কনটেইনারে বাস্তবে কোনো পণ্যই নেই, অথচ কাগজে-কলমে দেখানো হয়েছে চার লাখ আটত্রিশ হাজার মার্কিন ডলারের রপ্তানি সম্পন্ন হয়ে গেছে। ডিপোতে পণ্য প্রবেশের আগেই সম্পন্ন হয়ে গেছে কাস্টমসের সব আনুষ্ঠানিকতা। এমনই একটি চাঞ্চল্যকর অনিয়মের সন্ধান পেয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।
সোমবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের জনসংযোগ বিভাগের পক্ষ থেকে এই অনিয়ম শনাক্তের বিষয়টি গণমাধ্যমকে জানানো হয়। জানানো হয়, কাস্টমস গোয়েন্দার বিশেষ অভিযানে একটি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের পাঁচটি সন্দেহজনক রপ্তানি চালান আটক করা হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কাগজপত্র ও সংশ্লিষ্ট রপ্তানি ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যারে বিপুল পরিমাণ পণ্য রপ্তানির তথ্য নথিভুক্ত থাকলেও সংশ্লিষ্ট ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপোতে সরেজমিন গিয়ে সেই পণ্যের কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি।
গত তিন সেপ্টেম্বর রপ্তানি ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যারে কনসাইনমেন্ট যাচাইয়ের সময় এই পাঁচটি চালান প্রথম কাস্টমস গোয়েন্দার নজরে আসে। প্রাথমিক পর্যালোচনাতেই রপ্তানির গন্তব্য দেশ, পণ্যের ধরন এবং ঘোষিত মোট ওজনের মধ্যে অস্বাভাবিক গরমিল লক্ষ করা যায়, যার ভিত্তিতে চালানগুলো আটক করে বিস্তারিত যাচাই-বাছাই শুরু করা হয়।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রধান রপ্তানি বাজার মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। এছাড়া জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, তুরস্ক ও রাশিয়াতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পোশাক রপ্তানি হয়ে থাকে। কিন্তু আলোচিত পাঁচটি চালানের ক্ষেত্রে গন্তব্য দেশ হিসেবে দেখানো হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ফিলিপাইন—যা স্বাভাবিক রপ্তানি প্রবণতার সঙ্গে না মেলায় গোয়েন্দাদের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দেয়।
তদন্তে আরও দেখা গেছে, বন্ডেড সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানটি গত এক বছরে যে পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করেছে, তার তুলনায় ঘোষিত রপ্তানি পণ্যের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেশি। প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই পরিমাণ স্বাভাবিক ইনপুট-আউটপুট অনুপাতের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
দাখিলকৃত রপ্তানি বিলের তথ্য অনুযায়ী পণ্যগুলো একটি নির্দিষ্ট ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপো থেকে রপ্তানি হওয়ার কথা ছিল। কাস্টমস গোয়েন্দার কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট ডিপোতে গিয়ে পণ্য পরীক্ষার জন্য উপস্থাপনের নির্দেশ দিলে ডিপো কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট কোনো পণ্যই দেখাতে পারেননি। উল্টো তারা জানান, রপ্তানির জন্য ঘোষিত পণ্য আদৌ ডিপোতে প্রবেশই করেনি। পণ্য প্রবেশ না করা সত্ত্বেও কীভাবে চালানগুলোর কাস্টমস আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলো, সে বিষয়ে সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কেউই। প্রায় একশ একুশ টন পণ্যের বিপরীতে প্রায় পাঁচ কোটি তেতাল্লিশ লাখ টাকার রপ্তানি দেখানো হলেও বাস্তবে সরেজমিন যাচাইয়ে সেই পণ্যের কোনো চিহ্নই পাওয়া যায়নি।
সাধারণত চট্টগ্রামের কাস্টমস হাউসের তত্ত্বাবধানে থাকা বিভিন্ন ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপোর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে পণ্য রপ্তানি হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে রপ্তানিযোগ্য পণ্য প্রথমে নির্দিষ্ট ডিপোতে প্রবেশ করে, এরপর প্রয়োজনীয় কাস্টমস আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলে রপ্তানি প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়। কিন্তু এই ঘটনায় পণ্য ডিপোতে প্রবেশ না করেই কীভাবে পুরো রপ্তানি প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়ে গেল এবং এর নেপথ্যে প্রকৃতপক্ষে কারা জড়িত, তা উদঘাটনে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অনুসন্ধান এখনো চলমান রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ভুয়া রপ্তানি চালানের মাধ্যমে অর্থ পাচার কিংবা বিভিন্ন সরকারি প্রণোদনা সুবিধা অসৎ উপায়ে গ্রহণের আশঙ্কা থেকে যায়, যা দেশের সামগ্রিক রপ্তানি খাতের ভাবমূর্তির জন্যও ক্ষতিকর। এ কারণে এ ধরনের অনিয়ম চিহ্নিত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি প্রক্রিয়ার তদারকি ব্যবস্থা আরও কঠোর করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

