দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমাতে গত কয়েক বছরে একের পর এক নীতিসহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ বাড়ানো থেকে শুরু করে মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে পুনঃতফসিল, সুদ মওকুফের মাধ্যমে এককালীন এক্সিট সুবিধা এবং বড় ঋণখেলাপিদের জন্য ১৫ বছর মেয়াদি ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ—সবই দেয়া হয়েছে। এর ফলে শুধু ২০২৫ সালেই রেকর্ড ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে। ২০২৪ সালে পুনঃতফসিল করা হয়েছিল ৮৫ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা।
তারপরও ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের লাগাম টানা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল-জুন সময়ে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। আর জানুয়ারি থেকে জুন—ছয় মাসে এ বৃদ্ধির পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।
জুন শেষে দেশের ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের মধ্যে এর অংশ ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এর মধ্য দিয়ে দেশে দ্বিতীয়বারের মতো খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেল।
তিন মাসেই বাড়ল প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ৩১ মার্চ ব্যাংক খাতে বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ছিল ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ।
তিন মাস পর জুন শেষে বিতরণ করা ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা। একই সময়ে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয় ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। এতে মোট ঋণের বিপরীতে খেলাপির হার দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল। ওই সময় বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ছিল ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, অর্থাৎ ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ ছিল খেলাপি।
পরে খেলাপি ঋণ কমানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন ধরনের নীতিছাড় দেয়। কিন্তু নীতিসহায়তার পর কিছুটা কমলেও চলতি বছর আবারও খেলাপি ঋণ ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
ঋণ ফেরত না দেয়ার প্রবণতা বাড়ছে
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশে ব্যাংকের ঋণ ফেরত না দেয়ার প্রবণতা অনেকটা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। ফলে ঋণখেলাপিদের নানা সুবিধা দেয়া হলেও তারা ব্যাংকের অর্থ পরিশোধে আগ্রহী হচ্ছেন না।
তাদের মতে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণের একটি বড় অংশের এখন কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি অস্তিত্বহীন কোম্পানির নামেও ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল। এসব ঋণ খেলাপি হওয়ার পর তা আদায়ের বাস্তব সুযোগও খুব কম।
অর্থনীতিবিদরা তাই নতুন করে নীতিছাড় দেয়ার পরিবর্তে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটসহ অর্থনীতির কাঠামোগত সমস্যার স্থায়ী সমাধানের প্রয়োজন বলেও তারা মনে করছেন।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অতিরিক্ত উদারতার কারণেই খেলাপি ঋণের পরিস্থিতি এতটা খারাপ হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক এ প্রধান অর্থনীতিবিদ বলেন, বছরের পর বছর ঋণখেলাপিদের প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক নমনীয়তা দেখিয়েছে। কিন্তু সেই উদারতা সংকট সমাধান করতে পারেনি; বরং সংকট আরও গভীর করেছে। তার ভাষায়, অপরাধ ও অপরাধীদের প্রশ্রয় দেয়ার কারণেই খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্যোগগুলো কার্যকর হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের অজুহাতে ২০২২ সাল থেকে অনেক নীতিছাড় দেয়া হয়েছে। কিন্তু সেগুলোর কার্যকর ফল পাওয়া যায়নি। যুদ্ধের মধ্যেও বিশ্বের অনেক দেশ এগিয়ে গেছে, অথচ বাংলাদেশ এখনো ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবের মধ্যে আটকে আছে। ব্যাংকগুলোতে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণও অনেক বেশি। খেলাপি ঋণ কমাতে কার্যকর করপোরেট ও নিয়ন্ত্রক সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েই ঋণের বড় অংশ অনিয়মে বিতরণ
২০০৯ সালের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের সময় দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। টানা দেড় দশকের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে সরকারের পতন হয়।
ওই বছরের জুনে খেলাপি ঋণের স্থিতি ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ। তবে পরবর্তী সময়ে ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে শুরু করলে দেখা যায়, সমস্যার পরিমাণ অনেক বেশি।
সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ বেড়ে রেকর্ড ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় পৌঁছে। এরপর পুনঃতফসিল নীতিমালা সহজ করাসহ বিভিন্ন নীতিছাড় দিয়ে খেলাপি ঋণ কমানোর চেষ্টা করা হয়। এর ফলে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ কমে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকায় নামে। তবে চলতি বছর আবারও তা বাড়তে শুরু করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, ২০০৯ সালের পরবর্তী দেড় দশকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণ খেলাপি হওয়ার পাশাপাশি ঋণ শ্রেণীকরণের নিয়ম পরিবর্তন, সুদহার বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক মন্দার কারণেও খেলাপি ঋণ বেড়েছে।
গণ-অভ্যুত্থানের পর শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে একটি ব্যাংকে রূপান্তরের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এসব ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৮০ শতাংশই খেলাপি। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের প্রায় অর্ধেক খেলাপি হয়ে যাওয়াও সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে।
ব্যাংক খাতে আমূল সংস্কারের তাগিদ
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, অতীতে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণের প্রকৃত চিত্র এখনো পুরোপুরি সামনে আসেনি।
তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান যাচাই করতে আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ বা এ কিউ আর করা হচ্ছে। ফলে খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্যোগের পূর্ণ সুফল এখনো দৃশ্যমান হয়নি। এর পাশাপাশি দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও ব্যাংক ঋণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে ব্যাংক খাতকে শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, এ জন্য আমূল সংস্কার এবং একীভূতকরণের মাধ্যমে শক্তিশালী ব্যাংক তৈরি করতে হবে। বেসরকারি খাতের পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে একটি ব্যাংক করা হয়েছে। এখন দুর্বল সরকারি ব্যাংকগুলোও একীভূত করে শক্তিশালী ব্যাংক তৈরির উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।
তার মতে, বহু বছর ধরে জনগণের অর্থ দিয়ে সরকারি ব্যাংকগুলোকে মূলধন জোগান দেয়া হলেও তার কার্যকর ফল পাওয়া যায়নি। দেশের অর্থনীতির স্বার্থে এখন সরকারকে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
পুনঃতফসিল হচ্ছে, আবার খেলাপিও হচ্ছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নীতিছাড়ের ফলে ২০২৫ সালে ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে। এর আগের বছর পুনঃতফসিল করা হয়েছিল ৮৫ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে এ পরিমাণ ছিল ৯১ হাজার ২২১ কোটি এবং ২০২২ সালে ৬৩ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ পুনঃতফসিল করা ঋণকে ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট’ বা দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ হিসেবে বিবেচনা করে। বাছবিচার ছাড়াই পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয়ায় প্রতি বছর এ ধরনের ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে।
২০২৪ সালের শেষে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা।
সমস্যা হলো, পুনঃতফসিল করার পরও অনেক ঋণগ্রহীতা কিস্তি পরিশোধ করছেন না। ফলে এসব ঋণ পরবর্তী সময়ে আবার খেলাপি ঋণের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে।
১৮ মাসের রোডম্যাপ বাংলাদেশ ব্যাংকের
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেয়া নীতিসহায়তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়া এবং খেলাপি ঋণের সঙ্গে সুদ যোগ হওয়ার কারণেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে।
তিনি জানান, নীতিসহায়তা পাওয়ার পর অনেক ঋণগ্রহীতা ব্যাংকে যোগাযোগ করে পুনঃতফসিলের আবেদন করেছেন। তবে এ সুবিধা পেতে হলে ঋণের একটি নির্দিষ্ট অংশ ডাউন পেমেন্ট হিসেবে জমা দিতে হয়। অনেক গ্রাহক প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে না পারায় পুনঃতফসিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেননি।
এর পাশাপাশি খেলাপি ঋণের ওপর সুদ যোগ হওয়ায় মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ আবারও ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে জানান তিনি।
খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ১৮ মাসের একটি রোডম্যাপ গ্রহণ করেছে। সেই রোডম্যাপ অনুযায়ী বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে কয়েকটি প্রজ্ঞাপনও জারি হয়েছে। রোডম্যাপ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা গেলে খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

