বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ব্যবসা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাবকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে তারা।
একই সঙ্গে ইইউর চিহ্নিত ৬১টি অশুল্ক বাণিজ্য বাধার (এনটিবি) মধ্যে ৪৮টি সমাধান করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ। বাকি ১৩টি বিভিন্ন পর্যায়ে সমাধানের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
রোববার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বাংলাদেশের মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করে ইইউর একটি প্রতিনিধিদল। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ইইউ প্রতিনিধিদের বাণিজ্য বাধা দূর করার অগ্রগতি সম্পর্কে জানানো হয়।
আলোচনায় বাংলাদেশ-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধে ইইউর সমর্থনের বিষয়টিও উঠে আসে।
বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, ইইউ চিহ্নিত ৬১টি অশুল্ক বাণিজ্য বাধার মধ্যে এখন পর্যন্ত ৪৮টি সমাধান করা হয়েছে। বাকি ১৩টি বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে।
তিনি জানান, ইইউর উদ্বেগগুলো সমাধানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং নৌপরিবহনসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে সরকার কাজ করেছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ইইউ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার হওয়ায় তাদের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এফটিএ নিয়ে আলোচনা শুরুর প্রস্তুতিও নিচ্ছে বাংলাদেশ।
এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার বাংলাদেশের অনুরোধেও ইইউর সমর্থন চাওয়া হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি (সিডিপি) এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) থেকে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সুপারিশ পেয়েছে। বিষয়টি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে উত্থাপিত হওয়ার কথা রয়েছে।তিনি বলেন, এ প্রক্রিয়ায় ইইউর সমর্থন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইইউর উদ্বেগের কিছু বিষয় ইতোমধ্যে সমাধান করা হয়েছে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। এর মধ্যে শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন লজিস্টিকস কোম্পানির লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে থাকা বিধিনিষেধ তুলে দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সর্বশেষ আমদানি নীতিমালার মাধ্যমে রপ্তানিকারক ও ব্যবসায়ীদের পণ্য নমুনা আমদানির বার্ষিক সীমা ১০ হাজার ডলার থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার ডলার করা হয়েছে।
পণ্যের উৎস ও সরবরাহের গতিপথ শনাক্ত করতে ব্যবহৃত স্মার্ট কার্ডের শুল্কায়ন পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রকৃত মূল্যের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি মূল্য ধরে শুল্ক আরোপের পরিবর্তে এখন প্রকৃত মূল্যের ভিত্তিতে দুটি শ্রেণিতে শুল্কায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তবে বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ সুরক্ষা আইনের আওতায় পণ্য আমদানি-রপ্তানির ১৫ দিন আগে সরকারি অনাপত্তিপত্র (এনওসি) নেওয়ার বিধান এখনো বহাল রয়েছে।
এই আইনে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির ৫০ শতাংশ পণ্য বাংলাদেশি মালিকানাধীন জাহাজে পরিবহনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বাণিজ্যমন্ত্রীর হিসাবে, দেশে বর্তমানে প্রায় ১২২টি জাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের সাতটি এবং বেসরকারি মালিকানাধীন প্রায় ১১৫টি জাহাজ রয়েছে।
প্রায় ১৩০ বিলিয়ন ডলারের বার্ষিক দ্বিপক্ষীয় আমদানি-রপ্তানির অর্ধেক পণ্য পরিবহনের জন্য এই সংখ্যা যথেষ্ট নয় বলে জানান তিনি। তাই সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ইইউর বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের প্রধান ও রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করতে চায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী ইউরোপীয় ব্যবসা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি। এ ক্ষেত্রে এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাবের বিষয়টি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
বাংলাদেশ-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির প্রথম দফার আলোচনা শুরু হওয়াকেও দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন ইইউ রাষ্ট্রদূত।
এ ছাড়া সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, মেধাস্বত্ব অধিকার ও মানবাধিকারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, কোনো দেশ থেকে পণ্য কেনার ক্ষেত্রে শুধু ঘোষিত দাম বিবেচনা করা হয় না। পণ্যের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সুবিধা ও গুণগত দিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
উদাহরণ হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একটি কোম্পানি থেকে বাংলাদেশে এলএনজি কেনার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, ২০৩৮ সাল পর্যন্ত ওই কোম্পানি গড়ে প্রতি ইউনিট প্রায় ৯ ডলার দামে ১১৭টি এলএনজি কার্গো দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। মন্ত্রিসভা কমিটি চুক্তিটি অনুমোদনের সময় প্রযোজ্য সূচকের ভিত্তিতে এই দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানির বিষয়টিও তুলে ধরে তিনি বলেন, কিছু দেশের তুলনায় মার্কিন গমের অপচয়ের হার কম। ফলে সব ধরনের খরচ হিসাব করলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম কেনা বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, ভারত বা অন্য যে কোনো দেশ থেকেই পণ্য কেনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিজস্ব বিচার-বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। ২০২৫ সালে দুই পক্ষের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ইউরো।
ইইউর সঙ্গে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে, যার প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক রপ্তানি। ২০২৫ সালে ইইউ বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের প্রায় ৯৪ শতাংশই ছিল বস্ত্র ও পোশাক খাতের।
এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ বর্তমানে ইইউর ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ (ইবিএ) কর্মসূচির আওতায় শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা পাচ্ছে। বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এই সুবিধা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

