বিশেষ বিশ্লেষণ
লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আলবার্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত ১৭১০ সালে বোনা একটি শাড়ির নকশা দেখে ২০২০ সালে নারায়ণগঞ্জের দুই তাঁতি রুবেল মিয়া আর মো. ইব্রাহিম হুবহু একই রকম আরেকটি শাড়ি বুনে ফেললেন। ১৮৫০ সালে লন্ডনে ঢাকাই মসলিনের শেষ প্রদর্শনীর প্রায় ১৭০ বছর পর বাংলাদেশে আবার বোনা হলো সেই ঐতিহ্যবাহী কাপড়, যা নিয়ে বলা হতো, একটি আস্ত শাড়ি নাকি আংটির ভেতর দিয়ে গলে যায়। খবরটা তখন আনন্দের ঢেউ তুলেছিল সারা দেশে। কিন্তু এই লেখা যখন লিখছি, ততদিনে সেই আনন্দের রেশ কেটে গিয়ে একটা প্রশ্ন থেকে গেছে অনেকের মনে, যে কাপড় একসময় সাধারণ মানুষের ঘরেও ব্যবহার হতো, তা ফিরে এসেও কেন আজ একটি সাধারণ পরিবারের কয়েক বছরের আয়ের সমান দামে বিক্রি হয়? মসলিন কেন হারিয়েছিল, আর ফিরে এসেও কেন তা এখনো বাজারে নেই; এই দুটো প্রশ্নের উত্তর আসলে একই সুতোয় গাঁথা।
রাজদরবারের সোনার সুতা যাদের হাতে বোনা হতো
মসলিনের গল্প শুরু হয় মেঘনার পলিমাটি থেকে। ঢাকার আশপাশে জন্মানো ফুটি কার্পাস নামের এক বিশেষ তুলাগাছকে ইতিহাসবিদরা মনে করেন পৃথিবীর সেরা জাতের কার্পাসগুলোর একটি। এই তুলা থেকে সুতা কাটার কাজ করতেন সাধারণত পরিবারের নারীরা; আর সেটাও যখন-তখন নয়, ভোরের আগে বা বিকেলের শেষে, যখন বাতাসে থাকে ঠিক পরিমাণ আর্দ্রতা। এমন পরিশ্রম আর নিখুঁত দক্ষতার বিনিময়ে যে কাপড় তৈরি হতো, তার দাম উঠত আকাশছোঁয়া। মোগল দরবারে সম্রাটের জন্য তৈরি বিশেষ মসলিনের নাম ছিল ‘মলবুল খাস’, বাংলার সুবাদারদের জন্য ‘সরকার-ই-আলা’। কিন্তু এই মূল্যের সুফল আসলে কার হাতে যেত? তাঁতিদের নয়। উঁচু দামে বিক্রি হওয়ার আগে মসলিন তাঁতিদের হাত থেকে চলে যেত একের পর এক মধ্যস্বত্বভোগীর হাতে, আর একজন প্রধান তাঁতি এক টুকরো মসলিন তৈরির বিনিময়ে যা মজুরি পেতেন, তা দিয়ে বছরে বড়জোর ৫৭-৭০ মণ চাল কেনা যেত, তার সহকারী পেতেন আরও কম। অর্থাৎ, শিল্পটা যতটা রাজকীয় ছিল ওপর থেকে দেখতে, ভেতর থেকে ততটাই ছিল ভঙ্গুর, কারণ যারা এই শিল্প টিকিয়ে রাখতেন, তাদের হাতেই কোনো আর্থিক নিরাপত্তা ছিল না।
এই ভঙ্গুরতা চূড়ান্ত রূপ নেয় ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর। মোগল শাসনক্ষমতা ও ক্রয়ক্ষমতা হারানোর সাথে সাথে মসলিনের প্রধান পৃষ্ঠপোষকতাও উবে যায়, আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার বাণিজ্যে একচেটিয়া আধিপত্য কায়েম করে। কোম্পানির লোকজন কুঠি বসিয়ে গোমস্তা নিয়োগ করে তাঁতিদের অগ্রিম টাকা (দাদন) দিতে শুরু করে কিন্তু এই অগ্রিম ছিল এক ধরনের ফাঁদ। সুদে কেনা সেই টাকায় সুতা কিনে দীর্ঘ সময় ধরে মসলিন বুনতে বুনতে সুদ এমন বেড়ে যেত যে কাপড় বুঝিয়ে দেওয়ার পরও তাঁতির ঋণ থেকেই যেত, ফলে পরের মৌসুমেও সে কুঠির কাছে বাঁধা পড়ে যেত। লোকমুখে প্রচলিত আছে যে ইংরেজরা দক্ষ তাঁতিদের আঙুল কেটে দিয়েছিল মসলিন বন্ধ করতে, তবে এই তথ্যের সত্যতা যাচাই করার মতো কোনো ঐতিহাসিক দলিল আজও পাওয়া যায়নি বলে গবেষকরা স্পষ্ট করে বলেন; আসল ঘটনা ছিল অত্যাচার আর ঋণের ফাঁদ, যা রূপকথার চেয়ে কম নাটকীয় হলেও একইরকম নিষ্ঠুর।
ম্যানচেস্টারের কল যেদিন সস্তা হলো ঢাকার তাঁতের চেয়ে
শেষ আঘাতটা এল অর্থনীতির নিয়মেই। ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে শিল্প বিপ্লবের ফলে কলে তৈরি হতে থাকল হাজারো গজ কাপড়, দিনের পর দিন, ঘণ্টায় ঘণ্টায়; যেখানে একটি ভালো মানের মসলিন তৈরিতে একজন তাঁতি ও তার সহকারীর লাগত ছয় মাস। মানে বা সৌন্দর্যে যন্ত্রের কাপড় মসলিনের ধারেকাছেও যেতে পারেনি, কিন্তু দাম আর উৎপাদনের গতিতে বাজার দখলের দৌড়ে সে এগিয়ে যায়। এখানেই লুকিয়ে আছে আসল অর্থনৈতিক যুক্তি: শিল্প বিপ্লবের আগে ইংরেজরা ভারত থেকে তৈরি কাপড় কিনে ইউরোপে বিক্রি করত, কিন্তু কলকারখানা বসার পর তাদের দরকার হলো কাঁচামাল, তৈরি পণ্য নয়। ফলে মসলিন সংগ্রহ করে ইউরোপে পাঠানোর চেয়ে ভারত থেকে তুলা রপ্তানি করাই ইংরেজদের কাছে বেশি লাভজনক হয়ে উঠল। এই একটামাত্র হিসাব বদলে যাওয়ায় গোটা শিল্পের ভিত নড়ে যায়। তাঁতখানা একে একে নিরব হতে থাকে, দক্ষ তাঁতিরা দারিদ্র্যে পেশা পাল্টাতে বাধ্য হন, আর জ্ঞান হস্তান্তরের যে ধারা বংশ পরম্পরায় চলত, তা ছিন্ন হয়ে যায়। তাঁতি না থাকলে ফুটি কার্পাসের চাহিদাও কমে, আর কৃষকরা সেই জমিতে অন্য ফসল ফলাতে শুরু করেন। এমনকি ১৮১১ সালে এক ইংরেজ কর্মচারী আমেরিকা থেকে তুলা এনে ঢাকার তাঁতিদের হাতে দিয়েছিলেন, ভেবেছিলেন একই মানের সুতা হবে; কিন্তু বহু চেষ্টাতেও তা সম্ভব হয়নি, কারণ মেঘনার দুই কূলের নির্দিষ্ট পলিমাটি ছাড়া সেই বিশেষ তুলা জন্মাতোই না। এভাবেই কারিগর, কাঁচামাল আর পৃষ্ঠপোষকতা; তিনটে স্তম্ভ একসাথে ভেঙে পড়ে মসলিন হারিয়ে যায়।
কাপড়ের নমুনা খুঁজতে ছুটতে হলো কলকাতা থেকে লন্ডন
২০১৪ সালের অক্টোবরে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মসলিনের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেন, আর তারপর শুরু হয় ছয় বছরের এক অদ্ভুত অভিযান। গবেষকদের হাতে শুরুতে না ছিল মসলিন কাপড়ের নমুনা, না ছিল ফুটি কার্পাস তুলার গাছ চেনার কোনো উপায়। শুধু ভরসা ছিল সুইডিশ বিজ্ঞানী ক্যারোলাস লিনিয়াসের প্রায় আড়াইশ বছর আগের একটি লেখা, যাতে বলা ছিল পূর্ব ভারতে ফুটি কার্পাস নামে একটি জাত পাওয়া যেত। গাছটি খুঁজে বের করতে সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন, বিটিভিতে প্রচার, এমনকি একজন মন্ত্রীর ফেসবুক স্ট্যাটাসের সূত্র ধরে ২০১৭ সালে গাজীপুরের কাপাসিয়া থেকে একটি সম্ভাব্য জাত মেলে। কিন্তু সেটা আসল ফুটি কার্পাস কি না, তা প্রমাণ করতে দরকার ছিল আসল মসলিন কাপড়ের ডিএনএ। জাতীয় জাদুঘর প্রায় আট মাস ঘুরিয়েও নমুনা দেয়নি, কলকাতার ন্যাশনাল মিউজিয়ামে গিয়ে জানা গেল মুর্শিদাবাদে এখন যে মসলিন তৈরি হয় তা দক্ষিণ ভারতীয় তুলা থেকে বানানো, ঢাকাই মসলিনের মতো নরম নয়। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে ২০১৭ সালে গবেষক দল ছুটে যান লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আলবার্ট মিউজিয়ামে, যেখানে সংরক্ষিত সাড়ে তিনশ ঢাকাই মসলিনের একটি থেকে সংগ্রহ করা হয় সেই কাঙ্ক্ষিত নমুনা। এই নমুনার ডিএনএ সিকোয়েন্সের সাথে কাপাসিয়ার তুলার মিল পাওয়া গেলে তবেই নিশ্চিত হয় এটাই ফুটি কার্পাস।
পাঁচ দিনে এক গ্রাম সুতা
তুলা মিললেও আসল চ্যালেঞ্জ তখনো বাকি ছিল, সেই তুলা থেকে হাতে সুতা কাটা, যেখানে আধুনিক কোনো যন্ত্রের ঠাঁই নেই। এক কিলোমিটার সুতার ওজন গ্রামে মেপে তার দৈর্ঘ্য ভাগ করে যে সংখ্যা পাওয়া যায় তাকে বলে কাউন্ট, আর মসলিন বোনা হতো সাধারণত ৫০০ কাউন্টের সুতায়, আজকের বাজারে প্রচলিত যেকোনো সুতি কাপড়ের চেয়ে বহুগুণ চিকন। দেশজুড়ে খুঁজে গবেষকরা দুজন প্রবীণ নারীকে পেয়েছিলেন, যাঁদের পূর্বপুরুষরা এক সময় মসলিনের সুতা কাটতেন, কিন্তু তাঁরা নিজেরা আর কাটতে পারতেন না। শেষে খদ্দরের মোটা সুতা কাটা তাঁতিদের নিয়ে দলে ভাগ করে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সেরাদের বাছাই করতে করতেই লেগে যায় দুই বছর, তবেই মেলে ছয়জন দক্ষ সুতাকাটুনি। সুতা চিকন করার এই কৌশলকে গবেষকরা নিজেরাই বলছেন ‘তিন আঙুলের জাদু’; রাতে লোশন মাখিয়ে আঙুল নরম রাখা, ঘামলে পাউডার দেওয়া, আঙুলে যেন কোনো আঁচড় না লাগে সে জন্য অন্য কোনো কাজ না করানো। এই প্রকল্পের প্রশিক্ষিত সুতাকাটুনিরা পাঁচ দিনে মাত্র এক গ্রাম সুতা কাটতে পারেন, আর একটি শাড়িতে লাগে ১৪০-১৫০ গ্রাম সুতা অর্থাৎ এই গতিতে একজনের একার পক্ষে একটি শাড়ির সুতা তৈরি করতেই লাগবে প্রায় দুই বছর। এই একটি তথ্যেই আসলে লুকিয়ে আছে গোটা সমস্যার সারকথা।
যে বাধাগুলো এখনো আটকে রেখেছে মসলিনকে
২০২০ সালের ২৮ ডিসেম্বর ঢাকাই মসলিন জিআই স্বীকৃতি পায় এবং ২০২২ সালের এপ্রিলে সরকার একে আনুষ্ঠানিকভাবে পুনরুজ্জীবিত ঘোষণা করে। কিন্তু ‘ফিরে আসা’ আর ‘বাজারে আসা’ এই দুটো এক জিনিস নয়। বর্তমানে একেকটি মসলিন শাড়ি কিনতে ক্রেতাদের গুনতে হয় ৬ থেকে ১১ লাখ টাকা, কারণ শুধু একটি শাড়ির জন্য যে তুলা ও সুতা লাগে তা উৎপাদনেই খরচ পড়ে সাড়ে ৪ থেকে ৮ লাখ টাকা। এটা বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডেরই হিসাব। আরও লক্ষণীয়, ফুটি কার্পাসের চাষ আজও কৃষকের মাঠে ছড়িয়ে যায়নি, তা সীমাবদ্ধ আছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও নারায়ণগঞ্জের গবেষণা প্লটে। মূল প্রকল্পের বরাদ্দ ছিল ১৪ কোটি ১০ লাখ টাকা, কিন্তু ছয় বছরের গবেষণা, কলকাতা-লন্ডন যাতায়াতসহ খরচ হয়েছে মাত্র সোয়া ৪ কোটি টাকা। বাকি প্রায় ৭০ শতাংশ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত গেছে। এই একটি তথ্যই বলে দেয়, এই প্রকল্প মূলত ছিল ‘প্রযুক্তি প্রমাণের’ গবেষণা, শিল্প-স্কেলে উৎপাদনের অবকাঠামো তৈরির নয়। তাই ২০২০ সালেই বলা হয়েছিল আগামী দুই বছরে শাড়ি বাজারে আনা সম্ভব হবে, তারপর লক্ষ্য বদলে হলো ২০২২-২৩ অর্থবছর, এরপর সরকার আবার ‘বাণিজ্যিকীকরণ’ নামে প্রকল্পের নতুন পর্যায় হাতে নেয়, প্রতিটি নতুন সময়সীমা আসলে প্রমাণ করে, একবার কাপড় বুনতে পারা আর সেটা টেকসইভাবে বাজারে সরবরাহ করতে পারা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটো কাজ।
এখানে একটা মৌলিক নীতির কথা না বললেই নয়, কোনো হারানো শিল্প ‘প্রযুক্তিগতভাবে’ ফিরে আসা মানেই তার ‘শিল্প হিসেবে’ ফিরে আসা নয়। একটি সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) তখনই টেকে যখন তার প্রতিটি স্তর; কাঁচামাল উৎপাদন, দক্ষ জনশক্তি এবং ন্যায্য মূল্য বণ্টন একসাথে ও পর্যাপ্ত পরিমাণে দাঁড়ায়। মসলিন যেভাবে হারিয়েছিল, তার কারণ ছিল ঠিক এই তিনটি স্তম্ভের একযোগে ভেঙে পড়া। পৃষ্ঠপোষকতা, বিশেষ ফুটি কার্পাসের চাষ আর কারিগরের বংশানুক্রমিক দক্ষতা। আজ প্রযুক্তিগতভাবে ফুটি কার্পাস মিলেছে, ডিএনএ মিলিয়ে প্রমাণও হয়েছে, ছয়জন দক্ষ সুতাকাটুনি তৈরি হয়েছেন, একটি সাড়ে তিনশ বছরের নকশার শাড়িও বোনা হয়েছে কিন্তু এই তিন স্তম্ভের কোনোটিই এখনো কৃষক পর্যায়ে, প্রশিক্ষণ পর্যায়ে বা বাজার পর্যায়ে পর্যাপ্ত আকারে দাঁড়ায়নি। ফলে আজকের মসলিন এক অর্থে জাদুঘরের প্রদর্শনী আর রাষ্ট্রীয় উপহারের কাপড় হয়েই থেকে গেছে, সাধারণ মানুষের ব্যবহারের কাপড় নয়। অনেকটা জামদানি যেভাবে দেড়শ কাউন্টের সুতা দিয়ে ‘নিম্নমানের মসলিন’ হয়েও নিজের একটা বাস্তবসম্মত বাজার তৈরি করে নিয়েছে, ৫০০ কাউন্টের আসল মসলিনকে ঠিক সেভাবেই নিজের একটা টেকসই পথ খুঁজে বের করতে হবে। হয় দাম কমিয়ে, নয়তো একে সচেতনভাবে একটি বিলাসবহুল ঐতিহ্য-পণ্য হিসেবে রপ্তানি বাজারে প্রতিষ্ঠিত করে।
মসলিনের গল্পটা তাই শুধু ইতিহাসের নস্টালজিয়া নয়, এটা একটা জীবন্ত অর্থনৈতিক শিক্ষা, একটা শিল্প বাঁচাতে হলে শুধু তার ‘জ্ঞান’ ফিরিয়ে আনলেই চলে না, ফিরিয়ে আনতে হয় সেই পুরো বাস্তুতন্ত্র, যেখানে কৃষক, কারিগর আর ক্রেতা তিনজনই টিকে থাকার মতো একটা ভারসাম্য খুঁজে পান। সেই ভারসাম্য তৈরি না হওয়া পর্যন্ত ঢাকাই মসলিন হয়তো আংটির ভেতর দিয়ে গলে যেতে থাকবে বারবার, কিন্তু সাধারণ মানুষের ঘরে ঢুকতে পারবে না।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

