বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মধ্যবিত্ত শ্রেণি দীর্ঘদিন ধরেই সঞ্চয়, ভোগ ও বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। নিয়মিত আয় থেকে সঞ্চয় করে এই শ্রেণির মানুষ ভবিষ্যতের শিক্ষা, চিকিৎসা, বাড়ি কেনা, অবসরজীবন কিংবা জরুরি প্রয়োজনের জন্য অর্থ জমিয়ে রাখেন। একই সঙ্গে তাদের সঞ্চয় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানত তৈরি করে, যা আবার ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে ঋণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সুদের হারের পরিবর্তন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা মধ্যবিত্তের এই অর্থনৈতিক সমীকরণকে কঠিন করে তুলেছে। ব্যাংকে টাকা রাখলেও তার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে, আবার ঋণ নিয়ে বাড়ি, ব্যবসা কিংবা অন্য কোনো বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রেও বাড়ছে ব্যয়। ফলে মধ্যবিত্ত একদিকে সঞ্চয় ধরে রাখতে পারছে না, অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগের ঝুঁকিও নিতে পারছে না।
বাংলাদেশের সুদের হারের কাঠামোয় গত কয়েক বছরে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে দীর্ঘ সময় ব্যাংকঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশ এবং আমানতের সর্বোচ্চ সুদহার ৬ শতাংশ নির্ধারিত ছিল। এই ব্যবস্থা সাধারণভাবে ‘নয়-ছয়’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
তবে করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক চাপ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির মধ্যে এই নিয়ন্ত্রিত সুদহার ব্যবস্থা কার্যকর রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকায় মুদ্রানীতিতে পরিবর্তন আনার প্রয়োজন দেখা দেয়।
এরপর ২০২৩ সালের জুলাই থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ছয় মাসের গড় ট্রেজারি বিলের সুদের হারের ভিত্তিতে ‘স্মার্ট’ বা ছয় মাসের চলমান গড় সুদের হারভিত্তিক একটি ব্যবস্থা চালু করে। এটি আগের নির্ধারিত সুদহারের তুলনায় বেশি বাজারনির্ভর ছিল। কিন্তু মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকায় এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণ কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০২৪ সালের মে মাসে সুদের হার আরও বেশি বাজারনির্ভর করে দেওয়া হয়।
এর ফলে নীতি সুদহার কয়েক দফা বাড়ানো হয়। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণ ও আমানতের সুদহারও বেড়ে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঋণের সুদহার ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ বা তারও বেশি পর্যায়ে পৌঁছায়। দীর্ঘ সময় তুলনামূলক কম সুদহারের পরিবেশে অভ্যস্ত ব্যবসায়ী ও সাধারণ ঋণগ্রহীতাদের জন্য এটি বড় ধরনের চাপ তৈরি করে।
সুদ বাড়লেও সঞ্চয়কারীর স্বস্তি কোথায়? সাধারণ অর্থনৈতিক হিসাবে সুদের হার বাড়লে আমানতকারীর লাভবান হওয়ার কথা। ব্যাংকে টাকা রাখলে বেশি সুদ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বাস্তবে সেই সুবিধা অনেকটাই সীমিত হয়ে যাচ্ছে।
ধরা যাক, একজন মধ্যবিত্ত আমানতকারী ব্যাংকে টাকা রেখে বছরে ১০ শতাংশ সুদ পেলেন। একই সময়ে যদি মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৫ শতাংশ বা তার বেশি হয়, তাহলে কাগজে-কলমে তার আমানতের পরিমাণ বাড়লেও প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। অর্থাৎ ব্যাংক হিসাবে টাকার অঙ্ক বৃদ্ধি পেলেও সেই টাকা দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য ও সেবা কেনা সম্ভব হবে। এটিই প্রকৃত সুদের হার নেতিবাচক হওয়ার সমস্যা।
মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের সঞ্চয়ের বড় অংশ সাধারণত ব্যাংক আমানত, মেয়াদি আমানত বা নিয়মিত সঞ্চয় প্রকল্পে থাকে। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমানতের প্রকৃত আয় না বাড়লে দীর্ঘদিনের সঞ্চয়ও ধীরে ধীরে তার বাস্তব মূল্য হারায়।
মধ্যবিত্ত ও অবসরপ্রাপ্ত মানুষের জন্য জাতীয় সঞ্চয়পত্র দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সঞ্চয়পত্র ব্যবস্থায় বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। বিনিয়োগের ঊর্ধ্বসীমা, টিআইএন-সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা এবং নির্দিষ্ট অঙ্কের বেশি বিনিয়োগে মুনাফার হার স্ল্যাবভিত্তিক কমে যাওয়ার মতো পরিবর্তনের কারণে অনেকের জন্য আগের মতো সুযোগ নেই।
অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার নতুন করে সঞ্চয় করার বদলে পুরোনো সঞ্চয় ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি বিল এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে আয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে। ফলে জরুরি প্রয়োজনে অনেক পরিবার মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই স্থায়ী আমানত বা নিয়মিত সঞ্চয় প্রকল্প ভেঙে ফেলছে।
এভাবে সঞ্চয়ের পরিমাণ কমে গেলে শুধু ব্যক্তিগত আর্থিক নিরাপত্তাই দুর্বল হয় না; ব্যাংকিং ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি আমানতের ভিত্তিও সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
সুদের হার বৃদ্ধির আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগে। ঋণের সুদ যত বাড়ে, বিনিয়োগের খরচও তত বাড়ে। ফলে যে প্রকল্প আগে লাভজনক ছিল, উচ্চ সুদের পরিবেশে সেটিই আর লাভজনক নাও থাকতে পারে।
মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগের স্বপ্নগুলোর একটি হলো নিজের একটি বাড়ি বা ফ্ল্যাট। এ ক্ষেত্রে গৃহঋণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যখন গৃহঋণের সুদ এক অঙ্কের মধ্যে, যেমন ৭-৮ শতাংশের কাছাকাছি ছিল, তখন দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নিয়ে ফ্ল্যাট কেনার পরিকল্পনা অনেক পরিবারের কাছে বাস্তবসম্মত ছিল।
কিন্তু ঋণের সুদ ১৪-১৫ শতাংশ বা তারও বেশি হলে একই পরিমাণ ঋণের মাসিক কিস্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ফলে নির্দিষ্ট আয়ের চাকরিজীবীদের জন্য সেই কিস্তি বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এর প্রভাব পড়ে ফ্ল্যাটের চাহিদায়, আবাসন ব্যবসায় এবং সংশ্লিষ্ট নির্মাণ খাতেও।
ফ্ল্যাট বিক্রি ও গৃহঋণের আবেদন কমে গেলে নির্মাণ প্রকল্পের গতি কমতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে নির্মাণশ্রমিক, প্রকৌশলী, স্থপতি, রড-সিমেন্ট, ইট, টাইলস, আসবাবসহ বহু খাত। তাই আবাসন খাতে মন্দার প্রভাব অর্থনীতির আরও বিস্তৃত অংশে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
উচ্চ সুদের সময়ে বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলনামূলক নিরাপদ আমানত ও সরকারি ঋণপত্রের মতো বিকল্প তৈরি হয়। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের আগ্রহ কমে যেতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সরিয়ে নিরাপদ ও নির্দিষ্ট আয়ের খাতে রাখার দিকে ঝুঁকতে পারেন।
এর ফলে পুঁজিবাজারে তারল্য কমে যায় এবং লেনদেন দুর্বল হতে পারে। সাধারণ মধ্যবিত্ত বিনিয়োগকারীরাও এর প্রভাব অনুভব করেন। অনেক পরিবার অতিরিক্ত আয়ের আশায় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করলেও বাজারে দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা থাকলে তাদের সঞ্চিত পুঁজি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
চাকরির বাজারের অনিশ্চয়তার কারণে শিক্ষিত তরুণদের একটি অংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা এবং নতুন উদ্যোগের দিকে যেতে আগ্রহী হয়েছে। কিন্তু উদ্যোক্তার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো সাশ্রয়ী অর্থায়ন।
ঋণের সুদ যদি অত্যন্ত বেশি হয়, তাহলে ব্যবসা শুরু করার আগেই উদ্যোক্তার ব্যয়ের বোঝা বেড়ে যায়। ব্যবসা থেকে যে মুনাফা আসার কথা, তার বড় অংশ চলে যেতে পারে ঋণের সুদ পরিশোধে। ফলে নতুন উদ্যোগ শুরু করার আগ্রহ কমে এবং বিদ্যমান ছোট ব্যবসাগুলোও সম্প্রসারণের পরিবর্তে টিকে থাকার দিকে মনোযোগ দেয়।
এখানে আরেকটি সমস্যা হলো ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা। উচ্চ অনিশ্চয়তার পরিবেশে ব্যাংকগুলো তুলনামূলকভাবে বড় ও প্রতিষ্ঠিত গ্রাহকদের ঋণ দিতে বেশি আগ্রহী হতে পারে। এতে ছোট উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন আরও কঠিন হয়ে পড়ে। উচ্চ সুদের প্রভাব ব্যক্তিগত ঋণ বা ব্যবসায়িক বিনিয়োগেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব ধীরে ধীরে সামগ্রিক অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রথমত, ঋণের ব্যয় বেড়ে গেলে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যায়। ব্যবসায়ীরা নতুন কারখানা স্থাপন, যন্ত্রপাতি কেনা কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে পারেন। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, ঋণের সুদ বাড়লে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ে। প্রতিষ্ঠানগুলো এই বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামে যুক্ত করলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। আবার দাম বাড়ানো সম্ভব না হলে প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মী নিয়োগ কমাতে, বিনিয়োগ স্থগিত করতে কিংবা কর্মী ছাঁটাই করতে পারে।
ফলে একটি চক্র তৈরি হয়—উচ্চ সুদে বিনিয়োগ কমে, বিনিয়োগ কমলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের গতি দুর্বল হয়, আয় কমে গেলে ভোগ কমে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও ধীর হয়ে যায়।
উচ্চ সুদের আরেকটি বড় ঝুঁকি ব্যাংকিং খাতেই ফিরে আসে। পরিবর্তনশীল সুদহারে নেওয়া ঋণের ক্ষেত্রে সুদ বেড়ে গেলে গ্রাহকের মাসিক কিস্তিও বেড়ে যায়। ব্যবসার আয় একই হারে না বাড়লে উদ্যোক্তার পক্ষে অতিরিক্ত কিস্তি পরিশোধ করা কঠিন হতে পারে।
বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। তারা যদি সময়মতো ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পারেন, তাহলে অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ বাড়তে পারে এবং অনেক ঋণ খেলাপি ঋণে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। অর্থাৎ উচ্চ সুদ শুধু ঋণগ্রহীতার সমস্যা নয়; শেষ পর্যন্ত এটি ব্যাংকের সম্পদের মান ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশের বাস্তবতা উন্নত দেশের মতো নয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বহুল ব্যবহৃত নীতি। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ, ব্যাংক অব ইংল্যান্ড এবং ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকও মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছে।
তবে বাংলাদেশের বাস্তবতা উন্নত অর্থনীতির সঙ্গে পুরোপুরি তুলনীয় নয়। উন্নত দেশগুলোতে সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা তুলনামূলক শক্তিশালী এবং বাজার তদারকি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও বেশি কার্যকর।
বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির পেছনে শুধু অতিরিক্ত চাহিদা নয়, সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, ডলারের সংকট, আমদানি ব্যয়, বাজারে মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের প্রভাব এবং ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন দুর্বলতাও ভূমিকা রাখে। ফলে শুধু সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এ কারণেই মধ্যবিত্ত একই সময়ে দুই ধরনের চাপের মুখে পড়ছে। একদিকে ব্যাংকঋণের সুদ ও বিনিয়োগের ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। আয় যদি সেই হারে না বাড়ে, তাহলে পরিবারের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা কমে যায়।
এই পরিস্থিতিতে সুদের হার কমানো বা বাড়ানো—শুধু একটি সিদ্ধান্ত দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি, ব্যাংকিং খাত এবং বাজার ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বিত পদক্ষেপ।
প্রথমত, বাজারভিত্তিক সুদের হার ব্যবস্থাকে কার্যকর রাখার পাশাপাশি উৎপাদনশীল খাতের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক অর্থায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, নতুন উদ্যোক্তা এবং আবাসন খাতের মতো কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ খাতের জন্য সহনীয় অর্থায়নের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা, সিন্ডিকেট ও কারসাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সরকারের অনুৎপাদনশীল ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মতো রাজস্ব ও বাজার ব্যবস্থাপনার পদক্ষেপও জরুরি।
তৃতীয়ত, মধ্যবিত্ত, প্রবীণ নাগরিক ও পেনশনারদের সঞ্চয় সুরক্ষায় বিশেষ সঞ্চয় স্কিম বা তুলনামূলক নিরাপদ, আকর্ষণীয় মুনাফার বন্ড চালু করা যেতে পারে। এর লক্ষ্য হওয়া উচিত মূল্যস্ফীতির কারণে সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য দ্রুত কমে যাওয়া ঠেকানো।
চতুর্থত, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। বড় ঋণ কেলেঙ্কারি বন্ধ, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা এবং ঋণ আদায়ে কঠোরতা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাংকের পরিচালন ব্যয়ও কমাতে হবে। ব্যাংকের অদক্ষতা ও অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত ঋণগ্রহীতার ওপর সুদের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করে।
পঞ্চমত, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কারসাজি বন্ধ, কার্যকর নজরদারি এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি শক্তিশালী বন্ড মার্কেট গড়ে তুলতে হবে। এতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমবে।
মধ্যবিত্তের আর্থিক সক্ষমতা শুধু তাদের ব্যক্তিগত বিষয় নয়। এই শ্রেণির মানুষের সঞ্চয় ব্যাংকের আমানত তৈরি করে, তাদের ব্যয় বাজারে চাহিদা সৃষ্টি করে এবং তাদের বিনিয়োগ অর্থনীতিতে পুঁজি সরবরাহ করে। তাই মধ্যবিত্তের সঞ্চয় ক্ষমতা কমে গেলে এর প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়ে।
যদি একটি পরিবার প্রতিমাসে আয় থেকে সামান্য অর্থ সঞ্চয় করতে পারে, সেই অর্থ দীর্ঘমেয়াদে বড় পুঁজিতে পরিণত হয়। কিন্তু মূল্যস্ফীতির কারণে সেই সঞ্চয় যদি বারবার ভেঙে ফেলতে হয়, তাহলে পরিবারের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা দুর্বল হয়। একইভাবে ঋণের উচ্চ ব্যয়ের কারণে যদি বাড়ি কেনা, ব্যবসা শুরু বা বিনিয়োগের পরিকল্পনা স্থগিত হয়, তাহলে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সুদের হারের ওঠানামা বাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক অংশ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রয়োজনে সুদের হার বাড়াতেই হতে পারে। কিন্তু সেই নীতির প্রভাব যদি দীর্ঘ সময় ধরে মধ্যবিত্তের সঞ্চয়, আবাসন, বিনিয়োগ, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে নীতির সামগ্রিক প্রভাব নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে জরুরি হলো ভারসাম্য তৈরি করা। একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও মুদ্রার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে ব্যাংকে টাকা রাখলে মানুষের সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য অতিরিক্ত দ্রুত কমে না যায় এবং উদ্যোক্তারা অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে বিনিয়োগ থেকে সরে না দাঁড়ান।
মধ্যবিত্তের সঞ্চয়কে সুরক্ষিত করা, উৎপাদনশীল বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহজ অর্থায়ন নিশ্চিত করা, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেটকে শক্তিশালী করার সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই সংকটের চাপ কমাতে।
অর্থনীতির স্থিতিশীলতা শুধু মূল্যস্ফীতির হার বা সুদের হার দিয়ে বিচার করা যায় না। মানুষের সঞ্চয়ের নিরাপত্তা, বিনিয়োগের সুযোগ, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থাও একটি সুস্থ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক। তাই মধ্যবিত্তের আর্থিক নিরাপত্তাকে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রীয় বিবেচনায় এনে একটি স্থিতিশীল, পূর্বানুমানযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি

