বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্রে এখন চাহিদা কমার প্রভাব দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের পোশাক খাতের প্রধান ভরসার জায়গা হিসেবে থাকা এই বাজারে আমদানির পরিমাণ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের অধীন অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলের (ওটেক্সা) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে পোশাক আমদানি কমিয়েছে ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকেও দেশটির পোশাক আমদানির অর্থমূল্য কমেছে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ।
শুধু রপ্তানির অর্থমূল্যই নয়, এ সময়ে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ। পাশাপাশি প্রতি ইউনিট পোশাকের গড় দামও কমেছে ২ দশমিক ২৬ শতাংশ।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জুলাই মাসে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। একক মাসের হিসাবে ওই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির অর্থমূল্য কমেছে ১০ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ফলে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পোশাক বাজারে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন শঙ্কা।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস (বিএভি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ৪১ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই আমদানির পরিমাণ কমেছে প্রায় ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ।
এই সময়ে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ কম।
রপ্তানি কমার পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা রেসিপ্রোকাল ট্যারিফের চাপকে। এই বাড়তি শুল্কের একটি অংশ বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের বহন করতে হয়েছে। ফলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে অনেক প্রতিষ্ঠানকে পোশাকের দাম কমাতে হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে প্রতি ইউনিটের রপ্তানি মূল্যে।
এর আগে বাংলাদেশের পোশাকে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ এমএফএন শুল্ক ছিল ১৫ শতাংশের বেশি। ২০২৫ সালের এপ্রিলে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ যুক্ত হওয়ার পর মোট শুল্ক বেড়ে প্রায় ২০ শতাংশে দাঁড়ায়। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ২০ শতাংশ এবং এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ১০ শতাংশ হারে এই শুল্ক কার্যকর ছিল।
শুল্ক বাড়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের জন্য বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানির খরচ বেড়ে যায়। এর ফলে অনেক ক্রেতা নতুন অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে শুধু বাংলাদেশ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোও একই ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। জানুয়ারি থেকে জুলাই সময়ে চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি কমেছে ৩৪ দশমিক ২১ শতাংশ এবং ভারত থেকে কমেছে ২৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
এ ছাড়া পাকিস্তান থেকে আমদানি কমেছে ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং ভিয়েতনাম থেকে কমেছে ১ দশমিক ০৩ শতাংশ। এই তুলনায় বাংলাদেশের ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ পতন তুলনামূলকভাবে কম। অর্থাৎ বাজার সংকুচিত হলেও চীন ও ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে।
অন্যদিকে কিছু দেশ এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভালো করেছে। ইন্দোনেশিয়া থেকে পোশাক আমদানি বেড়েছে ২ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রে বেড়েছে ১০ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম প্রধান বাজার হওয়ায় সেখানে চাহিদা কমলে দেশের রপ্তানিতেও সরাসরি প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে যখন ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার মতো কিছু প্রতিযোগী দেশ রপ্তানি বাড়াতে সক্ষম হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের জন্য বর্তমান বাজার ধরে রাখা এবং নতুন ক্রয়াদেশ নিশ্চিত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, জুলাই মাসে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১০ দশমিক ৭৩ শতাংশ কমে যাওয়া একটি সতর্কবার্তা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন বাজার তৈরি, পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সাময়িক মন্দা থাকলেও বাংলাদেশের পোশাক খাতকে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে হলে শুধু একটি বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন বাজার খোঁজা এবং উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে জোর দেওয়া প্রয়োজন।

