বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাতকে ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি শিল্পে পরিণত করার লক্ষ্য রয়েছে। তবে সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীর দীর্ঘদিনের পরিবেশগত সমস্যা ও কমপ্লায়েন্স সংকট সমাধান করা না গেলে এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (SANEM) এবং ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (FLAXA)-এর আয়োজিত এক নীতিসংলাপে দেশের চামড়া শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে উদ্যোক্তারা পরিবেশগত মান নিশ্চিত করা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নীতিগত সংস্কারের ওপর জোর দেন।
সাভারের সিইটিপি নিয়ে বড় উদ্বেগ
চামড়া শিল্পের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (Central Effluent Treatment Plant বা CETP)।
প্রতিদিন ২৫ হাজার ঘনমিটার তরল বর্জ্য পরিশোধনের সক্ষমতা নিয়ে তৈরি করা হলেও বর্তমানে সিইটিপির কার্যকর সক্ষমতা প্রায় ১৪ হাজার থেকে ১৮ হাজার ঘনমিটারে নেমে এসেছে বলে বিভিন্ন মূল্যায়নে উঠে এসেছে।
সমস্যা আরও তীব্র হয় কোরবানির ঈদের সময়। তখন ট্যানারি বর্জ্যের পরিমাণ বেড়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার ঘনমিটারে পৌঁছে যায় বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির।
তিনি বলেন, বর্তমান সিইটিপিতে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ কারণে সরকার স্বচ্ছ দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন একটি সিইটিপি নির্মাণ এবং একটি আন্তর্জাতিক মানের অপারেটর নিয়োগের পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি বিদ্যমান সিইটিপির সক্ষমতা উন্নয়নের উদ্যোগও নেওয়া হবে।
বড় ট্যানারিতে নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে বড় ট্যানারিগুলোকে নিজস্ব বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার প্রয়োজনীয় কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা দেবে।
অন্যদিকে ছোট ট্যানারিগুলোকে নির্ধারিত পরিবেশগত মান পূরণ করে কেন্দ্রীয় সিইটিপি ব্যবহার করতে হবে এবং এজন্য নির্ধারিত ফি প্রদান করতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান পরিবেশগত নিয়ম মেনে চলতে পারবে না বা ব্যবসা চালিয়ে যেতে সমস্যায় পড়বে, তাদের জন্য খাত থেকে সম্মানজনকভাবে বের হওয়ার সুযোগ তৈরি করা হবে।
তবে যারা এই খাতে থাকবে, তাদের অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানের কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (LWG) সনদ অর্জন করতে হবে।
শুধু সিইটিপি সংস্কার করলেই হবে না
SANEM-এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, চামড়া শিল্পের উন্নয়নে শুধু সিইটিপি ঠিক করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। পুরো ব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত শাসন এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
তিনি সিইটিপির কারিগরি পর্যালোচনা, জরুরি ভিত্তিতে অর্থায়ন, স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং সেই প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশের প্রস্তাব দেন।
তার মতে, পরিবেশ দূষণকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি LWG এবং জেডডিএইচসি (Zero Discharge of Hazardous Chemicals) মানদণ্ড পূরণের সঙ্গে সরকারি প্রণোদনা যুক্ত করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, সরকার, শিল্প মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি পৃথক চামড়া শিল্প উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা যেতে পারে। পাশাপাশি আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের জন্য স্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা প্রয়োজন।
অবকাঠামো ও পরিবেশগত নিয়ম নিয়ে উদ্যোক্তাদের অভিযোগ
বে গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউর রহমান বলেন, শুধু সিইটিপি সংস্কার করলেই চামড়া শিল্পের সব সমস্যা দূর হবে না।
তিনি বলেন, বর্তমান পরিবেশগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মানের LWG সনদ অর্জনে সমস্যায় পড়ছে।
সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীতে রাস্তার দুরবস্থা, গ্যাস সংকট এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উচ্চ ব্যয়ও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, তার প্রতিষ্ঠান গত বছর শুধু কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয় করেছে।
জিয়াউর রহমান আরও বলেন, আমদানি করা কাঁচা চামড়া দিয়ে তৈরি পণ্যের জন্যও রপ্তানি সুবিধা বাড়ানো এবং বিদেশি ট্যানারি প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করা প্রয়োজন।
কাঁচা চামড়া নয়, তৈরি পণ্য রপ্তানিতে জোর
বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম জুতা উৎপাদনকারী দেশ হলেও রপ্তানি সম্ভাবনার বড় অংশ এখনো কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
দেশ বর্তমানে ১০৫টির বেশি দেশে প্রায় ১৭৬ কোটি ডলারের চামড়া ও জুতাজাত পণ্য রপ্তানি করছে। তবে এর বড় অংশের মূল্য সংযোজন হচ্ছে বিদেশে।
প্রায় ৬৫ শতাংশ চামড়া এখনো ক্রাস্ট লেদার হিসেবে রপ্তানি হয়, অর্থাৎ এটি সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াজাত না করেই বিদেশে পাঠানো হয়।
মন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে কাঁচা বা আধা-প্রস্তুত চামড়া রপ্তানি থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের ভেতরেই সম্পূর্ণ প্রস্তুত চামড়াজাত পণ্য তৈরি করা গেলে কর্মসংস্থান ও আয়—দুই ক্ষেত্রেই বড় সুযোগ তৈরি হবে।
সরকার ব্যবসা ও কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেবে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি জাপানের সঙ্গে বাজার সম্প্রসারণ নিয়েও আলোচনা করা হবে।
নন-লেদার জুতায় বড় সম্ভাবনা
FLAXA সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, চামড়া শিল্পের সম্ভাবনা নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা হলেও বাস্তবে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।
তিনি বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, দুর্বল অবকাঠামো এবং সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীর বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা এখনো শিল্পের বিকাশে বাধা হয়ে আছে।
তবে নন-লেদার ফুটওয়্যার খাতে বাংলাদেশের জন্য বড় সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে মোট রপ্তানির প্রায় ৩১ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। কিন্তু বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অংশ মাত্র ০.৫ শতাংশেরও কম।
FLAXA-এর হিসাব অনুযায়ী, এই অংশ ৫ শতাংশে উন্নীত করা গেলে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত রপ্তানি আয় সম্ভব।
অতিরিক্ত কাগজপত্র ও নীতিগত জটিলতায় বাধাগ্রস্ত বিনিয়োগ
রপ্তানিকারকদের আরেকটি বড় অভিযোগ হলো জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া।
তাদের দাবি, বাংলাদেশে একটি ব্যবসা পরিচালনা করতে যেখানে ২৩টি সনদ ও অনুমোদন প্রয়োজন এবং প্রায় ১৯০টি নথি প্রস্তুত করতে হয়, সেখানে ভিয়েতনামে একই ধরনের প্রক্রিয়ায় প্রয়োজন হয় মাত্র চারটি নথি।
জেনিস গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসির খান বলেন, অতিরিক্ত লাইসেন্সিং জটিলতা এবং ঘন ঘন নীতির পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে।
তিনি জানান, নতুন যন্ত্রপাতির জন্য বন্ড লাইসেন্স পেতে এপ্রিল মাসে আবেদন করলেও পাঁচ মাস পরও অনুমোদন পাওয়া যায়নি।
এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির আহ্বান
অস্ট্রেলিয়ার ডেপুটি হাইকমিশনার ক্লিনটন পোবকে বলেন, বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাণিজ্য সুবিধা কমে যাওয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে প্রস্তুতি নিতে হবে।
তিনি বলেন, উত্তরণ ঠেকানো যাবে না। এখন প্রয়োজন হলো প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা।
চামড়া শিল্পের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা নয়, বরং দীর্ঘদিনের বাধাগুলো অতিক্রম করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। পরিবেশগত মান নিশ্চিত করা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নীতিগত সহজীকরণ করা গেলে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প বৈশ্বিক বাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে।
আমি লেখাটিকে ব্লগ প্রকাশের উপযোগী করে পুনর্গঠন করেছি। মূল সংবাদধর্মী ভাষা পরিবর্তন করে পাঠকের জন্য সহজ, স্বাভাবিক ও আকর্ষণীয় বর্ণনাশৈলী ব্যবহার করা হয়েছে, তবে সব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও পরিসংখ্যান বজায় রাখা হয়েছে।

