দেশের অর্থনীতির বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্বস্তির চিত্র দেখা যাচ্ছে। প্রবাসী আয় ও পণ্য রপ্তানি—দুই উৎস থেকেই বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ বেড়েছে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্ট শেষে এসব সূচকে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে।
তবে বৈদেশিক খাতের এই স্বস্তি এখনো দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হচ্ছে না। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে না। ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল, ব্যবসা-বাণিজ্যেও গতি কম। এর সঙ্গে গত দেড় মাস ধরে নতুন করে যুক্ত হয়েছে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট। এতে অধিকাংশ শিল্পকারখানার উৎপাদন কমবেশি ব্যাহত হয়েছে এবং ব্যবসার খরচও বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ ও রিজার্ভ বাড়লেও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে এর সুফল উৎপাদন, বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে দেখা যাচ্ছে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত পণ্যের চাহিদা বাড়বে না। আর চাহিদা না বাড়লে অর্থনীতিতেও গতি ফিরবে না। একই সঙ্গে শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপরও তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক মাস ধরে প্রবাসী আয়ে ভালো প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে যথাক্রমে ২৮৬ কোটি ও ২৯৭ কোটি মার্কিন ডলার।
জুলাইয়ে প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৫ শতাংশ। আগস্টে তা আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ শতাংশে। তবে এর আগে টানা ছয় মাস দেশে মাসে ৩০০ কোটি ডলারের বেশি প্রবাসী আয় এলেও গত জুন থেকে তা আবার ৩০০ কোটি ডলারের নিচে নেমে এসেছে।
তীব্র জ্বালানিসংকটের মধ্যেও আগস্টে দেশের পণ্য রপ্তানি বেড়েছে। গত মাসে বাংলাদেশ থেকে ৪৪৩ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি।
অবশ্য রপ্তানি প্রবৃদ্ধির এই ধারা এখনো ধারাবাহিক নয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে পণ্য রপ্তানি ০ দশমিক ৯০ শতাংশ কমেছিল। গত পাঁচ মাস ধরেই এমন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—এক মাসে রপ্তানি বাড়ছে, পরের মাসেই আবার কমে যাচ্ছে।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক বলেন, প্রবাসী আয়, পণ্য রপ্তানি ও রিজার্ভ—এই তিন বৈদেশিক সূচকে স্বস্তি থাকলেও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আনন্দ নেই। কারণ ব্যবসা পরিচালনার খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, কিন্তু সেই তুলনায় ব্যবসা বাড়েনি।
প্রবাসী আয় ও রপ্তানি থেকে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়ায় রিজার্ভেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার।
গত ২৭ আগস্ট শেষে রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারে। এক বছর আগে, ২০২৫ সালের ২৭ আগস্ট রিজার্ভ ছিল ২৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দেশের রিজার্ভ বেড়েছে ৬ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার।
তবে বৈদেশিক খাতের এসব ইতিবাচক সূচকের বিপরীতে মূল্যস্ফীতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে ৯ শতাংশের ঘরে থাকলেও গত জুলাইয়ে তা সামান্য কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে। আগস্টের মূল্যস্ফীতির তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি। একইভাবে পণ্য আমদানি ও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের সর্বশেষ তথ্যও পাওয়া যায়নি।
গত দেড় মাস ধরে দেশের শিল্পকারখানাগুলো তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের মুখে রয়েছে। স্পিনিং, ডাইং ও সিরামিকের মতো গ্যাসনির্ভর শিল্পে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে। কোথাও গ্যাসের চাপ কম, আবার কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না।
শিল্পমালিকদের কয়েকজন জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকটের মধ্যেও আগস্টে রপ্তানি বাড়াতে অনেক কারখানাকে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়েছে। কোথাও ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত ডিজেল ব্যবহার করে কারখানা চালু রাখতে হয়েছে। ফলে সময়মতো রপ্তানি করা সম্ভব হলেও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন অনেক ব্যবসায়ী।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক বলেন, ব্যবসার খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলেও ব্যবসার পরিমাণ সে অনুযায়ী বাড়েনি। সরকার অর্থনীতি চাঙা করতে বিভিন্ন প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এলে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফেরানো কঠিন। পাশাপাশি শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের পর জ্বালানি আমদানিতে সরকারের ব্যয় আরও বেড়েছে। বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি কিনতে আগের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি করেছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ ব্যয় প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বেশি।
অন্যদিকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অর্থনীতির গতি শ্লথ থাকায় সরকারের রাজস্ব আদায়ও কমেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায় কম হয়েছে সাড়ে ৮৭ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরেও রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য উন্নতির চিত্র এখনো দেখা যায়নি।
এর মধ্যেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। মূল বেতন ও বিভিন্ন ভাতা মিলিয়ে চার ধাপে নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর হলেও এতে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ আরও বাড়বে।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, প্রবাসী আয় ও পণ্য রপ্তানির মতো বৈদেশিক খাতে গতি থাকলে সাধারণত তার ইতিবাচক প্রভাব অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও পড়ার কথা। কিন্তু বর্তমানে তেমন কোনো প্রভাব দৃশ্যমান নয়।
তার মতে, দেশের অর্থনীতিকে এখনো ভালো অবস্থায় বলা যায় না। শিল্প খাতের উৎপাদন শ্লথ এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের পণ্যের চাহিদা কম। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির দুর্বলতা কাটানো না গেলে এর নেতিবাচক প্রভাব একসময় বৈদেশিক খাতেও পড়তে পারে।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন হচ্ছে, তাই উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। নতুন আবিষ্কৃত গ্যাসকূপগুলো থেকে দ্রুত জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমানে যে দামে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে, সেই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে প্রবাসী আয়, রপ্তানি ও রিজার্ভের ইতিবাচক প্রবণতা অর্থনীতির জন্য কিছুটা স্বস্তি দিলেও দেশের অভ্যন্তরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল চাহিদা, কম বিনিয়োগ এবং জ্বালানি সংকট বড় বাধা হয়ে রয়েছে। বৈদেশিক খাতের এই স্বস্তিকে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রূপ দিতে হলে এসব অভ্যন্তরীণ সংকটের দ্রুত সমাধান জরুরি।

