মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের ওপরও। আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি কিনতে সরকারের ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। চলমান সংকট দীর্ঘ হলে চলতি অর্থবছরে এলএনজি ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় তিনগুণ বেড়ে ৪০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তিতে বিঘ্নের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে সরবরাহ সংকটও তৈরি হয়েছে। ফলে বাংলাদেশকে আবারও খোলা বাজার বা তাৎক্ষণিক ক্রয় ব্যবস্থার ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে, যেখানে দাম তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।
গত বছর সরকার এলএনজি ভর্তুকির জন্য শুরুতে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকায়। এবার পরিস্থিতি আরও কঠিন হওয়ায় জ্বালানি মন্ত্রণালয় প্রাথমিকভাবে ৪০ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব দিয়েছে, যা গত বছরের চূড়ান্ত ব্যয়ের তুলনায় প্রায় তিনগুণ।
তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এটি বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় করা একটি প্রাথমিক অনুমান। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই সরকার এলএনজি ভর্তুকি বাবদ প্রায় ৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে।
এই বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামলাতে সরকার আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর সহায়তা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থ সহায়তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। পাশাপাশি কম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থ ব্যয় সাময়িকভাবে সীমিত করার বিষয়ও বিবেচনা করা হচ্ছে।
শুধু গ্যাস নয়, বিদ্যুৎ খাতেও ভর্তুকির চাপ বাড়ছে। বিদ্যুৎ বিভাগ আশঙ্কা করছে, চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ ভর্তুকির পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। গত বছর যেখানে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ৪৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা, সেখানে এবারের প্রাথমিক হিসাব ছিল ৩৬ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের মূল দুর্বলতা আবারও সামনে এসেছে আমদানিনির্ভরতার কারণে। কাতারের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তি ২০২৬ সাল পর্যন্ত চালু থাকার কথা থাকলেও আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে তা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কাতারসহ বাংলাদেশের তিনটি বড় এলএনজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান চুক্তিগত দায়িত্ব পালনে বিশেষ পরিস্থিতির কথা জানিয়েছে।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে যে অতিরিক্ত আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা একটি দেশের অর্থনীতিকে কতটা ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ২৮ ডলারের বেশি দামে প্রতি একক এলএনজি কেনার অনুমোদন দিয়েছে, যা ২০২২ সালের পর সবচেয়ে ব্যয়বহুল। শুধু একটি চালানের মূল্যই ১০ কোটি ডলারের বেশি।
জ্বালানি অর্থনীতি বিশ্লেষক শফিকুল আলমের মতে, প্রতি একক এলএনজির দাম যদি ২৮ ডলারের কাছাকাছি থাকে, তাহলে পুনঃগ্যাসীকরণ ও টার্মিনাল খরচ বাদ দিয়েও এর দাম প্রতি ঘনমিটারে ১১৮ টাকার বেশি পড়ে। কিন্তু পেট্রোবাংলা যে দামে গ্যাস সরবরাহ করে, তার তুলনায় এই খরচ অনেক বেশি হওয়ায় সরকারকে প্রতি ঘনমিটারে ৯৫ টাকার বেশি ভর্তুকি দিতে হতে পারে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব এখন দেশের বাস্তব অর্থনীতিতেও পড়ছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান জিরো কার্বন অ্যানালিটিকসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ কমেছে। বিশেষ করে জুলাই ও আগস্টে আমদানি ৮৩ শতাংশ কমে ৬ লাখ ৩০ হাজার টন থেকে নেমে এসেছে ১ লাখ ১০ হাজার টনে।
তবে আমদানি কমলেও ব্যয় কমেনি। বরং উচ্চমূল্যের কারণে খরচ আরও বেড়েছে। জ্বালানি মূল্য যদি বছরের বাকি সময়ও একই থাকে, তাহলে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে। এই অতিরিক্ত ব্যয় দেশের বাণিজ্য ঘাটতির প্রায় এক-দশমাংশের সমান হতে পারে, যা টাকার বিনিময় হার, মূল্যস্ফীতি এবং ঋণের খরচের ওপর চাপ তৈরি করবে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৬৪ শতাংশ গ্যাসনির্ভর হওয়ায় বিদ্যুৎ খাতও বড় ঝুঁকিতে রয়েছে। গত ১১ আগস্ট বিদ্যুৎ ঘাটতি ৩ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াটে পৌঁছেছিল, যা দেশের মোট চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলের অনেক এলাকায় প্রতিদিন ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
শিল্প খাতেও এর বড় প্রভাব পড়েছে। দেশের সাতটি বড় সার কারখানার মধ্যে ছয়টি পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে অথবা উৎপাদন কমিয়েছে। একই সঙ্গে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পেও উৎপাদন কমেছে। সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্প এলাকায় উৎপাদন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, পরিস্থিতি যাই হোক, বাংলাদেশকে এলএনজি আমদানি করতেই হবে। তবে এর ফলে সরকারকে হয় বেশি দামে জ্বালানি সরবরাহ করতে হবে, নয়তো শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন বন্ধ রেখে ক্ষতির মুখে পড়বে।
সংকট মোকাবিলায় সরকার আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের জন্য কয়েকটি তাৎক্ষণিক এলএনজি চালান অনুমোদন করেছে। পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও ওমান থেকে আরও আটটি চালান সংগ্রহ করা হয়েছে। এছাড়া ভারত থেকেও ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে ২০২৬ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১১৭টি এলএনজি চালান আনার চুক্তিও করেছে বাংলাদেশ।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে শুধু আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করা অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। জ্বালানি বাজারের বর্তমান দাম অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি ব্যয় ২৮০ কোটি ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণের আগে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনা করা জরুরি। কারণ ২০৩০ সালের মধ্যে প্রস্তাবিত সব টার্মিনাল চালু হলে এবং সেগুলো ৬৫ শতাংশ সক্ষমতায় ব্যবহার করা হলে এলএনজি আমদানি বেড়ে প্রায় ৭৩০ বিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে।
যদি প্রতি একক এলএনজির দাম ১২ ডলার থাকে, তাহলে বছরে বাংলাদেশের ব্যয় হতে পারে প্রায় ৮৫০ কোটি ডলার। আর দাম ২০ ডলারে উঠলে এই ব্যয় ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের অর্থনীতিতে কত বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শুধু জরুরি আমদানি নয়, দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিকল্প শক্তির ব্যবহার বাড়ানো এখন সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

