বিশেষ বিশ্লেষণ
দেশের বিনিয়োগ-সচেতন মানুষের মধ্যে একটা কথা প্রায়ই শোনা যায়, একসাথে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করার চেয়ে প্রতি মাসে অল্প অল্প করে নিয়মিত বিনিয়োগ করাই নাকি বেশি লাভজনক। কথাটা শুনতে আরামদায়ক, এবং মিউচুয়াল ফান্ড কোম্পানিগুলোর বিজ্ঞাপনেও এটাই বারবার তুলে ধরা হয়। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি, ভ্যানগার্ড, দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার বাজারের প্রকৃত পরিসংখ্যান খতিয়ে দেখে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, তা এই জনপ্রিয় ধারণাকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করে। গণিতের হিসাবে, বেশিরভাগ সময়ই আসলে জেতে এককালীন বিনিয়োগ। তাহলে প্রশ্ন হলো, যদি অঙ্কের হিসাবে ছোট অঙ্কের নিয়মিত বিনিয়োগ পিছিয়ে থাকে, তাহলে কেন এটাই সাধারণ মানুষের জন্য বাস্তবে বেশি কার্যকর কৌশল হয়ে ওঠে? উত্তরটা লুকিয়ে আছে গণিত আর মানুষের আচরণের মাঝখানের ফারাকে।
গণিতের হিসাবে আসলে কে জেতে?
ভ্যানগার্ডের গবেষকরা ১৯২৬ সাল থেকে শুরু করে দশ বছরের একের পর এক রোলিং পিরিয়ড বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, একজন বিনিয়োগকারী যদি হাতে থাকা পুরো টাকা একসাথে বাজারে ঢেলে দেন, তাহলে সেই কৌশল বারো মাস ধরে ধাপে ধাপে বিনিয়োগ করার তুলনায় প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সময়েই ভালো ফল দিয়েছে, গড়ে বছরে দেড় থেকে সোয়া দুই শতাংশ পয়েন্ট বেশি রিটার্ন নিয়ে। আর বারো মাসের বদলে যদি কেউ ছত্রিশ মাস ধরে ধাপে ধাপে বিনিয়োগ করেন, তাহলে এককালীন বিনিয়োগের জয়ের হার বেড়ে প্রায় নব্বই শতাংশে গিয়ে ঠেকে। এর পেছনের যুক্তিটা আসলে বেশ সহজ; শেয়ারবাজার দীর্ঘমেয়াদে সাধারণত ঊর্ধ্বমুখী থাকে, তাই যে টাকাটা বিনিয়োগ না করে হাতে বসিয়ে রাখা হয়, সেটা প্রতিদিনই বাজারের গড় প্রবৃদ্ধি থেকে বঞ্চিত থাকে। অর্থাৎ নিয়মিত অল্প অল্প বিনিয়োগ আসলে ঝুঁকি এড়ানোর একটা কৌশল নয়, বরং ভ্যানগার্ডের ভাষায় এটা কেবল ঝুঁকি নেওয়াকে পরে ঠেলে দেওয়া। বিশুদ্ধ পাটিগণিতের বিচারে, যার হাতে বড় অঙ্কের টাকা প্রস্তুত আছে, তার জন্য সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত হলো সেটা একসাথে বিনিয়োগ করে ফেলা।
তাহলে মানুষ কেন তবু প্রতি মাসে অল্প অল্প করেই বিনিয়োগ করে?
এখানেই আসল প্যাঁচটা। ভ্যানগার্ডের এই হিসাব একটা কল্পনার বিনিয়োগকারীকে ধরে নিয়ে চলে, যার হাতে বিনিয়োগযোগ্য বড় অঙ্কের টাকা আগে থেকেই জমা আছে, এবং বাজার পড়ে গেলেও যে মানসিকভাবে স্থির থেকে বিনিয়োগ ধরে রাখতে পারবে। বাস্তবে এই দুটো শর্তই খুব কম মানুষের ক্ষেত্রে সত্যি হয়। মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ড্যালবার তাদের সবশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, ২০২৪ সালে যেখানে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক প্রায় পঁচিশ শতাংশ রিটার্ন দিয়েছে, সেখানে গড়পড়তা ইক্যুইটি বিনিয়োগকারী পেয়েছেন মাত্র সাড়ে ষোলো শতাংশ; প্রায় সাড়ে আট শতাংশ পয়েন্টের এই ফারাক গত এক দশকের অন্যতম বড় ব্যবধান। এই ঘাটতির কারণ বাজারের খারাপ পারফরম্যান্স নয়, বরং বিনিয়োগকারীর নিজের সিদ্ধান্ত, বাজার চাঙা হওয়ার পর হুড়মুড়িয়ে ঢোকা, আবার পড়ে যাওয়ার সময় আতঙ্কে বেরিয়ে যাওয়া। অর্থাৎ কাগজে-কলমে যে কৌশল সবচেয়ে ভালো ফল দেয়, বাস্তবে সেই কৌশল অনুসরণ করার মানসিক জোর বেশিরভাগ মানুষের থাকে না। আর ঠিক এই জায়গাতেই ছোট অঙ্কের নিয়মিত বিনিয়োগের আসল শক্তি, এটা রিটার্ন বাড়ায় না ঠিকই, কিন্তু ভুল সময়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ কমিয়ে দেয়।
২০১০ সালের ধস যা শিখিয়ে গেছে
এই তত্ত্ব শুধু বিদেশি বাজারের গল্প নয়, দেশের শেয়ারবাজারের ইতিহাসেই এর প্রমাণ মেলে। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তৎকালীন সাধারণ মূল্যসূচক (ডিজেন) প্রায় নয় হাজার পয়েন্টের কাছাকাছি গিয়ে ঠেকেছিল, পুরো বছরে সূচক বেড়েছিল প্রায় আশি শতাংশ। কিন্তু এর পরের কয়েক মাসেই বাজার ভয়াবহভাবে ধসে পড়ে, আর পুরো ২০১১ সালে সূচক পড়ে যায় প্রায় সাড়ে ছত্রিশ শতাংশ। যে বিনিয়োগকারী সেই ডিসেম্বরের চূড়ায় দাঁড়িয়ে সারা জীবনের সঞ্চয় একসাথে ঢেলে দিয়েছিলেন, তার জন্য পরিণতি ছিল ভয়াবহ, অনেকে ঋণ করে শেয়ার কিনেছিলেন, আর বাজার পড়ে যাওয়ার পর বিক্রি করে বেরিয়ে আসারও উপায় ছিল না বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে। এই ঘটনা এখনো দেশের বিনিয়োগ ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা হিসেবে আলোচিত হয়। অথচ যিনি সেই একই সময়ে পুরো টাকাটা একবারে না ঢেলে প্রতি মাসে অল্প অল্প করে বিনিয়োগ করতেন, তিনি স্বাভাবিকভাবেই বাজারের চূড়ায় সব টাকা আটকে ফেলতেন না; কিছু টাকা ঢুকত চূড়ায়, কিছু ঢুকত ধসের পরে কম দামে, ফলে গড় ক্রয়মূল্য অনেকটাই সহনীয় থাকত। এটাই নিয়মিত বিনিয়োগের সবচেয়ে বাস্তব সুবিধা; এটা বাজারের সেরা দিন মিস করার ঝুঁকি যেমন কমায়, তেমনি সবচেয়ে খারাপ দিনে সর্বস্ব বাজি ধরার ঝুঁকিও কমিয়ে দেয়।
বাংলাদেশে ছোট অঙ্কের বিনিয়োগ যেভাবে কাজ করে
দেশে বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি অনুমোদিত মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর মাধ্যমে এখন মাত্র হাজার টাকা থেকেই মাসিক সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান বা এসআইপি শুরু করা যায়, ব্যাংক হিসাব থেকে সরাসরি অটো-ডেবিটের মাধ্যমে। এই পদ্ধতিতে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট টাকায় ফান্ডের প্রচলিত নিট সম্পদমূল্য বা এনএভি অনুযায়ী ইউনিট কেনা হয়; বাজার চড়া থাকলে কম ইউনিট, বাজার নরম থাকলে বেশি ইউনিট, যার ফলে দীর্ঘমেয়াদে গড় ক্রয়মূল্য নিজে থেকেই ভারসাম্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর সুবিধাও। বর্তমান আয়কর আইন অনুযায়ী যোগ্য বিনিয়োগের ওপর দশ শতাংশ কর রেয়াত পাওয়া যায়, যা মোট করযোগ্য আয়ের তিন শতাংশ কিংবা সাড়ে সাত লাখ টাকা; এই তিনটির মধ্যে যেটি সবচেয়ে কম, তার সীমা পর্যন্ত প্রযোজ্য। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, প্রচলিত মাসিক সঞ্চয় প্রকল্প বা ডিপিএসে বছরে সর্বোচ্চ এক লাখ কুড়ি হাজার টাকা পর্যন্তই এই রেয়াতের আওতায় আসে, যেখানে শেয়ার বা মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই সীমা অনেক বেশি প্রশস্ত। অর্থাৎ যিনি নিয়মিত মাসিক বিনিয়োগের অভ্যাস মিউচুয়াল ফান্ডের এসআইপির মাধ্যমে গড়ে তোলেন, তিনি একই সঙ্গে বাজারে টাকা ছড়িয়ে রাখার সুবিধা আর প্রচলিত সঞ্চয় প্রকল্পের চেয়ে বড় পরিসরে কর রেয়াতের সুবিধা, দুটোই একসঙ্গে পান।
আসল প্রশ্নটা তাহলে কোথায়?
তাহলে পুরো আলোচনার সারকথা কী দাঁড়ায়? ভ্যানগার্ডের গবেষণা যা প্রমাণ করে তা মিথ্যা নয়, হাতে বড় অঙ্কের প্রস্তুত টাকা থাকলে, এবং বাজার পড়লেও মাথা ঠান্ডা রাখার সামর্থ্য থাকলে, একসাথে বিনিয়োগ করাটাই সংখ্যার হিসাবে এগিয়ে থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের বেশিরভাগ চাকরিজীবী বা ব্যবসায়ী মানুষের হাতে কখনোই একসাথে বড় অঙ্কের অলস টাকা জমা থাকে না, তাদের আয় আসে মাসে মাসে, বেতনের মাধ্যমে। ফলে বাস্তব প্রশ্নটা কখনোই “এসআইপি নাকি লাম্প সাম” হয় না, বরং হয় “প্রতি মাসে নিয়মমাফিক বিনিয়োগ করা, নাকি বছরের পর বছর ফেলে রাখা টাকা কোনো এক অনির্দিষ্ট সময়ে একসাথে ঢালার আশা করা।” আর দ্বিতীয় পথে হাঁটা মানুষের বড় অংশই শেষ পর্যন্ত কখনোই সেই “আদর্শ মুহূর্ত” খুঁজে পান না; টাকা হয় খরচ হয়ে যায়, নয়তো নিষ্ক্রিয় সঞ্চয়ে পড়ে থেকে মূল্যস্ফীতির কাছে ক্ষয়ে যায়। এই বাস্তবতায় ছোট অঙ্কের নিয়মিত বিনিয়োগের আসল শক্তি অঙ্কের সৌন্দর্যে নয়, বরং শৃঙ্খলা তৈরিতে এবং একটিমাত্র ভুল সময়ের সিদ্ধান্তে সর্বস্ব বাজি ধরার ঝুঁকি এড়ানোয়। সময়ের সঙ্গে বাজারে থাকাটাই আসল কথা, বাজারের সেরা মুহূর্ত খুঁজে বের করার চেষ্টা নয়, এই নীতিই শেষ পর্যন্ত ছোট অঙ্কের নিয়মিত বিনিয়োগকে বেশিরভাগ সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ করে তোলে, যদিও তা সবসময় সবচেয়ে বেশি রিটার্নের পথ নাও হতে পারে।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

