দেশে ওষুধের দাম বাড়ার প্রবণতা দিন দিন সাধারণ মানুষের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় এখন অনেক পরিবারের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আয় না বাড়লেও নিয়মিত ওষুধের খরচ বাড়তে থাকায় অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সংসারের অন্য প্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে হচ্ছে।
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কিডনি সমস্যা কিংবা অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী রোগের ওষুধ কিনতে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ফার্মেসিতে ভিড় করছেন। কিন্তু ওষুধের দাম বাড়ার পাশাপাশি দেশের ওষুধ বিক্রির ব্যবস্থাপনা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। বিভিন্ন সময়ে অনেক ফার্মেসির বিরুদ্ধে নকল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির অভিযোগ উঠেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করছে।
গবেষণা সংস্থা ‘রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট’-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেশের স্বাস্থ্য ব্যয়ের একটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশ মানুষকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়। এর মধ্যে প্রায় ৬৪ শতাংশ ব্যয় হয় শুধু ওষুধ কেনার পেছনে।
এই বাড়তি চিকিৎসা ব্যয়ের সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষের ব্যয়যোগ্য আয়ের ২০ শতাংশ পর্যন্ত চলে যাচ্ছে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ কিনতে। ফলে খাদ্য, শিক্ষা বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমিয়ে অনেক পরিবারকে চিকিৎসার খরচ চালাতে হচ্ছে।
এর মধ্যেই আবার ওষুধের দাম বাড়ার নতুন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি জানিয়েছে, দেশে চলমান জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ভবিষ্যতে ওষুধের দাম সমন্বয় করার প্রয়োজন হতে পারে।
গত ২৪ আগস্ট রাজধানীর তেজগাঁওয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, গ্যাস সংকট ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ওষুধ কারখানাগুলোকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান জেনারেটর ও ডিজেলের ওপর নির্ভর করছে। যেখানে সরকারি বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট খরচ প্রায় ১৫ টাকা, সেখানে জেনারেটরের মাধ্যমে একই বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হচ্ছে প্রায় ৪২ টাকা।
উৎপাদন খরচ বাড়লেও দীর্ঘদিন ধরে ওষুধের দাম সেই অনুপাতে সমন্বয় করা হয়নি বলে দাবি করছে উৎপাদকরা। এর প্রভাবে অতিপ্রয়োজনীয় ১১৭টি ওষুধের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে শিল্পসংশ্লিষ্টরা। তাদের আশঙ্কা, জ্বালানি সংকট ও কাঁচামালের বাড়তি দাম অব্যাহত থাকলে ওষুধের দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প থাকবে না।
দেশে ফার্মেসির সংখ্যাও ব্যাপক। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে লাইসেন্সধারী ফার্মেসির সংখ্যা ২ লাখ ১৬ হাজার ৭৯১টি। তবে অনলাইন ডেটাবেসে তালিকাভুক্ত রয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ২৯৩টি ফার্মেসি। বাকি ৫৫ হাজার ৪৯৮টি ফার্মেসির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য নেই।
অন্যদিকে, ফার্মেসির সংখ্যা বাড়লেও এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়মিত নজরদারি কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পর্যাপ্ত তদারকি না থাকলে নকল, নিম্নমানের বা মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বাজারে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে।
ওষুধের মূল্যবৃদ্ধির বাস্তব চিত্র দেখা যায় সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতায়। রাজধানীর বাসাবোর বাসিন্দা চায়না পারভীন জানান, তিনি ও তার স্বামী দুজনই উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ইনসুলিন ব্যবহার করেন। দুই বছর আগে তাদের মাসিক ওষুধ খরচ ছিল প্রায় সাড়ে ৩ হাজার টাকা। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ হাজার টাকায়। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে খরচ বেড়েছে প্রায় ৪৩ শতাংশ, অথচ তাদের আয় বাড়েনি।
মিরপুরের বাসিন্দা হানিফ মিয়াও একই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। পেশায় তিনি একটি বাসার নিরাপত্তাকর্মী। চিকিৎসকের পরামর্শে ফ্যাটি লিভার ও উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ শুরু করলেও অর্থের অভাবে নিয়মিত ওষুধ চালিয়ে যেতে পারেননি।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফার্মেসি ঘুরে দেখা গেছে, ডায়াবেটিসের ওষুধ, অ্যান্টিবায়োটিক, শিশুদের ওষুধসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পণ্যের দাম বেড়েছে। কয়েকটি ফার্মেসির তথ্য অনুযায়ী, ডায়াবেটিসের একটি ওষুধের দাম আগে যেখানে ৪০ টাকা ছিল, এখন তা বেড়ে ৫০ টাকা হয়েছে। কিছু অ্যান্টিবায়োটিকের দামও আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এ ছাড়া অ্যাজিথ্রোমাইসিন ৫০০ মিলিগ্রামের দাম দেড় বছর আগে যেখানে ৩০ টাকা ছিল, এখন তা ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সাধারণ ব্যথানাশক ওষুধের দামও বেড়েছে। আগে একটি জনপ্রিয় ব্যথার ওষুধের এক পাতার দাম ৮ টাকা থাকলেও এখন তা ১২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ, স্যালাইন, সিরাপসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বেড়েছে।
তবে একই ওষুধের দাম ফার্মেসিভেদে ভিন্ন হতে দেখা গেছে। সাধারণ দোকান ও বড় ফার্মেসির মধ্যে একই পণ্যের দামে পার্থক্য রয়েছে। এতে ভোক্তাদের বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
ওষুধ ব্যবসায়ীদের মতে, দাম বাড়লেও মানুষের ওষুধ কেনার প্রয়োজন কমছে না। কারণ জীবন রক্ষাকারী ওষুধ অনেকের জন্য বিকল্পহীন। ফলে বাধ্য হয়েই বেশি দামে ওষুধ কিনতে হচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের ওষুধের বাজারও বড় আকার ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে দেশের অভ্যন্তরীণ ওষুধ বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৯ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা, যা প্রায় ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের সমান।
তবে ওষুধের দাম বাড়ার ঘটনা নতুন নয়। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ৫৩টি ব্র্যান্ডের ওষুধের দাম বাড়ানো হয়েছিল। ২০২৩ সালেও কিছু ওষুধের দাম বৃদ্ধির অনুমতি দেওয়া হয়। ২০২৪ সালে বাজারে কয়েক ধরনের ওষুধের দাম কোম্পানিগুলোর নিজস্ব সিদ্ধান্তে বেড়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। অন্তত ৫০ ধরনের ওষুধের দাম ২০ শতাংশ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে ওষুধের ব্যবহার বাড়ছে, কিন্তু একই সঙ্গে বাড়ছে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ গ্রহণের প্রবণতাও। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণের অভাব ভবিষ্যতে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অনেক এলাকায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ফার্মেসি থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কেনার প্রবণতা রয়েছে, যা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর সংখ্যা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে ওষুধের দাম রাখতে সরকারকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি ফার্মেসি তদারকি, ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
কারণ ওষুধ কোনো বিলাসপণ্য নয়, এটি মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম প্রয়োজনীয় উপাদান। তাই ওষুধের মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমানো এবং নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করা এখন জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

