বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। আর সেই বাজারে পণ্য পাঠাতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের যে ৬১টি অশুল্ক বাধা (নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার) পেরোতে হতো, তার বেশির ভাগই এখন ইতিহাস। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ইইউ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকের পর এক সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, এসব বাধার মধ্যে ৪৮টির পুরোপুরি সমাধান করা হয়েছে। বাকি ১৩টিও সমাধানের পথে।
শুধু বাধা দূর করাই নয়, এর পাশাপাশি ইইউর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার উদ্যোগও এগিয়ে নিচ্ছে সরকার। আর এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের সময় তিন বছর পিছিয়ে দিতে ইইউর আনুষ্ঠানিক সমর্থন চাওয়া হয়েছে। এই তিনটি বিষয়; বাধা সমাধান, এফটিএ উদ্যোগ এবং এলডিসি উত্তরণ পিছানো; মিলিয়ে বাংলাদেশ-ইইউ বাণিজ্য সম্পর্কের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
কী সেই বাধাগুলো, যার সমাধান হলো?
বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ইইউ গত মার্চ মাসে এসব বাধার কথা তুলে ধরে। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি ছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে সম্পর্কিত। উদাহরণস্বরূপ, শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন লজিস্টিক কোম্পানির লাইসেন্স নবায়নে যে জটিলতা ছিল, তা দূর করা হয়েছে। আগে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরা বছরে সর্বোচ্চ ১০ হাজার ডলার পর্যন্ত নমুনা পণ্য আমদানি করতে পারতেন, যা ইইউর আপত্তির পর দ্বিগুণ করে ২০ হাজার ডলার করা হয়েছে। এ ছাড়া রপ্তানি পণ্যের ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত স্মার্ট কার্ডের শুল্কায়ন পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
এখন কথা হচ্ছে, এই বাধাগুলো কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? কারণ ইইউ বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। অশুল্ক বাধা মানে হলো শুল্ক ছাড়া অন্য সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা; যেমন জটিল কাগজপত্র, লাইসেন্সের জটিলতা, অযৌক্তিক শুল্কায়ন পদ্ধতি। এগুলো দূর হলে পণ্য পাঠাতে সময় কম লাগে, খরচ কমে, এবং ব্যবসায়ীদের অনিশ্চয়তা কমে। অন্যদিকে, সমাধান করা বাকি ১৩টি বাধার মধ্যে রয়েছে জাহাজ চলাচল আইনে দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ পণ্য পরিবহনের বাধ্যবাধকতা, যা তুলে নেওয়ার প্রস্তাব করেছে ইইউ। এ ধরনের সংস্কার বাণিজ্যকে আরও গতিশীল করবে।
এফটিএ প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ইইউর সঙ্গে এফটিএ স্বাক্ষরের লক্ষ্যে আলোচনা শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেছেন, বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবের পর ইউরোপীয় কমিশন ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর সম্ভাবনা রয়েছে। এফটিএ হলে শুল্ক কমবে, বাজার আরও উন্মুক্ত হবে; যা বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় সুবিধা বয়ে আনতে পারে।
এদিকে এলডিসি উত্তরণ পিছানোর আবেদনেও ইইউর সমর্থন চাওয়া হয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে চলতি মাসেই এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা। অর্থনৈতিক সমাজ পরিষদ (ইকোসক) ইতিমধ্যে বাংলাদেশের আবেদন সমর্থন করেছে। এলডিসি উত্তরণ পিছালে বাংলাদেশ আরও তিন বছর ইইউ বাজারে জিএসপি সুবিধা পাবে, যা পোশাক খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, রোববারের বৈঠকটি নিছক একটা কূটনৈতিক আয়োজন ছিল না বরং এটি বাংলাদেশ-ইইউ বাণিজ্য সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। ৬১টি বাধার মধ্যে ৪৮টির সমাধান, এফটিএ আলোচনার প্রস্তুতি এবং এলডিসি উত্তরণে ইইউর সমর্থন, এই তিনটি বিষয় মিলিয়ে ইইউ বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও মজবুত হবে। তবে বাকি ১৩টি বাধার সমাধান এবং এফটিএর চূড়ান্ত স্বাক্ষর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আগামী দিনগুলোতে এই আলোচনা কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন নজর বাণিজ্য বিশ্লেষকদের।

