দেশের বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে বিনিয়োগের উপযোগী করে গড়ে তুলতে সরকার-সমর্থিত ১০ হাজার কোটি টাকার স্বল্প সুদের তহবিল চেয়েছে বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল মালিকদের সংগঠন (PEZAB)।
সংগঠনটি শুরুতে ৫ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন এবং ধাপে ধাপে তা বাড়িয়ে ১০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব দিয়েছে।
বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নকারীরা বলছেন, জমি উন্নয়ন, সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ, পানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করতে বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হয়। কিন্তু উচ্চ সুদের স্বল্পমেয়াদি ব্যাংক ঋণের কারণে অনেক প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
PEZAB-এর প্রস্তাব অনুযায়ী, উদ্যোক্তাদের ১৫ বছরের জন্য ৪ দশমিক ৫ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হবে, যার মধ্যে থাকবে চার বছরের গ্রেস পিরিয়ড। প্রকল্প ব্যয়ের ৩০ শতাংশ উদ্যোক্তারা নিজস্ব অর্থায়ন করবেন এবং বাকি ৭০ শতাংশ ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে।
গত ২৪ আগস্ট অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এই প্রস্তাব দেয় সংগঠনটি। সেখানে বলা হয়, উচ্চ সুদের বাণিজ্যিক ঋণের কারণে বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল ও হাইটেক পার্ক প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা তৈরি হচ্ছে।
PEZAB সভাপতি এ এস এম মঈনুদ্দিন মোনেম বলেন, দেশি-বিদেশি অনেক প্রতিষ্ঠান বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে কারখানা স্থাপনে আগ্রহ দেখাচ্ছে। কিন্তু অবকাঠামো উন্নয়নে বিলম্ব হওয়ায় এসব বিনিয়োগ আটকে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, উচ্চ সুদের স্বল্পমেয়াদি ব্যাংক ঋণ দিয়ে বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। এ কারণেই কম খরচের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের দাবি জানানো হয়েছে।
প্রস্তাবিত তহবিল গঠন করা যেতে পারে সরকারের বরাদ্দ, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অর্থ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের স্বল্পমূল্যের অর্থায়নের মাধ্যমে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এই তহবিল থেকে ১ শতাংশ সুদে পুনঃঅর্থায়ন পাবে এবং পরে অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নকারীদের ৪ দশমিক ৫ শতাংশ সুদে ঋণ দেবে।
এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে জমি উন্নয়ন, রাস্তা নির্মাণ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, ড্রেনেজ, পানি সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাশন, পানি শোধনাগার, বিদ্যুৎ ও গ্যাস নেটওয়ার্ক, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অগ্নিনিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, লজিস্টিক সুবিধা, আইসিটি অবকাঠামোসহ বিভিন্ন শিল্প সহায়ক কাজে।
বর্তমানে দেশে অনুমোদিত বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলের সংখ্যা প্রায় ২৩টি। এর মধ্যে ৮টি চূড়ান্ত সনদ পেয়ে বাণিজ্যিক উৎপাদনে রয়েছে।
PEZAB জানিয়েছে, সিটি গ্রুপসহ বেশ কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠী বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে। তবে অর্থায়ন সংকটের কারণে অনেক প্রকল্পের বাকি অবকাঠামো উন্নয়ন আটকে আছে।
সংগঠনটি বলেছে, এই তহবিল কোনোভাবেই জমি ধরে রাখা, শেয়ার কেনা, অন্য ব্যবসায় বিনিয়োগ বা পুরোনো ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করা যাবে না। ঋণখেলাপিরাও এই সুবিধা পাবেন না।
যেসব প্রকল্পে ঋণ দেওয়া হবে, সেগুলোকে পরিবেশ, শ্রম অধিকার, পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা এবং জলবায়ু সহনশীলতার মানদণ্ড পূরণ করতে হবে।
PEZAB এমন প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে ইতোমধ্যে বড় অঙ্কের বেসরকারি বিনিয়োগ হয়েছে, কারখানা বা বিদেশি বিনিয়োগকারী নিশ্চিত হয়েছে এবং অবশিষ্ট অবকাঠামো দ্রুত শেষ হলে উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থান তৈরি সম্ভব।
মোনেম বলেন, সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল, ইপিজেড ও হাইটেক পার্কের তুলনায় বেসরকারি উন্নয়নকারীরা অর্থায়নের ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। সরকারি প্রকল্পগুলো বাজেট বরাদ্দ, সরকারি অবকাঠামো ও স্বল্পমূল্যের অর্থায়ন সুবিধা পায়, কিন্তু বেসরকারি উদ্যোক্তাদের নিজেদের অর্থ ও বাণিজ্যিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়।
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নে শুরুতেই বড় বিনিয়োগ করতে হয়, কিন্তু আয় শুরু হয় কারখানা চালু হওয়ার পর ধীরে ধীরে। ফলে উচ্চ সুদের স্বল্পমেয়াদি ঋণ শিল্প জমির খরচ বাড়িয়ে দেয়, অবকাঠামো উন্নয়ন বিলম্বিত করে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
তার মতে, অনেক অর্থনৈতিক অঞ্চলে ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য বেসরকারি বিনিয়োগ হয়েছে, কিন্তু উপযুক্ত অর্থায়নের অভাবে বাকি অবকাঠামো শেষ করা যাচ্ছে না। ফলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও পিছিয়ে যাচ্ছে।

