নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হওয়ার পরও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা যাচ্ছে না হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল। প্রকল্পের জন্য নেওয়া ঋণের কিস্তি ইতোমধ্যে পরিশোধ শুরু হয়েছে, অথচ টার্মিনাল থেকে এখনো কোনো আয় আসছে না। এমন পরিস্থিতিতে আগামী ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে টার্মিনাল চালুর লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। তবে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব নিতে যাওয়া জাপানি কনসোর্টিয়ামের আর্থিক ও পরিচালনাগত শর্ত।
জাপানি পক্ষের সঙ্গে প্রায় দুই বছর ধরে আলোচনা চালিয়েও চুক্তির বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। এ সময়ে অন্তত ২০ দফা বৈঠক হয়েছে। মন্ত্রী পর্যায়েও একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত গত ২৫ আগস্ট জাপানি কনসোর্টিয়ামের সাব-ওয়ার্কিং গ্রুপ তাদের কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব জমা দেয়। ওই প্রস্তাব যাচাই-বাছাইয়ের পর আজ থেকে শুরু হচ্ছে চূড়ান্ত আর্থিক নেগোসিয়েশন।
বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এসএম লাভলুর রহমান জানিয়েছেন, জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে আজ থেকেই আলোচনা শুরু হবে এবং ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে টার্মিনাল চালুর লক্ষ্যে যত দ্রুত সম্ভব একটি যৌক্তিক সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে আলোচনার টেবিলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে রাজস্ব ভাগাভাগির প্রস্তাব। জাপানি কনসোর্টিয়ামের দেওয়া কাঠামো অনুযায়ী, টার্মিনালের এমবারকেশন ফি, দোকান ও লাউঞ্জের ভাড়া, কার্গো হ্যান্ডলিং এবং কার পার্কিং থেকে পাওয়া রাজস্বের ৭৩ শতাংশ পাবে কনসোর্টিয়াম। বাংলাদেশ পাবে মাত্র ২৭ শতাংশ। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত একটি রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর বাণিজ্যিক আয়ের বড় অংশ বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়া কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অবশ্য বিমানবন্দরের সব ধরনের আয় এই রাজস্ব ভাগাভাগির আওতায় পড়বে না। ওভারফ্লাইং চার্জ ও বিমান অবতরণ ফি বেবিচকের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। কাস্টমস, নিরাপত্তা ও ইমিগ্রেশন ব্যবস্থাপনাও বাংলাদেশের হাতেই থাকবে। ফলে মূল দরকষাকষির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে টার্মিনালের বাণিজ্যিক আয় এবং পরিচালন কাঠামো।
এদিকে টার্মিনাল চালু না হলেও প্রকল্পের ঋণের বোঝা ইতোমধ্যে দেশের ওপর পড়তে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন থেকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়েছে এবং তা চলবে ২০৫৬ সাল পর্যন্ত। অর্থাৎ টার্মিনাল থেকে রাজস্ব আসার আগেই ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে সরকারকে। এই আর্থিক চাপের কারণেই দ্রুত টার্মিনাল চালুর বিষয়ে সরকারের তাগিদ আরও বেড়েছে।
তবে চুক্তি স্বাক্ষর করলেই যে পরদিন থেকে টার্মিনালে বিমান ওঠানামা শুরু করা যাবে, বিষয়টি এমন নয়। চুক্তির পর টার্মিনালের বিভিন্ন যন্ত্রপাতির দায়িত্ব নেবে জাপানি কনসোর্টিয়াম। এরপর এসব যন্ত্রপাতি পরিচালনা, পরীক্ষা ও ক্যালিব্রেশনের কাজ করতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের বিষয়ও রয়েছে। এত বড় একটি আন্তর্জাতিক টার্মিনালের যন্ত্রপাতি পরীক্ষা ও ক্যালিব্রেশন শেষ করতেই কয়েক মাস সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
জাপানি কনসোর্টিয়ামের সূত্রও জানিয়েছে, চুক্তি সম্পন্ন হলেও প্রকৃত অপারেশন শুরু করতে তাদের আরও চার থেকে পাঁচ মাস সময় প্রয়োজন হতে পারে। চুক্তির পর বেশ কিছু প্রস্তুতিমূলক কাজ শেষ করতে হবে। ফলে আজ থেকে চূড়ান্ত আলোচনা শুরু হলেও ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে টার্মিনাল পুরোপুরি বাণিজ্যিকভাবে চালু করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলমের মতে, থার্ড টার্মিনাল দ্রুত চালু করা জরুরি। কারণ প্রকল্পটিতে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ ও ঋণ বিনিয়োগ করা হয়েছে এবং ইতোমধ্যে ঋণ পরিশোধও শুরু হয়েছে। তবে দ্রুত চালুর তাগিদে দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়—এমন কোনো চুক্তিতে যাওয়া ঠিক হবে না। অপারেটরকে দেওয়া শর্ত ও রাজস্ব ভাগাভাগির প্রস্তাব অর্থনৈতিকভাবে কতটা যৌক্তিক, তা ভালোভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজার হিসেবে কাজ করছে। তাদের মাধ্যমেই জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে মূল আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নেগোসিয়েশন শুরু হওয়ার পরও সমঝোতায় পৌঁছাতে সময় লাগতে পারে। বিষয়টি সহজ নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।
থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেতে যাওয়া জাপানি কনসোর্টিয়ামে রয়েছে জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন, সোজিৎজ করপোরেশন এবং নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট করপোরেশন। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে নির্মিত এই বিশাল অবকাঠামোর পরিচালনা জাপানি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার বিষয়টি প্রকল্পের শুরু থেকেই আলোচনায় ছিল।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, থার্ড টার্মিনাল চালুর পর প্রথম পর্যায়ে মোট বিমান চলাচলের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ সেখানে স্থানান্তর করা হবে। পরে ধাপে ধাপে নির্ধারিত ফ্লাইটগুলো নতুন টার্মিনালে নেওয়া হবে। কিন্তু তার আগে পরিচালন চুক্তি চূড়ান্ত করা, যন্ত্রপাতির ক্যালিব্রেশন ও পরীক্ষামূলক পরিচালনা, জনবল নিয়োগ এবং অন্যান্য অপারেশনাল প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে।
থার্ড টার্মিনালের অবকাঠামোগত নির্মাণকাজ প্রায় দুই বছর আগে শেষ হলেও পরিচালনা নিয়ে জটিলতার কারণে এখনো এর পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার শুরু হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রকল্পের প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছিল বলে জানানো হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারও জাপানি কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে টার্মিনাল পরিচালনার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু তখনও চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান থার্ড টার্মিনাল দ্রুত চালুর নির্দেশ দেন। এরপর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে তৎপরতা শুরু করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বেবিচক। এখন সব নজর আজ শুরু হতে যাওয়া চূড়ান্ত নেগোসিয়েশনের দিকে। শেষ পর্যন্ত রাজস্ব ভাগাভাগি, পরিচালন কাঠামো ও অন্যান্য শর্তে কতটা সমঝোতা হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে থার্ড টার্মিনাল চালুর পরবর্তী পথ।

