বাজারে গিয়ে সবচেয়ে কম দামের জিনিসটা হাতে তুলে নেওয়ার একটা স্বাভাবিক টান সবার মধ্যেই থাকে; মনে হয়, এইতো টাকাটা বেঁচে গেল। কিন্তু অর্থনীতির একটা পুরনো ও বহুবার প্রমাণিত সত্য হলো, কেনার মুহূর্তে ট্যাগে লেখা দামটাই কোনো পণ্যের আসল দাম নয়। দুই মাসে ছিঁড়ে যাওয়া ছাতা, তিন মাসে বিগড়ে যাওয়া চার্জার কিংবা এক বছরেই লিক করতে থাকা রান্নার হাঁড়ির ঢাকনা; এসবের পেছনে একটাই বার্তা লুকিয়ে থাকে। সস্তায় কেনা মানেই সাশ্রয় নয়, বরং অনেক সময় সেটাই দীর্ঘমেয়াদে বেশি খরচের শুরু।
সস্তা বুটের গল্প, যা অর্থনীতিতে ‘দারিদ্র্যের প্রিমিয়াম’ হয়ে উঠল
এই ধারণাটা প্রথম নজরকাড়াভাবে সামনে আসে একটা উপন্যাসের চরিত্রের মুখ দিয়ে। ব্রিটিশ লেখক টেরি প্র্যাচেট তাঁর ‘মেন অ্যাট আর্মস’ উপন্যাসে ক্যাপ্টেন স্যাম ভাইমস নামের একটা চরিত্র তৈরি করেছিলেন, যে হিসাব করে দেখায়, একজোড়া ভালো চামড়ার বুট কিনতে লাগে পঞ্চাশ ডলার, আর সেটা টেকে দশ বছর। অথচ তার মাসিক আয়ে সেই বুট কেনার সামর্থ্য নেই, তাই তাকে কিনতে হয় দশ ডলারের বুট, যেটা এক-দুই মৌসুমেই পানি চুইয়ে অকেজো হয়ে যায়। দশ বছরের হিসাবে দেখা যায়, সস্তা বুট বারবার কিনতে গিয়ে তার খরচ হয়ে যায় একশ ডলার। দামি বুটের চেয়ে দ্বিগুণ, অথচ পা ভেজাই থেকে যায়। এই কাল্পনিক হিসাবটা এতটাই বাস্তবসম্মত যে অর্থনীতি ও দারিদ্র্য নিয়ে গবেষণায় এটি এখন ‘বুটস থিওরি অব সোশিও-ইকোনমিক আনফেয়ারনেস’ নামে সিরিয়াসলি আলোচিত হয়। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে জ্বালানি খরচ ও দারিদ্র্য নিয়ে নীতিনির্ধারণী বিতর্কে এই তত্ত্বের রেফারেন্স নিয়মিত আসে। গল্পটা কল্পকাহিনি হলেও এর পেছনের গণিতটা নিছক কল্পনা নয়, বরং বাস্তব বাজার-আচরণের একটা নিখুঁত প্রতিচ্ছবি।
যে হিসাব ব্যাংক খাতায় সহজে ধরা পড়ে না
এই তত্ত্বকে শুধু গল্প বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই, কারণ বাস্তব জরিপেও এর প্রমাণ মিলেছে। যুক্তরাজ্যের ফেয়ার বাই ডিজাইন সংস্থা ও ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্সোনাল ফিন্যান্স রিসার্চ সেন্টারের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, কম আয়ের প্রায় ৯৫ শতাংশ পরিবারকেই কোনো না কোনো আকারে এই বাড়তি খরচ, যাকে তারা বলছেন ‘পভার্টি প্রিমিয়াম’ বহন করতে হয়, যার গড় পরিমাণ বছরে প্রায় তিনশো আশি পাউন্ড, আর সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এই অঙ্ক সাতশো ছত্রিশ পাউন্ড ছাড়িয়ে যায়। কারণ খুব সাধারণ, কম আয়ের মানুষ একসঙ্গে বেশি পরিমাণে কিছু কিনতে পারেন না, বার্ষিক কিস্তিতে বিমা বা বিল পরিশোধের সামর্থ্য থাকে না বলে মাসে মাসে বাড়তি চার্জ দিয়ে পরিশোধ করেন, আর দূরের বড় দোকানে যাওয়ার খরচ ও সময় জোগাড় করতে না পেরে পাড়ার ছোট দোকান থেকেই কিনতে বাধ্য হন, যেখানে নিত্যপণ্যের দাম গড়ে প্রায় তেরো শতাংশ বেশি থাকে। অর্থাৎ কম দামে কেনার সিদ্ধান্তটা অনেক সময় সিদ্ধান্তই নয়, সেটা পরিস্থিতির চাপ আর সেই চাপই ঘুরিয়ে বাড়তি খরচ হয়ে ফিরে আসে।
দামের আড়ালে আরেকটা দাম লুকিয়ে থাকে
ব্যবসা ও ফাইন্যান্সের জগতে এই বাস্তবতাকে একটা নির্দিষ্ট নাম দেওয়া হয়েছে, যাকে বলা হয় ‘টোটাল কস্ট অব ওনারশিপ’ বা মালিকানার সামগ্রিক খরচ। এই হিসাব পদ্ধতিতে শুধু কেনার সময়কার দামটাই ধরা হয় না, বরং সেই পণ্য ব্যবহার করতে গিয়ে যত রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত, বদলে ফেলার খরচ এবং শেষে ফেলে দেওয়ার খরচ; সবকিছু যোগ করে একটা প্রকৃত হিসাব বের করা হয়। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো যন্ত্রপাতি বা সফটওয়্যার কেনার আগে এই হিসাবটাই কষে দেখে, কারণ তাদের অভিজ্ঞতা বলে, কম দামের যন্ত্র প্রায়ই বেশি রক্ষণাবেক্ষণ চায়, বেশি সময় বিকল থাকে, আর তাতে উৎপাদন ক্ষতি হয় দামের ফারাকের চেয়েও বেশি। ব্যক্তিগত জীবনেও এই একই নীতি খাটে, একটা পুরোনো গাড়ি সস্তায় কিনে ফেললেও যদি সেটা ঘন ঘন গ্যারেজে যেতে থাকে, তাহলে কয়েক মাসেই সেই সাশ্রয় উবে যায়। তাই কোনো পণ্যের আসল মূল্য বিচার করতে হলে প্রশ্ন করতে হয়, এটা কতদিন টিকবে, কতবার সারাতে হবে, আর ব্যবহার বন্ধ হওয়ার পর এর কী হবে; শুধু দোকানে দাঁড়িয়ে দামের ট্যাগ দেখে সিদ্ধান্ত নিলে এই পুরো হিসাবটাই অগোচরে থেকে যায়।
আমাদের বাজারেও গল্পটা একই
এই সমস্যাটা শুধু বিদেশি গবেষণার পাতাতেই সীমাবদ্ধ নয়, দেশের বাজারেও এর প্রমাণ প্রায়ই সামনে আসে। সম্প্রতি বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন বা বিএসটিআই ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় মান উত্তীর্ণ হতে না পারায় বাজার থেকে দশটি পণ্য প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে একাধিক মসলা ও ঘি জাতীয় পণ্য, যেগুলোতে অতিরিক্ত অ্যাশ বা লবণের মাত্রা এবং মানহীন উপাদান পাওয়া গেছে। এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়, বরং নিয়মিতই ঘটে। আর প্রতিবার এর অর্থ দাঁড়ায়, ক্রেতা যে দামে পণ্যটা কিনেছেন, সেই দামের বিনিময়ে যা পাওয়ার কথা ছিল, তা তিনি আসলে পাননি। এখানে ক্ষতিটা শুধু টাকার নয়, স্বাস্থ্যেরও, আর সেই ক্ষতির অঙ্ক প্রাথমিক দামের চেয়ে অনেক বড়। বিএসটিআই নিজেই ক্রেতাদের পরামর্শ দিচ্ছে কেনার আগে মানচিহ্ন, লাইসেন্স নম্বর, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ যাচাই করে নিতে; যা প্রমাণ করে, দাম কম হলেই পণ্য নিরাপদ বা টেকসই, এই ধারণাটা আসলে একটা ভুল অনুমান, আর সেই ভুল অনুমানের মাশুল গুনতে হয় ভোক্তাকেই।
যখন আইন বলল, ইচ্ছাকৃতভাবে জিনিস নষ্ট বানানো অপরাধ
এই সমস্যাকে নিছক নৈতিক অভিযোগ বা ভোক্তা-অভিজ্ঞতার গল্প হিসেবে না দেখে বেশ কিছু দেশ একে আইনি কাঠামোর মধ্যেও নিয়ে এসেছে, যা প্রমাণ করে বিষয়টা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে স্বীকৃত। ফ্রান্স ২০১৫ সালে তাদের জ্বালানি রূপান্তর আইনে একটা নির্দিষ্ট ধারা যুক্ত করে, যেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে পণ্যের আয়ুষ্কাল কমিয়ে বানানোকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার শাস্তি তিন লাখ ইউরো পর্যন্ত জরিমানা; যা বার্ষিক বিক্রির পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো যায় এবং প্রতিষ্ঠান-পরিচালকদের জন্য দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড। এর পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৪ সালে একটা সংস্কার-অধিকার নির্দেশনা পাস করেছে, যা অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে প্রস্তুতকারকদের মেরামতের সুযোগ নিশ্চিত করতে বাধ্য করা হচ্ছে, এবং সদস্য দেশগুলোকে ২০২৬ সালের জুলাইয়ের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করতে হবে। এই আইনি পদক্ষেপগুলোর মূল বার্তা একটাই, কোনো পণ্যকে ইচ্ছাকৃতভাবে দ্রুত নষ্ট হওয়ার মতো বানিয়ে বাজারজাত করা নিছক ব্যবসায়িক কৌশল নয়, এটা ভোক্তার অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত, আর তাই রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও এখন এটাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।
আসল সাশ্রয় আসলে কোথায় লুকানো
এই পুরো আলোচনা থেকে একটা জিনিস স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কম দাম আর প্রকৃত সাশ্রয় সবসময় একই জিনিস নয়, বরং দুটো ভিন্ন হিসাব। একজন সাধারণ ক্রেতা হিসেবে আমাদের প্রতিদিনের কেনাকাটায় এই পার্থক্যটা মাথায় রাখা জরুরি। কোনো পণ্য কেনার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার, এটা কতদিন ব্যবহার করা যাবে, কতবার সারাতে হতে পারে, আর একবার নষ্ট হয়ে গেলে বদলানোর খরচ কত পড়বে। যাদের হাতে সীমিত টাকা, তাদের জন্য এই হিসাব করা সবসময় সহজ নয়, আর এখানেই লুকিয়ে থাকে আসল বৈষম্য; কম আয়ের মানুষকেই বারবার বেশি খরচ করতে হয়, অথচ তাদেরই এই বাড়তি খরচ বহন করার সামর্থ্য সবচেয়ে কম। তাই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বাজার তদারকি সংস্থা ও নীতিনির্ধারকদেরও এই দায়িত্ব নিতে হবে, যাতে মানহীন পণ্য বাজারে টিকে থাকতে না পারে আর ক্রেতা সঠিক তথ্য পেয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। শেষ পর্যন্ত, দামের ট্যাগ দেখে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী হিসাব করেই বোঝা যায় কোনটা আসলে সাশ্রয়, আর কোনটা শুধু সাময়িক স্বস্তি।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

