শিল্পায়ন বাড়াতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক শিল্পনগরী গড়ে তুলছে বিসিক। জমি অধিগ্রহণ, প্লট উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ করা হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। কিন্তু প্লট তৈরি শেষে যখন উদ্যোক্তা খোঁজার পালা আসে, তখনই বিপত্তি। বারবার বিজ্ঞপ্তি দিয়েও মিলছে না বিনিয়োগকারী। বিসিকের নিজস্ব তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে ১৯টি শিল্পনগরী ও শিল্পপার্কের ৯৭৫টি প্লট বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এক বছর পর সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৬৫টিতে। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে বরাদ্দের জন্য রাখা প্লটের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৭১ শতাংশ। অথচ আগের বছরের বিজ্ঞপ্তিতে থাকা বিপুলসংখ্যক প্লট এখনো উদ্যোক্তার অপেক্ষায় পড়ে আছে।
মুন্সীগঞ্জের বৈদ্যুতিক পণ্য উৎপাদন ও হালকা প্রকৌশল শিল্পনগরীটির চিত্র সবচেয়ে করুণ। ২০২১ সালে ৩০৯ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে ওঠা এই শিল্পনগরীর ৩৬১টি প্লটের মধ্যে মাত্র ২৯টি বরাদ্দ দেওয়া গিয়েছিল। বাকি ৩৩২টি প্লট নিয়ে ২০২৫ সালে আবার বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। এক বছরে সেখানে নতুন করে বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ৬টি প্লট। এ বছরও ৩২৬টি প্লট বরাদ্দযোগ্য রাখা হয়েছে। প্রতি একর জমির দাম ৯ কোটি ১৬ লাখ টাকা, এই উচ্চমূল্য আর যোগাযোগ অবকাঠামোর ঘাটতিই মূলত উদ্যোক্তাদের পিছিয়ে দিচ্ছে।
রাজশাহী-২ বিসিক শিল্পনগরীর অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। ২০২২ সালে স্থাপিত এই শিল্পনগরীতে গত বছর ২৩৭টি প্লট বরাদ্দের জন্য রাখা হয়েছিল। এক বছরে বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ২৮টি। এ বছরও ২০৯টি প্লট উদ্যোক্তার অপেক্ষায়। রাজশাহী সব সময়ই শিল্পের দিক থেকে পিছিয়ে থাকা অঞ্চল। বড় শিল্পগ্রুপগুলো যেমন স্কয়ার গ্রুপ বা নাবিল গ্রুপ বিসিকের প্লটের চেয়ে বেসরকারি জমি কিনে কারখানা স্থাপনে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপও পাটকল ইজারায় বেশি আগ্রহী।
সুনামগঞ্জে ৩১টি প্লটের মধ্যে বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ২টি। শ্রীমঙ্গলে ৬৫টির মধ্যে ৬টি। বরগুনায় ২৩টির মধ্যে ৮টি। চুয়াডাঙ্গায় ৫১টির মধ্যে ১৪টি। রাঙ্গামাটি ও মৌলভীবাজার শিল্পনগরীতে ৪টি করে মোট ৮টি প্লটের মধ্যে একটিও বরাদ্দ দেওয়া যায়নি। অথচ কিশোরগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, লালমনিরহাট, পটুয়াখালী ও ভোলা শিল্পনগরীর প্রায় সব প্লটই উদ্যোক্তারা নিয়ে নিয়েছেন। অর্থাৎ, সব জেলার চিত্র এক নয়। কোনো শিল্পনগরী সফল, কোনোটি পুরোপুরি ফ্লপ।
বিসিকের তথ্য বলছে, জুন ২০২৬ পর্যন্ত মোট ১৩ হাজার ৩৬৪টি প্লটের মধ্যে ১ হাজার ৬৬৭টি প্লট ফাঁকা রয়েছে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৩টি। অর্থাৎ, ফাঁকা প্লটের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বিসিকের পরিচালক কাজী নজরুল ইসলাম স্বীকার করেছেন, বিগত সময়ে বেশ কিছু প্রকল্পে রাজনৈতিক বিবেচনা ছিল, যা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকট, ডলারের উচ্চমূল্য, এলসি খোলায় জটিলতা এবং জ্বালানি সংকটও বিনিয়োগে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুধু উদ্যোক্তার অভাবই নয়, প্লটের দামও বড় বাধা। মুন্সীগঞ্জের মতো জায়গায় প্রতি একর জমির দাম ৯ কোটি টাকার বেশি। অথচ যোগাযোগ ব্যবস্থা তেমন উন্নত নয়। ফলে উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে চান না। বিসিকের নতুন উদ্যোগগুলোর মধ্যে সিরাজগঞ্জ শিল্পপার্ক কিছুটা ব্যতিক্রম। যমুনা সেতুর কাছে হওয়ায় সড়ক, নৌ ও রেল যোগাযোগের ভালো সুবিধা রয়েছে। সেখানে ৫৫৭টি প্লট বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা বিসিকের একক সবচেয়ে বড় বরাদ্দ।
শিল্পায়নের স্বপ্ন নিয়ে গড়া এসব শিল্পনগরী যদি এভাবেই পড়ে থাকে, তাহলে কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ বৃথা যাবে। প্রয়োজন জমির দাম যৌক্তিককরণ, যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা। অন্যথায়, বারবার বিজ্ঞপ্তি দিয়েও ফাঁকা প্লট পূরণ করা যাবে না।

