উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া, গ্যাসের সংকট এবং রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ায় গত তিন বছরে প্রায় ৪০০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে তৈরি পোশাক খাতের কর্মসংস্থান ও শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)।
বুধবার বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদল এ তথ্য তুলে ধরে। বৈঠকে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বর্তমান সংকট, উৎপাদন ও রপ্তানির বিভিন্ন বাধা এবং খাতটি ঘুরে দাঁড় করাতে প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়।
বিজিএমইএ বলেছে, বর্তমানে পোশাক কারখানাগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়া। গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় অধিকাংশ কারখানা তাদের উৎপাদন সক্ষমতার ৫০ শতাংশেরও কম ব্যবহার করতে পারছে। এতে সময়মতো উৎপাদন ও রপ্তানি আদেশ পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের অর্ডার হারানোর আশঙ্কা বাড়ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুতের উচ্চমূল্য, ব্যাংকঋণের সুদের হার বৃদ্ধি এবং শ্রমিকদের মজুরি সমন্বয়ের চাপ। এসব কারণে গত তিন বছরে পোশাক উৎপাদনের সামগ্রিক ব্যয় প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কমেছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই মাসেও রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৯২ শতাংশ কমেছে।
অন্যদিকে, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। উৎপাদন ব্যয় ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার কারণে গত তিন বছরে প্রায় ৪০০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে খাতটির বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তৈরি পোশাক শিল্পকে স্থিতিশীল করতে সরকারের কাছে একাধিক নীতিগত সহায়তার দাবি জানিয়েছে বিজিএমইএ। এর মধ্যে দ্রুত আরও দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, জ্বালানি আমদানির ওপর সব ধরনের শুল্ক প্রত্যাহার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি পোশাক কারখানাকে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার এবং সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে কম সুদের ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
পণ্য পরিবহন ও বন্দর ব্যবস্থাপনা উন্নত করার জন্য ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে নেওয়া, ঢাকার বিমানবন্দরে অস্থায়ীভাবে অতিরিক্ত কার্গো শেড নির্মাণ এবং বে টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর দ্রুত সম্পন্ন করারও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
এ ছাড়া চলতি মূলধন ও বাণিজ্যিক ঋণের সুদের হার কমানো, বিশেষায়িত রপ্তরোত্তর অর্থায়ন ব্যবস্থা চালু এবং সবুজ রূপান্তর তহবিল ও প্রযুক্তি উন্নয়ন তহবিলে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বিজিএমইএ।
ব্যবসা পরিচালনা সহজ করতে শুল্কমুক্ত বন্ড-সংক্রান্ত নিরীক্ষা প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানির সুযোগ পুনরায় চালুর দাবিও জানানো হয়েছে।
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর তৈরি পোশাকের রপ্তানি সুবিধা ধরে রাখতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে বিজিএমইএ। সংগঠনটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য ও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি করার উদ্যোগ জোরদারের দাবি জানিয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে এলডিসি উত্তরণের পরও বাংলাদেশের পোশাক পণ্য শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা ধরে রাখতে পারে।
পাশাপাশি গাজীপুরে পোশাকশ্রমিকদের জন্য আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণে জমি বরাদ্দ এবং পোশাক কারখানার বর্জ্য বা ঝুট ব্যবসার জন্য একটি আনুষ্ঠানিক নীতিমালা প্রণয়নের দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।
বৈঠকে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তৈরি পোশাক শিল্পকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের বৈশ্বিক বাজারে অবস্থান ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে তিনি আশ্বাস দেন।
রাষ্ট্রপতি জানান, তৈরি পোশাক খাতের সমস্যাগুলো সমাধানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

