কর—সবকিছু হিসাব করতে হবে।
কাস্টমস গোয়েন্দাদের মতে, মোংলা বন্দরের চালানে পাওয়া অংশগুলো সম্পূর্ণ গাড়ির মূল বৈশিষ্ট্য ধরে রেখেছে। তাই সেগুলোকে আংশিকভাবে সংযোজিত গাড়ি হিসেবে মূল্যায়নের সুপারিশ করে চালানটি মোংলা কাস্টমস হাউসে পাঠানো হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মুখপাত্র আল আমিন বলেন, কাস্টমস গোয়েন্দাদের তৎপরতা বাড়ার কারণে এ ধরনের বড় চালান ধরা পড়ছে। অতীতেও এমন ঘটনা ঘটেছে, তবে এখন বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আরও সতর্ক।
সব চালানের মূল্যায়ন শেষ হলে মোট রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ স্পষ্ট হবে বলে জানান তিনি।মোংলার ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যেই চট্টগ্রামে একই ধরনের আরও একটি ঘটনা সামনে আসে।
সিআইআইডির কাছে অভিযোগ আসে, দুবাই থেকে যন্ত্রাংশ হিসেবে আমদানি করা একটি বিএমডব্লিউ চট্টগ্রামে এনে স্থানীয়ভাবে জোড়া লাগিয়ে সম্পূর্ণ গাড়িতে রূপান্তর করা হয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, গাড়িটির বিভিন্ন অংশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে খালাস করে কাপ্তাই-চন্দ্রঘোনা এলাকার একটি স্থানে নেওয়া হয়। সেখানে সেগুলো জোড়া লাগানোর পর গাড়িটির বাকি কাজ চট্টগ্রাম নগরের মুরাদপুর এলাকার একটি গাড়ির গ্যারেজে সম্পন্ন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, স্থানীয়ভাবে গাড়িটি সম্পূর্ণ করার পর অন্য একটি পুরোনো বিএমডব্লিউর নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে সেটি সড়কে চালানো হচ্ছিল।
চট্টগ্রাম কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সোহান জানান, ওই ঘটনায় রাজস্ব ফাঁকির বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। মূল্যায়ন শেষ করতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে।
চট্টগ্রামের ঘটনার পর একই ধরনের অভিযোগে কক্সবাজারে আরও তিনটি গাড়ি জব্দ করে সিআইআইডি। গাড়িগুলো হলো টয়োটা সুপ্রা, হোন্ডা সিভিক ও মাজদা এমএক্স-৫।
২৭ আগস্ট রাতে কক্সবাজারের কলাতলী সড়কের ওশান প্যারাডাইস হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে অভিযান চালিয়ে গাড়িগুলো শনাক্ত ও জব্দ করা হয়।
সিআইআইডির প্রাথমিক অভিযোগ, গাড়িগুলো যন্ত্রাংশ হিসেবে দেশে আনার পর স্থানীয়ভাবে জোড়া লাগিয়ে সম্পূর্ণ গাড়িতে পরিণত করা হয়েছে।
অভিযানের সময় কর্মকর্তারা গাড়িগুলোর গায়ে প্রচলিত নিবন্ধন নম্বর প্লেটের পরিবর্তে ‘SINH4’, ‘S4FIAT’ ও ‘ESH4H’-এর মতো বিভিন্ন চিহ্ন দেখতে পান।
সিআইআইডির চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক রেজভি আহমেদ জানান, জব্দ করা গাড়ির মধ্যে ২০২১ সালের একটি টয়োটা সুপ্রা এবং ২০২০ সালের একটি মাজদা এমএক্স-৫ মিয়াটা রয়েছে।
‘ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ’ হিসেবে আমদানি করে পরে স্থানীয়ভাবে সম্পূর্ণ গাড়িতে রূপান্তরের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
যদি প্রমাণিত হয় যে সম্পূর্ণ গাড়ি বা গাড়ির মূল কাঠামো ও বৈশিষ্ট্য ধরে রাখা অংশকে যন্ত্রাংশের নামে দেশে এনে পরে জোড়া লাগানো হচ্ছে, তাহলে ক্ষতি শুধু সরকারের রাজস্বেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
এতে বৈধ পথে গাড়ি আমদানি করা ব্যবসায়ীরাও অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুল হক।
তিনি বলেন, বৈধ আমদানিকারকদের নির্ধারিত শুল্ক ও কর, মূল্যায়ন এবং আমদানি বিধিমালা মেনে গাড়ি আনতে হয়।
অন্যদিকে গাড়ির প্রকৃত পরিচয় গোপন করে কম মূল্যের যন্ত্রাংশ হিসেবে পণ্য আমদানি করা হলে তুলনামূলক কম খরচে বাজারে গাড়ি সরবরাহের সুযোগ তৈরি হয়। এতে নিয়ম মেনে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে।
ফলে বিলাসবহুল গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানির নামে শুল্ক ফাঁকির এই অভিযোগ শুধু রাজস্ব আদায়ের প্রশ্ন নয়; এটি দেশের বৈধ গাড়ি ব্যবসা ও আমদানি ব্যবস্থার স্বচ্ছতার সঙ্গেও সরাসরি জড়িত।

