চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ভ্যাট আদায় প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। এই পতনের পেছনে কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে সম্প্রতি চালু করা ত্রৈমাসিক ভ্যাট রিটার্ন ও পরিশোধ ব্যবস্থাকে। আর এই পরিস্থিতিতে ফের মাসিক ভ্যাট পরিশোধের ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। যদিও ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতে ব্যবসার পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এনবিআরের প্রাথমিক তথ্য বলছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই মাসে ভ্যাট আদায় হয়েছে ৯ হাজার ৩০১ কোটি টাকা। গত বছর একই সময়ে আদায় ছিল ১১ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা। আগস্টে আদায় দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৩৬২ কোটি টাকায়, যা আগের বছরের ১১ হাজার ৮১ কোটি টাকা থেকে অনেক কম। অর্থাৎ দুই মাসে ভ্যাট আদায় কমেছে ১৭ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা থেকে ২২ হাজার ৬২৮ কোটি টাকায়। আর ভ্যাট রিটার্ন জমা পড়েছে ৩ লাখ ৬ হাজারে, যা জুনের ৩ লাখ ২৮ হাজার থেকে কম।
শুধু জুলাই মাসের কথাই ধরা যাক। ওই মাসে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা, আদায় হয়েছে মাত্র ৮ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা। ঘাটতি ৭ হাজার ৫২০ কোটি টাকা, প্রবৃদ্ধি মাইনাস ২৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ। গত এক যুগে এনবিআরের ইতিহাসে এত বড় মাইনাস প্রবৃদ্ধি আর হয়নি।
এনবিআরের ভ্যাট বাস্তবায়ন সদস্য সৈয়দ মুসফিকুর রহমান বলেছেন, তিন মাস পর পর রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ পাওয়ায় আদায় কম হতে পারে। তবে আগামী অক্টোবরে প্রকৃত চিত্র বোঝা যাবে। তিনি বলেন, ‘যেহেতু তিন মাস পর পর রিটার্ন দেওয়ার সুযোগ রয়েছে, সবাই এই সুযোগটা নেবে’।
২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে চালু হওয়া ত্রৈমাসিক ভ্যাট ব্যবস্থায় ব্যবসায়ীরা প্রতি তিন মাস পর পর রিটার্ন জমা দিতে পারছেন। নেসলে বাংলাদেশের সাবেক পরিচালক দেবব্রত রায় চৌধুরী বলেছেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য মাসিক ভ্যাট জমা দেওয়া কষ্টকর। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন, ‘যদি সরকার এখন আবার মাসিক ব্যবস্থায় ফিরে যায়, তাহলে তা ব্যবসায়ীদের জন্য বাড়তি ঝামেলার সৃষ্টি করবে’।
এনবিআরের কিছু কর্মকর্তা সমঝোতার পথে হাঁটতে চাইছেন, ভ্যাট রিটার্ন ত্রৈমাসিক, কিন্তু পরিশোধ মাসিক। কিন্তু ব্যবসায়ীরা বলছেন, মাসিক পরিশোধ করলেও রিটার্ন জমার মতোই ঝামেলা পেতে হবে। পুরান ঢাকার ইস্পাত ব্যবসায়ী আমির হোসেন নূরানী বলেছেন, মাসিক রিটার্ন মানে আলাদা লোক নিয়োগ করা, যা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পক্ষে কঠিন।
সাবেক এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, এই সংস্কার রাজস্ব সংগ্রহের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেছেন, ব্যবসায়ীরা তিন মাসের ভ্যাট টাকা অন্য কাজে ব্যবহার করতে পারে। অন্যদিকে, আরএপিআইডির চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদে তরলতা সমস্যা হবে না, তবে প্রাথমিক অনিশ্চয়তা থাকতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, এনবিআর কি আবার মাসিক ব্যবস্থায় ফিরে যায়, নাকি কোনো সমঝোতার পথ বেছে নেয়? ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের স্বার্থ এবং রাজস্ব আদায়, দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে বের করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

