দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা বেক্সিমকো গ্রুপের কারখানাগুলো আবার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন একটি লিজভিত্তিক ব্যবসায়িক মডেলে আংশিকভাবে উৎপাদন শুরু করার পরিকল্পনা করছে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী বেক্সিমকো।
ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান চার্টার এইচসিপি লিমিটেড এবং চীনা কোম্পানি বেস্টিং লিমিটেড যৌথভাবে ২৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে গাজীপুরের কাশিমপুরে অবস্থিত বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের একটি পোশাক কারখানা পুনরায় চালুর পরিকল্পনা করেছে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে প্রিফিক্স ফ্যাশনস লিমিটেডে আবার উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হতে পারে।
বেক্সিমকোর টেক্সটাইল ও অ্যাপারেল বিভাগের জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক খালিদ শাহরিয়ার এবং বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করা রিভাইভাল গ্লোবালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হুদা মোহাম্মদ ফয়সাল বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
প্রস্তাবিত ব্যবসায়িক মডেল নিয়ে আগামী ১১ অক্টোবর বিনিয়োগ সহায়তা সংস্থা ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যানের সঙ্গে বেক্সিমকো কর্তৃপক্ষের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সরকারের অনুমোদন পাওয়া গেলে আগামী বছরের এপ্রিল থেকে কারখানাটি পুনরায় চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে কারখানাটিতে মূলত রপ্তানিমুখী জ্যাকেট উৎপাদন করা হবে। মোট উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশ থাকবে জ্যাকেট, আর বাকি ১০ শতাংশে অন্যান্য পোশাক তৈরি করা হবে। কারখানাটি চালু হলে শুরুতেই প্রায় ২,৫০০ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
প্রিফিক্স ফ্যাশনস বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের ১৬টি টেক্সটাইল ও পোশাক ইউনিটের একটি। প্রতিষ্ঠানটির শুরু থেকেই চীনা কোম্পানি বেস্টিংয়ের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ রয়েছে।
প্রস্তাবিত চুক্তি অনুযায়ী, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বেক্সিমকোর সঙ্গে পাঁচ বছরের একটি লিজ চুক্তিতে যাবে। কারখানার রপ্তানি আয় থেকেই ব্যাংকের মাধ্যমে বিনিয়োগ বা ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করা হবে। এর ফলে বেক্সিমকোর সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়াই নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে পরিকল্পনায় বলা হয়েছে।
বিনিয়োগকারীরা আশা করছেন, কারখানাটি পুরোপুরি কার্যকর হলে আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করা সম্ভব হবে। আন্তর্জাতিক পোশাক বাজারে বেস্টিংয়ের নিজস্ব খুচরা ব্যবসা ও ব্র্যান্ড ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা নতুন অর্ডার আনার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে কারখানা পুনরায় চালুর আগে পরিবেশ, শ্রম অধিকার এবং আইনগত সব শর্ত পূরণ করতে হবে। এই লিজ বা মুনাফা ভাগাভাগির মডেল কার্যকর করতে ইনভেস্ট বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
যদি প্রথম পর্যায়ের এই উদ্যোগ সফল হয়, তাহলে ধাপে ধাপে বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের বাকি ১৫টি বন্ধ কারখানাও চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে কর্মহীন হয়ে পড়া ৩০ হাজারের বেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগে জাপানি-বাংলাদেশি যৌথ উদ্যোগ রিভাইভাল গ্রুপও বেক্সিমকোর বন্ধ টেক্সটাইল কারখানাগুলো চালুর বিষয়ে কাজ করেছিল। প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইকোমিলির সঙ্গে মিলে ২০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের একটি প্রস্তাবও দিয়েছিল।
বেক্সিমকো বর্তমানে বড় ধরনের ঋণ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের ৩২টি কারখানার বিপরীতে ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৯ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। একক ব্যাংক হিসেবে জনতা ব্যাংকের পাওনা রয়েছে প্রায় ২৩ হাজার ২৮৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বেক্সিমকোর কয়েকটি কারখানায় অস্থিরতা তৈরি হয়। কিছু কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর উৎপাদন ব্যাহত হয়। পরবর্তীতে শ্রমিকদের বেতন ও পাওনা পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় ২০২৫ সালের মার্চে অন্তর্বর্তী সরকার বেক্সিমকোর ১৬টি ইউনিট বন্ধ ঘোষণা করে। এর আগে শ্রমিকদের মজুরি ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধের জন্য সরকার ৫২৬ কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছিল।
বর্তমান উদ্যোগ সফল হলে এটি শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবনের বিষয় হবে না, বরং রপ্তানি খাত, কর্মসংস্থান এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ তৈরি করতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা, ঋণ পুনর্গঠন, শ্রমিক স্বার্থ রক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনার ওপর।

