বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি আগস্ট মাসে কিছুটা থমকে দাঁড়িয়েছে। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ (পিইবি) যৌথভাবে প্রকাশিত ক্রয় ব্যবস্থাপনা সূচক বা পিএমআই, তে দেখা গেছে, আগস্টে সূচকটির মান ৭.৯ পয়েন্ট কমে ৪৯.৯ এ নেমে এসেছে। এর মানে কী? পিএমআই–এর ক্ষেত্রে ৫০, এর বেশি মান অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ আর ৫০ এর নিচে মান সংকোচন নির্দেশ করে। ৪৯.৯ এ নেমে আসার অর্থ হলো, জুলাইয়ের উজ্জ্বল চিত্রের পর আগস্টে অর্থনীতি আবারও একটি সূক্ষ্ম সংকোচনের মুখে পড়েছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা এসেছে উৎপাদন ও সেবা খাতে যে দুই খাত মিলে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৯০ শতাংশ। উৎপাদন খাতের পিএমআই আগস্টে ১৮ পয়েন্ট কমে ৪৭.৪ এ নেমে যায়। অথচ জুলাইয়ে এই খাতের সূচক ছিল ৬৫.৪ যা এই জরিপের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় উত্থান। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে এত বড় পতন! নতুন অর্ডার, রপ্তানি অর্ডার, উৎপাদন, কাঁচামাল ক্রয়, আমদানি এবং কর্মসংস্থান, সবই সংকোচনে চলে গেছে। শুধু তাই নয়, ইনপুট বা কাঁচামালের দাম আগের চেয়েও বেড়েছে, যা উৎপাদনকারীদের জন্য আরও চাপ বাড়িয়েছে।
সেবা খাতের চিত্রও আশঙ্কাজনক। টানা ২২ মাস সম্প্রসারণের পর আগস্টে প্রথমবারের মতো সংকোচনে পড়েছে এই খাতটি। সেবা খাতের পিএমআই ৬.৮ পয়েন্ট কমে ৪৯.২, এ দাঁড়িয়েছে। যদিও নতুন ব্যবসা এবং ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড বেড়েছে, কিন্তু তার গতি অনেক কমেছে। আর সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো কর্মসংস্থান তীব্র হারে কমেছে। অথচ সেবা খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অর্ধেকের বেশি অংশ জুড়ে রয়েছে। এই খাত যখন সংকুচিত হচ্ছে, তখন এর প্রভাব পড়বেই।
তবে সব খাতে যে অন্ধকার তা নয়। কৃষি খাত টানা ১২ মাস ধরে সম্প্রসারণের ধারা বজায় রেখেছে। আগস্টে কৃষি খাতের পিএমআই ১.৩ পয়েন্ট বেড়ে ৫৬.৫ এ পৌঁছেছে। নতুন ব্যবসা, উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান সবই বেড়েছে এই খাতে। অন্যদিকে, নির্মাণ খাতও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। জুলাইয়ে ৪৯.৩ এ সংকোচনে থাকা এই খাতটি আগস্টে ৫২.৪ এ উন্নীত হয়েছে। কৃষি ও নির্মাণ খাতের এই ইতিবাচক ধারা কিছুটা হলেও আশার আলো দেখাচ্ছে।
প্রশ্ন হলো, উৎপাদন ও সেবা খাতে এই পতন কেন? পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও ড. এম মসরুর রিয়াজ বলেছেন, উৎপাদন খাতের এই মন্দার পেছনে রয়েছে দুর্বল রপ্তানি এবং এলএনজি পরিকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণজনিত সাময়িক জ্বালানি সংকট। সহজ ভাষায় বললে, গ্যাস বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, আর সেই সাথে তৈরি পোশাক খাতে অর্ডার কমে যাওয়ায় উৎপাদন আরও কমেছে। অন্যদিকে, ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থায়ন পেতে অসুবিধা, উচ্চ জ্বালানি মূল্য ও উৎপাদন খরচ এই সমস্যাগুলো ব্যবসায়ীদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
তবে ব্যবসায়ীরা কিন্তু সম্পূর্ণ হতাশ নন। জরিপে দেখা গেছে, তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্ক হলেও আশাবাদী। অনেকেই বর্তমান ব্যবসায়িক পরিস্থিতিকে ‘সন্তোষজনক’ বলেছেন এবং আগামী মাসগুলোতে উন্নতি আশা করছেন। ব্যবসার খরচ কমাতে হবে, অর্থায়নের প্রবেশাধিকার বাড়াতে হবে, এবং নীতি সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে。ড. রিয়াজের মতে, জ্বালানি সরবরাহ উন্নত হলে, রপ্তানি চাহিদা বাড়লে এবং ব্যবসায়িক আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক পদক্ষেপ নেওয়া গেলে অর্থনীতি আবারও গতি ফিরে পাবে।

