বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাব এখন সরাসরি পড়ছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে। বেশি দামে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করে তুলনামূলক কম দামে দেশের বাজারে সরবরাহ করতে গিয়ে বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে সরকারি সংস্থাগুলো।
চলতি অর্থবছরের শুরুতেই এলএনজি খাতে সরকারের নির্ধারিত ভর্তুকির অর্থ শেষ হয়ে গেছে। মাত্র দুই মাসে এলএনজি খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যেখানে পুরো বছরের জন্য বরাদ্দ ছিল ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং পেট্রোবাংলার আর্থিক ক্ষতি দ্রুত বাড়ছে। গত ছয় মাসে বেশি দামে জ্বালানি তেল কিনে দেশের বাজারে কম দামে বিক্রি করায় বিপিসির লোকসান ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়েছে। একই সময়ে এলএনজি আমদানিতে নির্ধারিত ভর্তুকির বাইরে পেট্রোবাংলাকে অতিরিক্ত প্রায় ১৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতের বাড়তি খরচ। কয়লা, ফার্নেস অয়েল এবং এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) লোকসানও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা লোকসানের হিসাব করা হলেও এখন তা ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তার কারণে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি পাওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন কারণে সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশকে বাধ্য হয়ে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান জানান, যুদ্ধের প্রভাবে গত ছয় মাসে নির্ধারিত ভর্তুকির বাইরে অতিরিক্ত ১৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। গত দুই মাসে এলএনজি খাতে ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ভর্তুকি পাওয়া গেছে। এর সঙ্গে আগের অর্থবছরের বকেয়া ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা যোগ হওয়ায় মোট ৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভর্তুকি পাওয়া গেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট এলএনজির দামও দ্রুত বেড়েছে। একসময় প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি ১০ থেকে ১২ ডলারে কেনা গেলেও আগস্টে তা বেড়ে ১৮ থেকে ২২ ডলারে উঠেছে। সেপ্টেম্বরের জন্য কেনা এলএনজি কার্গোর দাম আরও বেড়ে ২৩ থেকে ২৪ ডলারে পৌঁছেছে। অক্টোবরের একটি কার্গোর দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ২৮ ডলার পর্যন্ত উঠেছে।
তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের প্রথম আট মাসে দেশে ৭১টি এলএনজি কার্গো আমদানি করা হয়েছিল। চলতি বছরের একই সময়ে এসেছে ৬৮টি। গত বছরের জুলাই ও আগস্টে যেখানে ২১টি কার্গো এসেছিল, চলতি বছরের একই সময়ে এসেছে মাত্র ১৫টি।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণেই স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এতে একদিকে যেমন দাম বেশি পড়ছে, অন্যদিকে সরবরাহ নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার বেশি দামে এলএনজি কিনছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, মানুষের ভোগান্তি এবং শিল্প খাতের ক্ষতি কমাতে সরকার এই অতিরিক্ত ব্যয়ের ঝুঁকি নিচ্ছে।
এদিকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে বিপিসিও বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বেশি দামে ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিন আমদানি করলেও দেশের বাজারে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। গত মার্চ থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির লোকসান দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা। আগস্ট শেষে এই লোকসান ২২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে জানা গেছে।
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. মনজুর আলম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লেও দেশের বাজারে সেই অনুযায়ী মূল্য সমন্বয় করা হয়নি। ফলে সংস্থাটিকে লোকসানি দামে জ্বালানি বিক্রি করতে হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ সামাল দিতে সরকার গত ছয় মাসে দুই দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম বাড়ানো হলেও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের বাজারের দামের পার্থক্য পুরোপুরি দূর হয়নি।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। গ্যাস সংকটের কারণে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে।
বিপিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পর ধারণা করা হয়েছিল লোকসান কিছুটা কমবে। কিন্তু জ্বালানি আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় সেই হিসাব পরিবর্তন করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে কয়লার দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বাজার দ্রুত স্থিতিশীল হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি সম্ভব হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে ভর্তুকি ও সরকারি ব্যয়ের চাপ কমার সম্ভাবনা কম।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যানশিয়াল অ্যানালিসিসের প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, এলএনজি আমদানির বর্তমান ব্যয় সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি ২৮ ডলারে কিনতে হলে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসে ৯০ টাকার বেশি ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বড় আর্থিক চাপ তৈরি করবে।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং জ্বালানি অপচয় কমানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক বোঝা আরও বাড়তে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য আবারও প্রমাণ করছে যে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের অর্থনীতিতে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।

