আন্তর্জাতিক বাজার দরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে বাধ্য হচ্ছে বাংলাদেশ। গত সপ্তাহে স্পট মার্কেটের টেন্ডারের মাধ্যমে জ্বালানি খাতের রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি তিনটি কার্গো ক্রয় করেছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা দিয়ে, যেখানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মূল্যায়ন সূচকের তুলনায় কমপক্ষে তিনশ কোটি টাকা বেশি গুনতে হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত স্পট মার্কেটের বাইরে দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় অন্তত বিশটি কার্গো সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এলএনজি সরবরাহ ব্যবসা এখন বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে এবং একটি সিন্ডিকেট এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে বলে সরকারের ধারণা। এ কারণেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এবং সেই চুক্তি না হলেই কেবল স্পট মার্কেটের দিকে যাওয়া হচ্ছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থায়। এই যুদ্ধের জেরে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার, ওমান ও একটি মার্কিন জ্বালানি কোম্পানি তাদের নির্ধারিত সরবরাহ স্থগিত করায় বাংলাদেশ বাধ্য হচ্ছে স্পট মার্কেটের দিকে ঝুঁকতে। জ্বালানি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, আগামী অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত অন্তত পঁচিশ থেকে ত্রিশটি কার্গো এলএনজির প্রয়োজন হবে, যার মধ্যে চলতি সেপ্টেম্বরের জন্য নয়টি কার্গোর ব্যবস্থা ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং অক্টোবরের জন্য দীর্ঘ-স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় চারটি কার্গো পাওয়ার আশা করা হচ্ছে।
একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, স্পট মার্কেটে বাড়তি দামে এলএনজি ক্রয়ের বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করে একাধিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় জ্বালানি সচিব বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানির সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন এবং স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় সাশ্রয়ী দামে সরবরাহ করলে দ্রুত বিল পরিশোধসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো কোম্পানি আগামী তিন মাসের জন্য স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে সরবরাহে সম্মত হয়নি।
এই প্রেক্ষাপটেই সম্প্রতি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি একটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের একটি কোম্পানি থেকে তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে এক কার্গো এলএনজি ক্রয়ের অনুমোদন দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মূল্যসূচকের তুলনায় সামান্য কম দামে পাওয়া গেছে। কিন্তু স্পট মার্কেটে ঠিক এর বিপরীত চিত্র দেখা গেছে।
গত সপ্তাহে দেশের প্রাকৃতিক গ্যাস রূপান্তরকারী রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি সেপ্টেম্বরের শেষ ও অক্টোবরের শুরুর দিকের তিনটি নির্দিষ্ট সরবরাহ তারিখের জন্য টেন্ডার আহ্বান করে। এই তিনটি কার্গোর প্রতিটিতেই আন্তর্জাতিক মূল্যসূচকের তুলনায় বেশি দাম দিয়ে এলএনজি কিনতে হয়েছে। প্রথম কার্গোতে সর্বনিম্ন দরদাতার প্রস্তাবিত মূল্য আন্তর্জাতিক সূচকের তুলনায় প্রায় তিন দশমিক পাঁচ ডলার বেশি ছিল, যার ফলে এই এক কার্গোতেই সরকারকে অতিরিক্ত নব্বই লাখ ডলারের বেশি গুনতে হয়েছে। দ্বিতীয় কার্গোতেও প্রায় একই মাত্রার বাড়তি ব্যয় হয়েছে, এবং তৃতীয় কার্গোতেও কয়েক লাখ ডলার বেশি খরচ করতে হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, টেন্ডারের সময় আন্তর্জাতিক সূচকমূল্য বাইশ থেকে সাড়ে চব্বিশ ডলারের মধ্যে ছিল, যার তুলনায় সরকারকে বেশি দামেই এলএনজি সংগ্রহ করতে হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো জ্বালানি বিভাগকে এই বাড়তি ব্যয়ের পেছনে কয়েকটি কারণ ব্যাখ্যা করেছে। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক এলএনজি বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে—যে এলএনজির দাম কিছুদিন আগেও নয়-দশ ডলারের মধ্যে ছিল, তা এখন বিশ ডলারের বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, আমদানি করা এলএনজির গুণগত মান দেশীয় গ্যাস গ্রিডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখার প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক আন্তর্জাতিক কোম্পানি সরবরাহে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। তৃতীয়ত, স্পট মার্কেটে অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে সরবরাহের শর্তে টেন্ডার আহ্বান করা হয়, যার কারণে দাম বেড়ে যাচ্ছে এবং সময়ের স্বল্পতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কোম্পানি আগ্রহ থাকলেও টেন্ডারে অংশ নিতে পারছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার একটি কাঠামোগত দুর্বলতা প্রকাশ করে—দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং বিকল্প উৎস সীমিত থাকায় বৈশ্বিক সংকটের মুহূর্তে দেশ বারবার উচ্চমূল্যে জ্বালানি কিনতে বাধ্য হচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক জ্বালানি ব্যয় ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করতে পারে।

