শুধু অনুমান বা ধারণার ভিত্তিতে কোনো করদাতার ওপর জরিমানা আরোপ করা যাবে না বলে নির্দেশনা দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কর ফাঁকি বা আয় গোপনের প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নথিপত্র ছাড়া কেবল কর কর্মকর্তার অনুমান করা আয়ের ভিত্তিতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।
করদাতাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল, অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়াই কর কর্মকর্তারা অতিরিক্ত আয় নির্ধারণ করে জরিমানা আরোপ করছেন। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই এনবিআর নতুন এই নির্দেশনা দিয়েছে। এতে করদাতাদের জন্য স্বস্তির পাশাপাশি কর কর্মকর্তাদেরও আইন অনুযায়ী যৌক্তিক পদ্ধতিতে কর নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গত ২ সেপ্টেম্বর এনবিআরের পক্ষ থেকে দেশের সব মাঠপর্যায়ের কর কার্যালয়ে সাত দফা নির্দেশনা পাঠানো হয়। এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব এবং কর আইন-১ শাখার দ্বিতীয় সচিব মো. একরামুল হক স্বাক্ষরিত ওই নির্দেশনায় কর কর্মকর্তাদের কর আইন যথাযথভাবে অনুসরণ করার পাশাপাশি জরিমানা আরোপের ক্ষেত্রে বাস্তব তথ্য ও প্রমাণের ওপর গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২৭২ ধারা অনুযায়ী জরিমানা আরোপ করতে হলে কর ফাঁকি বা আয় গোপনের যথেষ্ট প্রমাণ থাকতে হবে। শুধু একজন কর কর্মকর্তার ধারণা বা অনুমান করা আয়—যেমন বাড়িভাড়া, কৃষি আয়, ব্যবসায়িক লাভ, মূলধনী মুনাফা বা আর্থিক সম্পদ থেকে অর্জিত আয়—জরিমানা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হবে না।
এনবিআর উদাহরণ দিয়ে জানিয়েছে, কোনো কর কর্মকর্তা যদি মনে করেন যে একজন বাড়ির মালিক ঘোষিত ভাড়ার চেয়ে বেশি আয় করছেন, তাহলে শুধু সেই অনুমানের ভিত্তিতে জরিমানা করা যাবে না। প্রকৃত আয় গোপনের প্রমাণ দেখাতে হবে। একইভাবে কৃষি উৎপাদনের সম্ভাব্য হিসাব, ব্যবসার সম্ভাব্য বিক্রি বা লাভের অনুমান কিংবা সম্পদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে সরাসরি কর ফাঁকির অভিযোগ আনা যাবে না।
নতুন নির্দেশনায় করদাতার বক্তব্য শোনার বিষয়টিকেও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কোনো জরিমানা আরোপের আগে করদাতাকে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ দিতে হবে। কর কর্মকর্তাকে শুনানি গ্রহণ করে সব তথ্য বিবেচনা করার পর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পাশাপাশি জরিমানার বিষয়টি আলাদা কোনো আদেশের মাধ্যমে নয়, বরং মূল কর নির্ধারণ আদেশের মধ্যেই উল্লেখ করতে হবে।
এনবিআর স্পষ্ট করেছে, ভুল তথ্য দেওয়া বা আয় কম দেখানোর বিষয়টি সবসময় ইচ্ছাকৃত কর ফাঁকি হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। অনেক সময় করদাতারা অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো তথ্য বাদ দিতে পারেন বা আয়ের উৎস সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হতে পারেন। এসব ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বিবেচনা না করে সরাসরি সর্বোচ্চ জরিমানা আরোপ করা উচিত নয়।
বর্তমানে অনলাইন আয়কর রিটার্ন ব্যবস্থার সঙ্গে ব্যাংক, জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য যুক্ত থাকায় কর কর্মকর্তারা করদাতার আয়, সম্পদ ও বিনিয়োগ সম্পর্কে সহজেই তথ্য যাচাই করতে পারছেন। এর ফলে কর ফাঁকি শনাক্ত করা সহজ হলেও অনেক করদাতা অভিযোগ করেছেন, পুরোনো তথ্যের সঙ্গে বর্তমান তথ্যের সামান্য পার্থক্য থাকলেও তারা নোটিশ ও জরিমানার মুখোমুখি হচ্ছেন।
একজন করদাতা জানান, আগে অনেক কর পরামর্শদাতা সব আয়ের উৎস প্রকাশ না করার পরামর্শ দিতেন। কিন্তু এখন অনলাইন রিটার্নে সব তথ্য জমা দেওয়ার পর আগের তথ্যের সঙ্গে পার্থক্য দেখা দিলে অনেকেই সমস্যায় পড়ছেন।
এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন নির্দেশনার উদ্দেশ্য হলো করদাতা ও কর কর্মকর্তাদের উভয়ের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করা। তার মতে, কর কর্মকর্তারাও অনেক সময় আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে অনিচ্ছাকৃত ভুলের ক্ষেত্রেও জরিমানা দিতে বাধ্য হন। নতুন নির্দেশনার ফলে তারা এখন পরিস্থিতি বিবেচনা করে যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (BUILD)-এর চেয়ারপারসন আবুল কাসেম এনবিআরের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তার মতে, করদাতা ও কর কর্মকর্তাদের মধ্যে আস্থার ঘাটতি দেশের কর ব্যবস্থার উন্নয়নে বড় বাধা। ছোটখাটো তথ্যের ঘাটতি বা অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে অনুমানের ভিত্তিতে জরিমানা আরোপ করা উচিত নয়।
তিনি আরও বলেন, কর কর্মকর্তাদের মৌলিক হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন, যাতে তারা কর ফাইল আরও যুক্তিসংগত ও বাস্তবভিত্তিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারেন। পাশাপাশি নিয়মিত কর প্রদানকারী করদাতাদের জন্য আলাদা সুবিধা বা স্বীকৃতির ব্যবস্থা করা হলে কর দেওয়ার সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হবে।
এনবিআরের নতুন নির্দেশনা মূলত নিশ্চিত করতে চায় যে, কোনো করদাতা যেন পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া শাস্তির মুখোমুখি না হন। একই সঙ্গে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে আয় বা সম্পদ গোপন করবেন, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ করদাতা ও কর প্রশাসনের মধ্যে আস্থা বাড়াবে এবং দেশের কর ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, ন্যায়ভিত্তিক ও কার্যকর করতে সহায়তা করবে।

